বুধবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৯, ৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

শুদ্ধি অভিযানের মধ্যে আজ কৃষক লীগের জাতীয় সম্মেলন

নতুন নেতৃত্ব ঘিরে নানা কৌতূহল

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার ০৪:১৪ পিএম

নতুন নেতৃত্ব ঘিরে নানা কৌতূহল

ঢাকা : দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান চলাকালে আওয়ামী লীগের সহযোগী যে চারটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের তারিখ ঘোষিত হয়, সেগুলোর মধ্যে প্রথমেই আছে কৃষক লীগ। শুদ্ধি অভিযানের মতো বড় ধাক্কা ও নানা বিতর্কের মধ্যে কেমন হতে পারে সংগঠনটির নতুন কমিটি, কারা আসছেন নেতৃত্বে— আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাদের কাছেও একই প্রশ্ন ও নানা কৌতূহল।

সংগঠনটির নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অনেক নেতার স্পষ্ট কিছু জানা নেই। মূল দল ও সংগঠনে শুদ্ধি অভিযান চলাকালে অনুষ্ঠিতব্য কৃষক লীগের সম্মেলনের বিষয়গুলো আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখভাল করছেন বলে দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র জানায়।

সূত্রমতে, অভিযুক্ত, দুর্নীতিবাজ ও তদবিরবাজরা চলমান অভিযানের পাশাপাশি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কৃষক লীগের নেতৃত্ব থেকে বাদ পড়ছেন। বাস্তবতা মেনে কৃষি ও কৃষকের উপযোগী নেতৃত্বের হাতে সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হবে বলে এবার তৃণমূলে আশাবাদ জন্মেছে। সংগঠনের নেতৃত্বে প্রবীণ ও নবীন মিলিয়ে নতুন মুখ উঠে আসার সম্ভাবনাই বেশি।

সম্মেলনে কাউন্সিলরদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সভাপতির ইচ্ছা প্রাধান্য পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে ইচ্ছুক স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতা ও সম্ভাব্য পদপ্রার্থীরাই দায়িত্ব পাবেন, ঝরে পড়বেন বিতর্কিতরা।

আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, দলের চারটি সহযোগী সংগঠনের জাতীয় সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদপ্রত্যাশীদের ‘আমলনামা’ আছে দলের সভাপতির কাছে। মাঠে তাদের রাজনৈতিক অর্জন, নেতাকর্মীদের কাছে জনপ্রিয়তা, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও বিশেষ করে গত প্রায় এগারো বছর ধরে আওয়ামী লীগ টানা সরকারে থাকা অবস্থায় তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত আছে ‘আমলনামাগুলোয়’।
সরকারি দলের শীর্ষ নেতা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পদপ্রত্যাশীদের সম্পর্কে এসব ‘আমলনামা’ বা প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

কৃষক লীগের আগামী নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্য পদপ্রত্যাশীদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। দলের সংগঠনগুলোকে বিতর্কমুক্ত করতে আর সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বকে শীর্ষ পদে জায়গা করে দিতে তিনি পদপ্রত্যাশীদের বিস্তারিত খোঁজ নেন বলে সূত্র উল্লেখ করে।

সরকারি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, মুক্তিযুদ্ধের পর খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে চাষাবাদে কৃষককে সহযোগিতা দেওয়া ও কৃষির সমৃদ্ধির জন্য কৃষক লীগের প্রতিষ্ঠা হলেও লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে সংগঠনটি অনেক দূরে সরে গেছে।

কৃষকদের পাশে না থেকে রাজধানীর অভিজাত এলাকা, এমনকি নিউইয়র্কের মতো বাণিজ্যিক শহরেও কৃষক লীগের শাখার নামে পদবাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ আছে। কৃষকদের স্বার্থে গত কয়েক বছর ধরে সংগঠনটির কোনো কর্মসূচি নেই।

এমনকি ১১১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির কেউ কৃষক নন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। কৃষক না থাকলেও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে ১৫১ করার প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধনীতে।

ক্যাসিনো-ঝড় যুবলীগের মতো কৃষক লীগের ওপর দিয়ে সেভাবে বয়ে না গেলেও সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গত কয়েক বছরের মধ্যে প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর সম্মেলন আয়োজনের কথা থাকলেও এবং চার বছর আগে মেয়াদ শেষ হলেও বর্তমান নেতৃত্ব সম্মেলন করতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় সাত বছর পর আজ ৬ নভেম্বর, বুধবার সংগঠনটির জাতীয় সম্মেলন হচ্ছে।

সংগঠন সূত্রমতে, বুধবার (৬ নভেম্বর) সকাল ১১টায় ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কৃষক লীগের সম্মেলন উদ্বোধন করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সম্মেলন অধিবেশনে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচন করা হবে।

মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, সম্মেলনের স্থলে ৯০ ফুট দীর্ঘ ও ৩০ ফুট প্রস্থ আধাপাকা ঘর নির্মিত হয়েছে। মূলত কৃষকের কাচারিঘরের আদলে তৈরি করা হয়েছে নান্দনিক এ মঞ্চ। মঞ্চের পাশে রাখা হয়েছে ‘আমার বাড়ি-আমার খামার’র একটি মডেল। এতে দেখা যায়, কৃষক তার উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করছেন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে স্থানে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গাড়ি থেকে নেমে মঞ্চে আসবেন, সে প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে সবুজ ঘাসে। রাস্তার চারপাশে লাগানো হয়েছে বাঁশবাগান, ফল ও ঔষধি গাছ। কৃষক লীগের সম্মেলনে যেন কৃষকের বাড়িতেই আসবেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা। সেভাবেই মঞ্চ ও প্রবেশপথ সাজানো হয়েছে।

কৃষক লীগের জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকার বিটু বলেন, ‘আমাদের সব কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সুন্দর করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে উপস্থাপন করব। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আমরা সারা ঢাকায় প্রচারণা চালিয়েছি। কৃষক লীগ মূলত গ্রামের সংগঠন, তাই অন্য  জেলাগুলোতে আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।

সেখানকার জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে পোস্টার লাগিয়েছি। আমন্ত্রণপত্র বিতরণ শেষ হয়েছে। মঞ্চও প্রায় প্রস্তুত। এবারের সম্মেলন অতীতের চেয়ে আরো অনেক সুন্দর হবে বলে আশা করছি।’

সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন পর সম্মেলনের তারিখ ঘোষিত হওয়ায় আওয়ামী লীগের অন্য সহযোগী সংগঠনগুলোর মতো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে কৃষক লীগেও। নতুন কমিটিতে স্থান পেতে বিভিন্ন পর্যায়ে চলে পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ। তদবির করেন মূল দলের নীতিনির্ধারকদের কাছেও। আবারো পদপ্রত্যাশী বিতর্কিত ও অভিযুক্ত বেশ কয়েক নেতা।

কৃষক লীগের বর্তমান সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা আবারো একই পদে থাকতে ইচ্ছুক। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শামসুল হক রেজা এবার সভাপতি পদ পেতে আগ্রহী। তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

এবার সভাপতি পদপ্রত্যাশী সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত দুই সহসভাপতি এমএ করিম ও কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা। সম্মেলনের তারিখ ঘোষিত হওয়ার পর থেকে দুজনেই তৎপর ছিলেন। এমএ করিম কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে গন্ডগোলে জড়িয়ে সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হন।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় বদিউজ্জামান বাদশাকে কৃষক লীগের সহসভাপতির পদ থেকে সরাসরি বহিষ্কার করা হয়।

সভাপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছে খান আলতাফ হোসেন ভুলু, ওমর ফারুক, ছবি বিশ্বাস, শেখ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, শরীফ আশরাফ হোসেন, আকবর আলী চৌধুরী এবং হারুন-অর-রশীদ হাওলাদার।

সাধারণ সম্পাদক পদের আলোচনায় আছেন সমীর চন্দ, বিশ্বনাথ সরকার বিটু, সাখাওয়াত হোসেন সুইট, আবুল হোসেন, গাজী জসীম উদ্দিন, আসাদুজ্জামান বিপ্লব ও আতিকুল হক আতিক।

সোনালীনিউজ/এমটিআই