শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

নির্বিকার বিআরটিএ

নগর পরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য চলছেই

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার ১১:৫১ এএম

নগর পরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য চলছেই

ঢাকা : ঢাকা মহানগরীতে বাসে সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া সাত টাকা ও প্রতি কিলোমিটার ১ দশমিক ৭০ টাকা এবং মিনিবাসে সর্বনিম্ন পাঁচ টাকা ও কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ১ টাকা ৬০ পয়সা। এর বেশি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই।

অথচ মালিবাগ রেলগেট থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত আনুমানিক ৪ কিলোমিটারের সড়কে লাভলী পরিবহনের ভাড়া ২০ টাকা। আবার আসাদগেট পার হলে ভাড়া নেওয়া হয় ৩৫ টাকা। দূরত্ব আনুমানিক ৭ কিলোমিটার। এই দূরত্বে লাব্বাইক পরিবহনও নিচ্ছে সমান টাকা। আবার বাসাবো থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দুই কিলোমিটারের বেশি সড়কে মিডলাইন পরিবহনের ভাড়া ১৫ টাকা।

একই দূরত্বে যাত্রীদের কাছ থেকে সমপরিমাণ টাকা আদায় করছে বাহন পরিবহন নামে আরেকটি বাস কোম্পানি। বাসগুলো নিজেদের সিটিং সার্ভিস দাবি করলেও বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। গাদাগাদি করে তোলা যাত্রী যেখানে-সেখানে ওঠানো-নামানো করে চালক, কন্ডাক্টর ও সহকারীরা।

অপরদিকে শীতাতপনিয়ন্ত্রীত যাত্রী পরিবহনের নামেও চলছে গলাকাটা অবস্থা। মতিঝিল থেকে রামপুরা হয়ে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার পথে চলাচলকারী গ্রীন ঢাকা পরিবহনের বাসের ভাড়া ১০০ টাকা, যা প্রতি কিলোমিটারে নেওয়া হচ্ছে ৪ টাকা ৭৬ পয়সা। কিন্তু এই বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৬০ টাকা, অর্থাৎ বাসে উঠলেই আপনাকে এই টাকা দিতে হবে তা আপনি যে দূরত্বেই যান না কেন।

অথচ মতিঝিল থেকে ফার্মগেট হয়ে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটারের এই পথে প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ৬৭ পয়সা হারে বিআরটিসির শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের ভাড়া ৬০ টাকা।

এই বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩০ টাকা, শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বনিম্ন ২০ টাকা ভাড়া রাখা হয়। খিলক্ষেত থেকে মগবাজার হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত যেসব যানবাহন চলাচল করে সেগুলোর মধ্যে সিটিং সার্ভিসের প্রতিটিতেই মগবাজার-মতিঝিলের ভাড়া এক। অর্থাৎ খিলক্ষেত থেকে সাতরাস্তা পার হলেই ৪০ টাকা দিতে হয়। সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা দিতে বাধ্য করা হয়।

মতিঝিল থেকে গুলিস্তান, রামপুরা হয়ে উত্তরার দিয়াবাড়ি খালপাড় পর্যন্ত বিআরটিসির আরেকটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস সেবা রয়েছে। এই রুটের ভাড়া ৭০ টাকা, কিলোমিটার প্রতি ভাড়া দুই টাকা ৯৭ পয়সা। এতে সর্বনিম্ন ভাড়া রাখা হয় ৩০ টাকা। মিরপুর ডিওএইচএস থেকে ইসিবি চত্বর, ঢাকা সেনানিবাস হয়ে কাওরানবাজার পর্যন্ত চলাচলকারী ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের ভাড়া ৫৫ টাকা। ১৩ কিলোমিটার দূরত্বের এই রুটে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া আসে ৪ টাকা ২৩ পয়সা। এই যানবাহনের ১০, ১৫, ২০ টাকারও টিকিট আছে।

কাকলী থেকে নতুন বাজার আর গুলশান শুটিং ক্লাব থেকে গুলশান-২ নম্বরে চলাচলকারী ঢাকা চাকা পরিবহনের বাস ভাড়া ১৫ টাকা। আড়াই কিলোমিটার দূরত্বের এ পথে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া দিতে হয় ৬ টাকা।

নতুন বাজার থেকে কাকলী পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়াও ১৫ টাকা, কিলোমিটার প্রতি ৬ টাকা। এই পথে সম্প্রতি গুলশান চাকা নামে আরেকটি পরিবহন সেবা যুক্ত হয়েছে। এর ভাড়াও ১৫ টাকা।

নগরজুড়ে এরকম শত শত বাস কোম্পানি সিটিং সার্ভিসের নামে অরাজকতা চালিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর। এসব দেখার যেন কেউ নেই। সিটিং বাস সার্ভিসের নীতিমালা করার নামে বছরের পর বছর সময় লাগছে। কিন্তু অবৈধ এই সিটিং সার্ভিস বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।

এদিকে এসি বাসের মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া নিয়েও যাত্রীদের অভিযোগ বিস্তর। এসি বাস সার্ভিসের নীতিমালা না থাকায় ইচ্ছেমতো পরিবহন কোম্পানিগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে যাচ্ছে। তেমনি রাজধানীর অটোরিকশার ক্ষেত্রে ভাড়া নৈরাজ্য চলছেই।

নিবন্ধিত ২১ হাজার অটোরিকশার মধ্যে এখন একটিও পাওয়া যাবে না যা মিটারে চলে। সিটিং-লোকাল সব বাসের বিরুদ্ধেই বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ। মালিক সমিতি বলছে ৫০ ভাগের বেশি বাস এখন সিটিং হয়ে চলছে। ট্যাক্সি ক্যাব সোনার হরিণ। ভাগ্যক্রমে পাওয়া গেলেও ভাড়া শুনে চোখ কপালে ওঠার মতো। এসব বিষয়ে নির্বিকার বিআরটিএ।

প্রশ্ন হলো, এই ভাড়া অরাজকতার শেষ কোথায়। তা ছাড়া এই অবস্থা কি চলতেই থাকবে?

এদিকে গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য রোধ ও যাত্রীসেবা নিশ্চিতে মাঠে নামছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিশেষ তদারকি সেল। অধিদপ্তরের ঢাকাসহ দেশের সব বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধানদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ কমিটির নির্দেশে সারা দেশের বাসস্ট্যান্ডে বিশেষভাবে তদারকি করা হবে। এ সময় কোনো অনিয়ম পেলেই পরিবহন মালিক, চালক ও হেলপারসহ সংশ্লিষ্টদের ভোক্তা আইনের আওতায় শাস্তি দেওয়া হবে।

পরিবহন মালিকরা বলছেন, সবার পরামর্শ নিয়ে সিটিং সার্ভিস নীতিমালার খসড়া করেছে বিআরটিএ। ভাড়াও ঠিক হয়েছে। কিন্তু নীতিমালা চূড়ান্ত করা হচ্ছে না। এই সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির পরিবহন মালিক।

ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, আমরা কোনো নৈরাজ্য চাই না। যাত্রীদের কোনো উপায় নেই। তাই যে বাস সামনে আসে সেটাতেই ওঠেন। কিন্তু বেশি ভাড়ার কারণে কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। তিনি বলেন, মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সব সময় নির্দেশ দেওয়া হয় বেশি ভাড়া যেন কোনো অবস্থাতেই আদায় না করা হয়।

সরকার নির্ধারিত ভাড়া : ঢাকা মহানগরীতে বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া সাত টাকা ও প্রতি কিলোমিটার ১ দশমিক ৭০ টাকা এবং মিনিবাসে সর্বনিম্ন পাঁচ টাকা ও কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ১ টাকা ৬০ পয়সা করা হয়। এর বেশি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী প্রথম ২ কিলোমিটারের ভাড়া ৪০ টাকা। বিরতিকালের জন্য প্রতি মিনিটে আগের ১ টাকা ৪০ পয়সার স্থলে ২ টাকা, একই সঙ্গে মালিকদের জমার পরিমাণ বাড়িয়ে ৬শ থেকে ৯শ টাকা করা হয়।

প্রশ্ন হলো, সিটিং বা লোকাল বাসের নামে কেন তাহলে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। অটোরিকশা নির্ধারিত ভাড়া কেন কার্যকর হচ্ছে না।

অটোরিকশা মালিক সমিতির নেতা বরকতউল্লাহ ভুলু বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ছে। কিন্তু অটোরিকশার ভাড়া ও জমা বাড়ছে না। চালকরা রাস্তায় গিয়ে যদি অরাজকতা চালায় তা দেখার দায়িত্ব বিআরটিএ’র।

অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হানিফ খোকন বলেন, সবকিছু নিয়মনীতির মধ্যে চলা উচিত। মালিকরা বাড়তি টাকা জমা নিচ্ছে তা তো কেউ বলে না। ফলে চালকদের কোনো উপায় নেই।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (বিআরটিএ) কাজ কী? চোখের সামনে বছরের পর বছর যাত্রীদের পকেট কেটে শত শত কোটি টাকা বাস, অটোরিকশাওয়ালারা নিয়ে যাচ্ছে, অথচ তারা এসব বন্ধে কার্যকর কিছুই করছে না। যাত্রা শুরুর পর থেকে সামান্য কয়েকটি অটোরিকশাকে পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বিআরটিএ।

বিআরটিএ পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, সিটিং সার্ভিস নামে রাজধানীতে কোনো যাত্রী পরিবহন সার্ভিস নেই। বৈধতা না থাকায় সিটিং সার্ভিসের নামে বাড়তি ভাড়া নেওয়াও ঠিক নয়। অটোরিকশার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে সিটিং সার্ভিস নীতিমালার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। যারা অন্যায়ভাবে বাড়তি ভাড়া আদায় করে তাদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, গণপরিবহনের ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রীসেবা নিশ্চিতে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এ সেল মাঠে নামবে। সপ্তাহের ৬ দিন রাজধানীসহ প্রতিটি জেলার বাসস্ট্যান্ডে ঝটিকা অভিযান চালাবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ড. গোলাম রহমান বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এ পরিকল্পনা অনেকটা প্রশংসনীয়। এই তদারকি যদি জোরদার ও সুষ্ঠুভাবে করা যায়, তাহলে জনসাধারণ স্বস্তি পাবে।

নৌসড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, বাস অটোরিকশাসহ গণপরিবহনের কাছে যাত্রীরা একেবারেই জিম্মি। এর কারণ হলো বিআরটিএ তাদের প্রয়োজনীয় কাজটি করছে না। তাদের অবহেলা আর ‘আপস আপস’ খেলায় যাত্রীদের পকেট কাটা হচ্ছে। এ অবস্থার এখনই পরিবর্তন জরুরি।

আন্তঃজেলা ট্রাকচালক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সংগঠনিক সম্পাদক ইসমাইল হোসেন রেফু বলেন, নতুন পরিবহন আইন বাস্তবায়ন হয়েছে। আশা করি এ আইনের আলোকে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে।

তবে তিনি মনে করেন, বর্তমানে অনভিজ্ঞ লোকদের হাতে পরিবহন সেক্টর জিম্মি হয়ে পড়ায় যাত্রী ও শ্রমিকরা ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।

নতুন আইন প্রয়োগের আগে আরো প্রচার-প্রচারণা এবং সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়েজন দাবি করে এই পরিবহন শ্রমিক নেতা বলেন, ট্রাফিক পুলিশ, সড়ক এবং সড়ক সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের যে বেহাল দশা, এ অবস্থায় নতুন আইন প্রয়োগ কতটুকু উপযুক্ত হবে তাও ভেবে দেখা দরকার। প্রয়োজনীয় সড়ক এবং সংশ্লিষ্ট সেবার মান না বাড়িয়ে এমন আইন চাপিয়ে দেওয়ার শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সোনালীনিউজ/এমটিআই