বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬

বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

নতুন আতঙ্ক করোনা ভাইরাস

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২০, সোমবার ০৪:৩২ পিএম

নতুন আতঙ্ক করোনা ভাইরাস

ঢাকা : যুদ্ধবিগ্রহ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বিশ্বে এখন নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে করোনা ভাইরাস। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে এ ভাইরাসের উৎপত্তি হলেও তা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে খুব দ্রুত।

এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চীনে ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার জানা গেলেও প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। তবে সেটা কতটা মারাত্মক হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। খবর : বিবিসি, আলজাজিরা ও ডেইলি মেইলের।

২০০২-০৩ সালের দিকে করোনা ভাইরাসের সমগোত্রীয় সার্সের (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) প্রাদুর্ভাবে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বিশ্ব অর্থনীতি। ওই ভাইরাসেরও উৎপত্তি হয়েছিল চীনে।

এ ছাড়া প্রতিষেধক আবিষ্কৃত না হওয়ায় এ ভাইরাস থেকে কীভাবে নিরাময় সম্ভব তা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর পরবর্তী ১৮ মাসের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাড়ে ছয় কোটি মানুষ উজাড় হয়ে যাবে বলে কয়েক মাস আগে সতর্ক করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষমতা আরো প্রবল এবং এটা বাড়তে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন।

রোববার (২৬ জানুয়ারি) এক সতর্কবার্তায় প্রাণঘাতী এ করোনা ভাইরাসে চীনে এখন পর্যন্ত ৫৬ জনের প্রাণহানি এবং বিশ্বজুড়ে ২ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানানো হয়।

দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন মন্ত্রী মা জিয়াওয়ে এক সংবা সম্মেলনে বলেছেন, নতুন এ ভাইরাসের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের ধারণা সীমিত এবং এ কারণে উদ্ভূত ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণাও নেই।

তবে চীন সরকার যতটা বলছে তার চেয়েও পরিস্থিতি আরো বেশি ভয়াবহ বলে জানা গেছে। এখন পর্যন্ত সেখানে প্রায় এক লাখ মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে এক চিকিৎসাকর্মী দাবি করেছেন।

উহান শহরের হাসপাতালে কর্মরত এক নার্স অনলাইনে একটি ভিডিওতে দাবি করেন, সেখানে ইতোমধ্যেই ৯০ হাজার মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আমি এখানে সত্যি বলতে এসেছি।

ইউটিউবে ওই নারীর এ ভিডিওটি প্রায় ২০ লাখ বার দেখা হয়েছে। তিনি ওই ভিডিওতে সবাইকে সতর্ক করেছেন। বলেন, আমি সবাইকে বলতে চাই-যারা এ ভিডিও দেখছেন তারা দয়া করে বাইরে বের হবেন না। কোনো পার্টি করবেন না। বাইরে কিছু খাবেন না। প্রকৃতপক্ষে উহান শহরের পরিস্থিতি কি তা জানা সম্ভব নয়।

কারণ পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাওয়ায় ১৮টি শহরে ভ্রমণে ও পরিবহন চলাচল নিষিদ্ধ করছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে এশিয়া-ইউরোপ-আমেরিকার অন্তত ১২টি দেশে।

এ ভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগে চীনে উৎপত্তি হওয়া সার্স ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বিশ্ব অর্থনীতি। এবার নতুন ভাইরাসের কারণেও চীনা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চীনা নববর্ষ উপলক্ষে লাখো পর্যটক ভ্রমণে বের হওয়ার মুহূর্তেই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ১৮টি শহরে। ফলে বড় আঘাত পড়েছে পর্যটনশিল্পে।

নববর্ষ উপলক্ষে বিনোদন ও উপহারসামগ্রী কেনাবেচায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ভাইরাসটি মানুষ থেকেই সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও আতঙ্কের কারণে বেশিরভাগ মানুষই ঘর ছেড়ে বের হচ্ছেন না। অনেক শহরে গাড়ি চলাচল ও দোকানপাট বন্ধ। ফলে অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে।

উহানে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় বেশ বিপাকে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট ভোক্তা-ব্যবসায়ীরা। পণ্য পরিবহনে শুরু হয়েছে বড় সংকট। শিল্পপণ্য সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে অসংখ্য পণ্যের চালান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এ ছাড়া স্থানীয় লোকজন কর্মক্ষেত্রে যোগ না দেওয়া বা দিতে না পারার কারণেও দেশটির আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

আক্রান্তদের মধ্যে যাদের স্বাস্থ্যবীমা করা আছে, তাদের চিকিৎসার জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হবে দেশটির সরকারি-বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোকে। অন্য দেশগুলোতেও এ ভাইরাস ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়লে সেখানেও একই সংকট সৃষ্টি হবে। যদিও সেটি পুরোপুরি চীনের সমান না হলেও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ একেবারে নগণ্যও হবে না। এর প্রভাব কতটা পড়বে তা নির্ভর করছে মূলত সংক্রমণের হারের ওপর।

শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু হয়েছে, বিশেষ করে চীনে। যদিও সেটি এখন পর্যন্ত খুব একটা বড় আকার ধারণ করেনি। এমনকি ভাইরাস সংকটের মধ্যেই সাংহাই কম্পোজিট ইনডেক্স গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ সূচকে পৌঁছেছে।

এ ছাড়া এমন পরিস্থিতিতে কিছু ব্যবসায় অনেক বেশি লাভও হতে পারে; যেমন ওষুধ। মানুষ ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ দেখে সে অনুযায়ী, ওষুধ কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এ ছাড়া করোনা ভাইরাসরিরোধী ওষুধ বাজারে ছাড়তে পারলে আরো বেশি লাভের মুখ দেখবেন ব্যবসায়ীরা।

এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত না হলেও জনসন অ্যান্ড জনসনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পল স্টোফেল জানিয়েছেন, তার দল ইতোমধ্যে নতুন ভাইরাসের প্রতিষেধকের ‘মূল কাজ’ সম্পন্ন করে ফেলেছেন। আগামী এক বছরের মধ্যেই এটি বাজারে ছাড়া সম্ভব হবে।

এ ছাড়া ভাইরাস আতঙ্কের কারণে মাস্ক, হাতমোজা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, থার্মোমিটার প্রভৃতির চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। যেসব কোম্পানি এগুলো তৈরি করে তাদের শেয়ারের দামও বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহে মাত্র দুদিনে প্রায় আট কোটি মাস্ক বিক্রি করেছে আলিবাবার মালিকানাধীন তাওবাও।

জানুয়ারির ১৯ থেকে ২২ তারিখের মধ্যে জেডি ডটকম মাস্ক বিক্রি করেছে ১২ কোটি ৬০ লাখ পিস। এ ছাড়া তাদের হ্যান্ড স্যানিটাইজারের স্টকও শেষ হয়েছে। বিক্রি বেড়েছে থার্মোমিটার, চশমাসহ ঠান্ডাজনিত রোগের বিভিন্ন ওষুধেরও।

সার্স প্রাদুর্ভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় চার হাজার কোটি ডলার। লন্ডনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জেনিফার ম্যাককেওন জানান, ২০০৩ সালে সার্সের কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি নেমেছিল পুরো এক শতাংশ। অর্থনীতিতে এটা অনেক বড় ধাক্কা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সে ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব হয়। সে সময় যেসব বিষয় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করেছিল তাদের চিত্রটি বেশ জটিল। তার মতে, সার্স অনেক ভয়ংকর এবং বিস্তৃত ভাইরাস হলেও বৈশ্বিক জিডিপিতে (অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ) এর স্থায়ী ক্ষতি নিরূপণ করা বেশ কঠিন।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত শনিবার দেশটির জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এ ভাইরাস দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তার দেশ ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি বলেও জানান।

গত বছরের অক্টোবর মাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিখ্যাত গবেষণাকেন্দ্র জন হপকিনস সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি নতুন একটি ভাইরাস সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছিলেন, এতে আক্রান্ত হয়ে ৬ কোটি মানুষ মারা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতার মাত্র তিন মাস পরই গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের তিন হাজার বয়সী শহর উহানে প্রথম করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে বন্যপ্রাণী কেনাবেচার একটি অবৈধ বাজার থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে।

উহান শহরে প্রাদুর্ভাব ঘটার পর ভাইরাসটি বেইজিংসহ অন্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ জাপান, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ম্যাকাও, ভারত, নেপাল এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়াতেও-এ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। এমনকি ইউরোপেও ছড়িয়েছে। ফ্রান্সে অন্তত তিনজন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এ ছাড়া, একজনের শরীরে এ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে সন্দেহ করছে ইসরাইল।

সোনালীনিউজ/এমটিআই