বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬

দুর্নীতিপরায়ণ সমাজে সৎ পুলিশ আশা করা বোকামি

ফাহাদ মোহাম্মদ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার ১০:২০ এএম

দুর্নীতিপরায়ণ সমাজে সৎ পুলিশ আশা করা বোকামি

পুলিশ সার্জেন্ট ফাহাদ মোহাম্মদ

ঢাকা: ২০১৬ সাল টা শুরু করেছিলাম যাদের গাড়ির কাগজ পত্র ঠিক ছিল তাদের মাঝে সেন্টার ফ্রেস বিতরণের মাধ্যমে। নতুন উদ্দীপনা আর দেশ প্রেমের চেতনা নিয়ে নতুন ভাবে সবকিছু শুরু করার পরিকল্পনা করি। পুলিশের অতি সামান্য একজন কর্মকর্তা হয়ে আহামরি কিছু করে ফেলবো তাও ভাবিনি। শুধু ভেবেছিলাম কিভাবে নিজেকে সব অনিয়ম থেকে বিরত রাখা যায়। শতভাগ সততার সাথে দায়িত্বপালন করেছি তার নিশ্চয়তা দিতে পারবো না। বরং ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী।

একটা বছরে নিজের সামনে অনেক কিছুই ঘটে গেছে। কোনটা অন্যায় ছিল আবার কোনটা ছিল প্রশংসনীয়। ভাল কাজের প্রশংসা করতে পারলেও অনেক অন্যায় কাজেরই প্রতিবাদ করার সাহস, সামর্থ্য কিংবা সুযোগ ছিলনা। নিজে তেমন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনেরও ডাক পাইনি। পুলিশে চাকরী হওয়ার আগে ভাবতাম শালার পুলিশ শুধু বসে বসে খাওয়া আর ঘুষ দেওয়া ছাড়া কোনো কাজ নাই। রাস্তায় পুলিশ দেখলেই মনে হতো টাকার জন্য গাড়ি ধরতেছে। থানার সামন দিয়ে যাওয়ার সময় ভাবতাম এরা চাইলেই সব অপরাধ ধমন করতে পারে। পুলিশ সম্পর্কে একটা ভালো চিন্তা আসার আগে ৯০টা খারাপ চিন্তা মাথায় আসতো। মনে হতো পুলিশই একমাত্র পেশাদার বাহিনী যারা ঘুষ ছাড়া কিছুই বুঝে না। (আমি বলছি না এসব কিছুই হয় না। কিন্তু স্রোতের বিপরীতে চলা মানুষের সংখ্যাও কম না)।

চাকরি হওয়ার আগে মনে হতো থানায় কোনো কাজ হয় না। কিন্তু থানার পুলিশের কি সকল কাজ করার সামর্থ্য কিংবা প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট আছে কি না সেটা ভাবতাম না। বাংলা সিনেমার সেই বিখ্যাত শেষের দৃশ্যকেই বাস্তবের পুলিশ মনে হত। কিন্তু এর আগে কখনো প্রশ্ন জাগেনি যে কোথাও মারামারি লাগার পরেই পুলিশের কাছে খবর যায়। আর মারামারির খবর পুলিশের কাছে পৌঁছাতে যেমন সময় লাগে তেমনি ব্রিটিশ আমলের ভাঙ্গা গাড়ি নিয়ে পৌঁছানোর আগেই মারামারি প্রায় শেষের দিকে চলে যায়। থানায় যে পরিমাণ গাড়ি থাকার কথা তার দশ ভাগের একভাগও নাই। একটা থানার অধীনে যদি নয়টা ইউনিয়ন থাকে তাহলে প্রতিটা প্রতিটা ইউনিয়নের জন্য একটা করে গাড়ির প্রয়োজন। সেখানে কোনো থানায় কেবল একটাই গাড়ি থাকে। সেটাও প্রায় সময় নষ্ট থাকে।

তাহলে ডিউটির গাড়ি কোথা থেকে আসে সেই খবর কি কেউ রাখেন? গাড়ির ঘাটতিটা পুরণ করা হয় পাবলিকের গাড়ি রিকুইজিশন করে। এখানেই শেষ না। গাড়ির জ্বালানি এবং ড্রাইভারের খাওয়ার খরচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই অফিসারকে তার পকেট থেকে দিতে হয় সেদিন যার ডিউটি থাকে। তাহলে এই গাড়ির ভাড়া এবং জ্বালানির টাকা কি উক্ত অফিসার জমি বিক্রি করে এনে দেবেন? এখানেই শেষ না। জরুরী কোনো খবর আসলে গাড়ি ভাড়া করে ঘটনাস্থলে যেতে হয় অফিসারের পকেটের টাকা দিয়ে।

একটি খণ্ডবিখণ্ড গলিত লাশ যখন নদীতে ভেসে উঠে তখন সবাই নাকে কাপড় দিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত থাকে তখন পুলিশকেই সবকিছু বিসর্জন দিয়ে গলিত লাশ ডাঙ্গায় তুলে সুরতহাল করে নিজ খরচে হাসপাতালে পাঠাতে হয়। বেওয়ারিশ লাশ হলে তার সৎকারের খরচটাও পুলিশের সেই অফিসারকেই দিতে হয় যিনি এই গলিত লাশ উদ্ধার করেছিলেন। সেই খবর কি আপনি রাখেন? তেমনি রাস্তায় গাড়ি থামানো দেখলেই মনে হতো টাকা খাওয়ার জন্যই আটক করছে। কিন্তু নিজে যখন সেই কাজ করতে শুরু করলাম তখন নিজের ভুল ভাঙলো। সবাই আসলে একরকম না। রাস্তায় গাড়ি বিভিন্ন কারণেই থামাতে হয়। গাড়ির কাগজপত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করতে কিংবা সন্দেহজনক হলে গাড়ি তল্লাশি করা হয়। আর অন্য যে কাজটি করা হয় তাহল রিকুইজিশন। এই কাজটাই আমার কাছে সবথেকে অমানবিক মনে হয়।

পুলিশ ছাড়াও বিভিন্ন সরকারী কাজে গাড়ির প্রয়োজন পড়লে সার্জেন্টকেই গাড়ি রিকুইজিশন করতে হয়। প্রয়োজনীয় জ্বালানী এবং নামে মাত্র খুড়াকির বিনিময়ে একজন ড্রাইভার এক থেকে চারদিন সরকারি ডিউটি করতে বাধ্য থাকে। পরিবার? সেটা পুলিশ কিংবা সরকারের দেখার বিষয় নয়। সেই ড্রাইভার, ড্রাইভারের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এই কাজের জন্য পুলিশকেই গালিগালাজ করবে। সরকারের সেই সংস্থাকে না। মনে করেন আপনি গাড়ি নিয়ে বেড় হলেন কোথাও যাওয়ার জন্য। কিছু দূর যাওয়ার পরেই পুলিশ সিগনাল দিয়ে আপনাকে গাড়ি থামাতে বললো। তখন আপনি মনে মনে একটা গালি দিবেন, শালা পুলিশ প্রথমেই বাধা দিলো।

যখন কাগজপত্র চেক করতে গেলো তখন প্রথমেই আপনার সেফটি (কার হলে সিটবেল্ট, মোটরসাইকেল হলে হেলমেট) নাই, কাগজ চেক করে দেখা গেলো লাইসেন্স নাই, ইন্সুরেন্স মেয়াদবিহীন, ফিটনেসের মেয়াদ নাই টেক্সের মেয়াদ নাই(কার হলে)। যখন সার্জেন্ট এর জন্য মামলা দিতে যাবে তখনই বিভিন্ন অনুনয় বিনয় করতে লাগলেন। উপরে কেউ থাকলে কল দিলেন। কেউ না থাকলে সার্জেন্ট কে উপঢৌকন দেওয়ার প্রলোভন দেখালেন। তাতে কাজ হলে হাসি মুখে বিদায় নিয়ে অনন্তকাল পুলিশকে ঘুষখোর বলে গালি দিবেন। আর মামলা দিলে অনন্তকাল বলে বেড়াবেন টাকা দেইনি বলে আপনাকে হয়রানি করা হয়েছে।

পুলিশ অনেক কাজ করে যা আসলেই পুলিশের কাজের মধ্যে পরে না। আর চাকরি হওয়ার আগে মনে হতো সেটাই পুলিশের কাজ। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাজও পুলিশকে করতে হয়। এবং কিছু কিছু সমস্যা যা সমস্যায় পরিণত হওয়ার আগেই সমাধান করা যেতো তাও শেষ মুহুর্তে এসে পুলিশকেই সমাধান করতে হয়। তার মধ্যে একটি অন্যতম হল বিভিন্ন প্রকার অবৈধ যানবাহন।

ব্যাটারি চালিত রিক্সা বিভিন্ন শহরে নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই শহরেই বিশাল শোরুমে সেই সকল যানবাহন বিক্রি করা হয়। এবং সেই সকল অবৈধ যানবাহন চার্জ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন যায়গায় চার্জিং স্টেশন করা হয়ে। তাও পিডিবির লোকের সহায়তায়। দিন শেষে দেখা গেলো সেই গাড়ির বিরুদ্ধে পুলিশকেই ব্যবস্থা নিতে হয়। কিন্তু প্রথমেই যদি সেগুলো প্রতিরোধ করা যেতো তাহলে গরিব রিক্সা চালকের উপর পুলিশে লাঠিচার্জ নামক শিরোনাম দেখতে হত না।

আচ্ছা আপনারা কি জানেন, থানায় পুলিশ কত ঘণ্টা কাজ করে? পুলিশের মানবাধিকার ঠিকমতো পুড়ন হচ্ছে কি না যাতে সে জনগণের মানবাধিকার নিয়ে ভাবতে পারে? না, আপনার মাথায় শুধু এটাই ঘুরবে, পুলিশ অনেক টাকা কামায়। ডিউটি কত ঘণ্টা সেটা জানার কিংবা বুঝবার প্রয়োজন, সময় বা ইচ্ছা কোনটাই আপনার নেই। সারাদিন রোদে পুড়ে একজন ট্রাফিক পুলিশ ডিউটি শেষে কোথায় ঘুমায় সেই খবরও আপনার জানার ইচ্ছা নাই। আপনি অপেক্ষায় থাকেন কখন পুলিশ গাড়ির দিকে হাত বাড়ায় সেই দৃশ্য ক্যামেরা বন্ধী করতে অথবা সেই ছবি সর্বোচ্চ সংখ্যক বার ফেসবুকে শেয়ার করতে। অথচ সেই থানার পুলিশ যখন আপনার ঘুমের নিশ্চয়তা দেয়ার জন্য নতুন বউকে বাসায় একা রেখে, পরিবারে সবচেয়ে আপন ব্যক্তিকে হাসপাতালে রেখে, প্রচণ্ড ঝড় কিংবা তীব্র শীত উপেক্ষা করে সারা রাত আপনার পাহারা দেয় তার প্রতি আপনার সামান্য কৃতজ্ঞতাস্বীকার করতে যত অনীহা।

কিংবা ৩৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আপনি যখন এসির ভেতর থেকেও গরম অনুভব করেন তখন রাস্তায় রোদে পুড়ে যানবাহন সামলানো ট্রাফিকপুলিশ কে ধন্যবাদ জানাতে আপনার যত আপত্তি। এমনকি পুলিশে এসপি/ডি আই জি পদবীর কর্মকর্তারাও তীব্র যানজটের সময় রাস্তায় কাজ করেন। যা সমান মর্যাদার অন্য কোনো সরকারী বিভাগের কর্মকর্তা মাঠে থাকেন এমন ঘটনা খুবই বিরল। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে প্রতিবছর শতাধিক পুলিশ সদস্য নিহত হন।

জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্বসেরা। সরকারের সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক, অসৎ ব্যবসায়ী, সুদখোর, ঠিকাদার, চোর-ডাকাত এই বলে সান্ত্বনা পায় যে, মানুষ পুলিশকেই সবথেকে বেশি দুর্নীতিবাজ মনে করে। অথচ রাষ্ট্রের কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন পুলিশের দ্বারা হয় না যেখানে হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি হয়।

আজ পর্যন্ত পুলিশের কোনো কর্মকর্তা ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা লোন নিয়ে সেটা হজম করে নি। গরিবের নামে বরাদ্দকৃত মালামাল কোনো পুলিশ খেয়ে ফেলে নি। সরকারি কাজে রডের বদলে কোনো পুলিশ বাঁশ দেয় নি। তবুও দিন শেষে, মাস শেষে, বছর শেষে পুলিশই দেশের সবথেকে বড় দুর্নীতিবাজ থেকে যায়। কারণ, পুলিশের নেতিবাচক খবর পাবলিক বেশি পছন্দ করে তাই সেটাই বেশি প্রচার হয়। রাষ্ট্র যখন সামান্য কিছু বেতন রেশনের জন্য একজন পুলিশের ২৪ ঘণ্টা কিনে নেয় তাহলে রাষ্ট্রের উচিত তার সকল প্রকার চাহিদা পুরন করা।

সৎভাবে জীবনযাপন করে নিজের, পরিবারের এবং আত্মীয়স্বজনের ভরণপোষণ করা হয়তো অসম্ভব নয় কিন্তু অনেক কষ্টকর। তাছাড়া আরো অনেক অপ্রিয় সত্য আছে যা কেবল পুলিশের লোকেরাই জানে। যে দেশের প্রতিটা সেক্টরে দুর্নীতি হয়। যে দেশের বেশিরভাগ মানুষ কোনও না কোনো ভাবে দুর্নীতির সাথে জড়িত সেখানে শুধু মাত্র পুলিশের পক্ষে ভালো থাকা অসম্ভব। অনেকেই বলেন নব্বই ভাগ পুলিশ ঘুষখোর। তার কারণ হলও আমদের নব্বই ভাগ মানুষ বিভিন্নভাবে অনিয়মের সাথে জড়িত। আর এই নব্বই ভাগ মানুষ যে দিন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, দুর্নীতিকে না বলবে সেদিন পুলিশের নব্বই ভাগও ভালো হয়ে যাবে। একটি দুর্নীতিপরায়ণ সমাজে সৎ নিষ্ঠাবান পুলিশ আশা করাটাও বোকামি।

শেষ করছি সাবেক লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার স্যার রাবার্ট মার্কের একটি উক্তি দিয়ে। " পুলিশ সামাজিক আচরণের উৎকৃষ্ট প্রতিফলন। সমাজ যদি উচ্ছৃঙ্খল হয়, পুলিশও উচ্ছৃঙ্খল হবে। সমাজ যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, পুলিশও দুর্নীতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে সমাজ যদি সহনশীল, শিক্ষিত এবং মানবিক আচরণে অভ্যস্ত হয়, পুলিশও একই ভাবে সহনশীল ও মানবিক আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।"

লেখক-ফাহাদ মোহাম্মদ, ট্রাফিক সার্জেন্ট, বাংলাদেশ পুলিশ।


সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।