রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৪ আশ্বিন ১৪২৭

দেশে বিদেশি চাকরিজীবী ৫ লাখ, নিয়ে যাচ্ছে ৪০ হাজার কোটি টাকা

আশরাফুজ্জামান মণ্ডল | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার ১২:০৮ পিএম

দেশে বিদেশি চাকরিজীবী ৫ লাখ, নিয়ে যাচ্ছে ৪০ হাজার কোটি টাকা

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে ২০১৭ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেন এনামুল হক। ওই বছরই ঢাকায় এসে তিনি শুরু করেন চাকরির জন্য পড়াশোনা ও প্রস্তুতি। কিন্তু সেই প্রস্তুতি যেন শেষ হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যবইয়ের পাঠ চাকরি পেতে তেমন কাজে লাগছে না। ফলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মবাজার নিয়ে তিনি হতাশায় ভুগছেন।

শুধু এনামুল নন, তার মতো একই বক্তব্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা জাহিদুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর আলমের। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক লাইব্রেরিতে তাদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়।

তাদের ভাষ্য, সরকারি কিংবা ভালো চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিতেই বেশির ভাগ বেকারের চার-পাঁচ বছর সময় লাগে। তারপরও ভালোমানের চাকরি অধিকাংশের জোটে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা ফেলো নাজনীন আহমেদ বলেন, যে হারে দেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সে হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিতে দেশে সার্টিফিকেটধারীর সংখ্যা বাড়ছে ঠিকই, তবে দক্ষ, যোগাযোগ-পারদর্শী ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষা ও কর্মবাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে একধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে, যার সুযোগ নিচ্ছে বিদেশিরা।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে কর্মবাজারে বিভিন্ন পর্যায়ে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ৫ লাখ, যারা বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। আর দেশের অধিকাংশ তরুণ কথিত উচ্চশিক্ষার সনদ নিয়েও কর্মবাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বছরে পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করছেন, যাদের বড় অংশই বেকারের তালিকায় যোগ হচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশে এখন উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি। 

বিআইডিএসের সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, দেশের উচ্চশিক্ষিতদের ৩৪ শতাংশই বেকার। শিক্ষাজীবন শেষে কত সময়ের মধ্যে তরুণরা বেকার থাকেন, সে হিসাবও দেখিয়েছে বিআইডিএস। তারা বলছে, শিক্ষা শেষে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত বেকার থাকে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, দুই বছরের চেয়ে বেশি সময় বেকার থাকে ১৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত বেকার থাকে ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ ও ছয় মাসের কম সময় বেকার থাকেন ৫০ দশমিক ৭৪ শতাংশ তরুণ।

উচ্চশিক্ষা শেষ করেও তরুণরা কেন বেকার থাকছেন তা জানতে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, চট্টগ্রাম ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একাধিক কলেজের স্নাতক পাস শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক, যারা শিক্ষাজীবন শেষে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত চাকরির প্রস্তুতি ও পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অধিকাংশের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রস্তুতি বা সেলফ স্টাডি আরও আগেই অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই শুরু হয়। এ সময় এমপি থ্রি, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, ব্যাংক, বিসিএসসহ বিভিন্ন পরীক্ষার বড় বড় গাইড বই মুখস্থের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তবে এই পড়াশোনা করতে গিয়ে অ্যাকাডেমিক পরীক্ষায় অনেকে খারাপ ফলাফল করেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে ২০১৫ সালে স্নাতকোত্তর পাস শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম  বলেন, ‘চাকরির পড়া আর অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার মধ্যে অন্তত ৯০ শতাংশ অমিল রয়েছে। ইতিহাস থেকে পড়ে ব্যাংকে পরীক্ষা দিলে আপনাকে ইংরেজি, গণিত, বাংলা ও সাধারণ থেকে প্রশ্ন করা হবে। আমি এসএসসি থেকে গণিত বাদ দিয়েছি। এখন হঠাৎ যদি গণিত থেকে প্রশ্ন আসে আপনি কীভাবে উত্তর দেবেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে স্নাতকোত্তীর্ণ তানভীর আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাকরির পরীক্ষায় যেসব প্রশ্ন করা হয়, সেগুলো দিয়ে একজন মানুষের যোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

উচ্চশিক্ষিত বেকারের সমাধান কী জানতে চাইলে বিআইডিএসের মহাপরিচালক কে এস মুর্শিদ বলেন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মান সার্বিকভাবে খারাপ করছে। মুখস্থবিদ্যা শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখায় না। প্রতি সেমিস্টারে পরীক্ষা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ মেয়াদে গবেষণাধর্মী কাজে লাগাতে হবে। অ্যানালাইটিক্যাল ও উদ্ভাবনী শক্তির সিলেবাস তৈরি করতে হবে। সবাইকে উচ্চশিক্ষা নিতে হবে এই পদ্ধতিটাই অযৌক্তিক। আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় কে ডিপ্লোমা করবে? কে গবেষক হবে? কে ইঞ্জিনিয়ার হবে? কে ব্যাংকার হবে? এ ধরনের একটা পরিকল্পনা থাকা উচিত। যার যার সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মবাজারে প্রবেশ করা উচিত।

তিনি বলেন, জিপিএ, নৈর্ব্যক্তিক ও লিখিত পরীক্ষানির্ভর নিয়োগ হচ্ছে। এখানে কিছুটা বিতর্ক আছে। এই পদ্ধতিতে প্রকৃত মেধাবী যাচাই সম্ভব হচ্ছে না। কর্মজীবনে যোগাযোগ ও ম্যানেজমেন্ট কৌশল খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা নিয়ে এটা যাচাই করা যায় না। এ জন্য দরকার অ্যানালাইটিক্যাল পদ্ধতি; যা শিক্ষাপদ্ধতিটাই এমন হওয়া দরকার। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে আমরা কাজ দিতে পারছি না আবার যাদের নেওয়া হচ্ছে, তারাও উপযুক্ত নয়।

বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেন, দেশের ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিবিএ-এমবিএ কিংবা অন্যান্য সাধারণ সাবজেক্টে পড়ছেন। তাদের সাপ্লাই এত বেড়ে গেছে যে সবাই ব্যাংকে আবেদন করছেন। দেশে সার্টিফিকেটধারী কোনো ইলেকট্রিশিয়ান কিংবা কাঠমিস্ত্রি পাওয়া যায়? দেশে কতজন ব্যাংকার-ম্যানেজার দরকার, সে হিসাবে আপনাকে ছাত্র ভর্তি করাতে হবে। যেসব সাবজেক্টে দেরিতে চাকরি হয়, সেখানেও ছাত্র কমাতে হবে। সবার একসঙ্গে চাকরি প্রয়োজন হয় না। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে সাবজেক্ট খোলা, আসন বাড়ানো এবং কিছু সাবজেক্টে ছাত্র কমাতে হবে। আমরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বহুবার এমন অনুরোধ করেছি। কিন্তু কাজে এসেছে সামান্য।

পরিকল্পনা কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. শামসুল আলম বলেন, ‘চাকরি পাচ্ছে না বিষয়টা এভাবে না বলে বলা যায়, চাহিদামতো কাজ পাচ্ছে না। সবার চিন্তায় ঢুকে গেছে বিসিএস, ব্যাংক কিংবা সরকারি কোনো চাকরি ছাড়া করা যাবে না। এটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিদেশি তরুণরা এসে কাজ করছে, কই আমাদের কেউ তো যাচ্ছে না। এর কারণ দক্ষতার অভাব। আমাদের মেধাবী ছেলেদের বেশির ভাগ দেশের বাইরে যাচ্ছে। আমাদের ভাবতে হচ্ছে, পেছনের সারির ছাত্রদের নিয়ে। সার্বিকভাবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান খুবই নিচে নেমে গেছে। সোজা কথায় কর্মবাজারের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার শক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেই।দেশ রূপান্তর

সোনালীনিউজ/এইচএন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue