বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬

দেশ-বিদেশে স্বস্তিতে আ.লীগ

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রবিবার ১২:০৮ পিএম

দেশ-বিদেশে স্বস্তিতে আ.লীগ

ঢাকা : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের ‘ভোট ডাকাতির’ অভিযোগ আছে। আরো কয়েকটি ছোট দলেরও একই অভিযোগ। ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের ফল ‘প্রত্যাখ্যান’ করেছে। সরকারবিরোধীদের সংসদ নির্বাচন নিয়ে তোলা অভিযোগুলো তদন্তের আহ্বানও জানায় বন্ধুপ্রতিম কয়েকটি রাষ্ট্র, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা।

কোনো কিছুই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন টানা তৃতীয়বারের সরকারের পথচলায় রাজনৈতিক অস্বস্তির সৃষ্টি করতে পারেনি। দেশি ও বিদেশি সব চাপ দূরে ঠেলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন নিয়ে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এখন অনেকটাই নির্ভার। ফলে দেশ ও বিদেশের সার্বিক পরিস্থিতির বিবেচনায় স্বস্তিতেই আছে আওয়ামী লীগ।

দলটির উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি বিদেশিদের কাছে নানা অভিযোগ তুলে ধরেছে। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের কাছেও ঐক্যফ্রন্ট অভিযোগ জানায়। কোনো কোনো দেশ ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার’ হিসেবে ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগ তদন্তে সরকারকে আহ্বান জানালেও প্রায় পুরো বিশ্ব সম্প্রদায় নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানায়। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে তারা। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করারও প্রতিশ্রুতিও দেয় রাষ্ট্রগুলো।

পশ্চিমা দেশগুলোও তাদের অবস্থান ব্যক্ত করে। সবার কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করবে বলে জানায়। নির্বাচন সব দলের অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় তারা একে ইতিবাচক হিসেবে দেখে। গত ১০ বছরে  সরকারের ব্যাপক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের এ দেশে আশ্রয় দেওয়ায় শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার করে রাষ্ট্রগুলো।
ফলে নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর যে চাপ তৈরি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তা কেটে গেছে। ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগ তদন্ত করতে বিদেশিদের আহ্বানও তেমন জোরালো নয় বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা।

সূত্র জানায়, নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ থাকলেও বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলন কর্মসূচি পালনের দিকে আপাতত যেতে পারছে না। নতুন সরকারের এক মাস পূর্ণ হতে চললেও শক্ত কোনো কর্মসূচি দলটি ঘোষণা করতে পারছে না সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্বে সমস্যার কারণে। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের ফল ‘প্রত্যাখ্যান করে নতুন নির্বাচনের’ দাবি জানালেও নির্বাচনের পর গত বুধবার দলটি মানববন্ধন আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রথম কোনো কর্মসূচি পালন করে।

ভোট ‘ডাকাতির’ প্রতিবাদে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কালো ব্যাজ ধারণ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি গণশুনানি কর্মসূচি পালন করবে ঐক্যফ্রন্ট। এ ধরনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঐক্যফ্রন্ট সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন না। বিএনপির চেয়ারপারসন কারাবন্দি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদেশে থাকা ও শীর্ষ নেতৃত্বে কোন্দলের কারণে জোরালো কোনো কর্মসূচি দলটি পালন করতে পারবে না বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। তাদের মতে, ‘বিএনপির পুনর্নির্বাচনের দাবি শিশুসুলভ।’

একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর গত ৩ জানুয়ারি নির্বাচনে ‘অনিয়মের’ অভিযোগ নিয়ে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করার ঘোষণা দেন ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফ্রন্টের এ ঘোষণার দিকে তীক্ষ নজর রেখে আসছিলেন আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা। তবে ঘোষণার প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও ঐক্যফ্রন্টের অধিকাংশ প্রার্থীই মামলা করেননি। নির্বাচনে ‘অনিয়মের’ অভিযোগে মামলা করার ঘোষণা দিলেও নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করার আগ্রহ নেই তাদের।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি দেশে ও বিদেশে চিঠি দিয়েও চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নেতিবাচক রাজনীতির কারণে বিএনপি শুধু সামাজিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বিএনপি বিদেশি বন্ধু ও দেশের জনগণের আস্থা- দুই-ই হারিয়েছে।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের মতে, নির্বাচন নিয়ে বিএনপির দলীয় অভিযোগের চেয়ে নতুন সরকারকে ঘিরেই দেশের মানুষের আগ্রহ বেশি ও নানা প্রত্যাশার জন্ম নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ গঠনে দল ও মত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চান, এ বার্তা পৌঁছে গেছে দেশের মানুষের কাছে। নতুন সরকার গঠনের পর প্রথমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণসহ বিভিন্ন বক্তব্যে শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানান। নতুন মন্ত্রিসভার চমক নিয়েও মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যই নতুন হওয়ায় তাদেরকে নিয়ে বিতর্ক নেই। নতুন সরকারের শুরুতে মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরদার অভিযানও প্রশংসিত হচ্ছে। ফলে অনেকটাই নির্ভার আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুজন নেতা মনে করেন, ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে এখন পর্যন্ত শপথ না নেওয়া, শপথ না নেওয়ার ঘোষণা, সংসদ বর্জনের রাজনীতি ও গণভবনে গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রীর চা-চক্র অনুষ্ঠান বর্জনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ‘রাজনীতিতে উত্তাপ’ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে।

৩০ জানুয়ারি থেকে একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলেও ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত আটজনের কেউ এখনো শপথ নেননি ও সংসদেও যাননি। সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে শপথ নেওয়ার সুযোগ থাকায় এ সময়ের মধ্যে ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিতরা শপথ নিতে পারেন বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের কেউ কেউ। বিএনপির কেউ শপথ না নিলেও ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল গণফোরামের দুজন শপথ নেবেন বলে আওয়ামী লীগের কাছে তথ্য আছে। ওই দুজনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগও হয়েছে।

‘রাজনৈতিক উত্তাপ’ না ছড়িয়ে বিএনপিকে সংসদে আসার আহ্বান জানান ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেন, ‘বিএনপি সংসদে না এলে সুযোগ হারাবে। দেশের মানুষ হরতাল, অবরোধে বিশ্বাস করে না। রাজনীতিতে উত্তাপ সৃষ্টি করে লাভ নেই। আমরাও সংঘাতে যেতে চাই না।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই