মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

নতুন সাজে সেই ওসি মোয়াজ্জেম!

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৭ জুন ২০১৯, সোমবার ০১:২৭ পিএম

নতুন সাজে সেই ওসি মোয়াজ্জেম!

সাবেক সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম (ছবি : সংগৃহীত)

ঢাকা : দীর্ঘ ২০ দিন ধরে আত্মগোপনে। হঠাৎ খবর হাইকোর্টে আছেন ওসি মোয়াজ্জেম। গোপন এই তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতারে নামে পুলিশের গোয়েন্দা বাহিনী। তবে বড় চুল আর দাঁড়ির বেশে অনেকটা গড ফাদার স্টাইলে আদালত প্রাঙ্গণে কে এই লোক, হতবাক গোয়েন্দারা।   

গোয়েন্দারা জানান, নুসরাত হত্যার পর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় মোয়াজ্জেম হোসেনের যে ছবি ছড়িয়েছিল, রোববার (১৬ জুন) গ্রেফতার হওয়া মোয়াজ্জেমের সঙ্গে সেই চেহারার মিল খুঁজতে তাদের বেগ পেতে হয়েছে।

রোববার গ্রেফতারের কিছুক্ষণ আগেও তিনি জামিন আবেদনের জন্য হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। তবে সেখানে তাকে দেখে চিনতে পারেননি কেউ। হাইকোর্টে কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা অবাক হন দাড়ি-গোঁফ ওয়ালা মোয়াজ্জেমকে দেখে।

রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, শাহবাগ থানাধীন কদম ফোয়ারার সামনে থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আমাদের কাছে গোপন তথ্য ছিল তিনি সেখানে থাকতে পারেন। সেখান থেকেই তাকে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওসি মোয়াজ্জেমকে সাদা পোষাকে ডিবির একটি দল আদালত চত্বর থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সময় দেখা যায় তিনি (ওসি মোয়াজ্জেম) চুল, দাড়ি রেখেছেন অনেক বড়। প্রথমবারে যে কেউ দেখলে তাকে চিনতে পারবে না।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান জানান, উচ্চ আদালতের সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা তাকে নজরদারিতে রেখেছিল। গ্রেফতারের পর ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে শাহবাগ থানায় রাখা হয়।

এরই মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে নিতে তাকে থানা থেকে ব্যাপক নিরাপত্তায় প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। থানা থেকে বের হলে দেখা যায়, চোখে লাল সান গ্লাস আর দাড়িগোঁফে নতুন বেশের এক মোয়াজ্জেমকে।  

গ্রেফতারী পরোয়ানা জারির পর থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। আত্মগোপনে থাকতেই ভিন্ন বেশ নেন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।   

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা যায়, ওসি মোয়াজ্জেম শনিবার (১৫ জুন) রাতে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় জামিনের জন্য হাইকোর্টে যান। পরে জামিন শুনানির তারিখ পিছিয়ে সোমবার দিন ধার্য করেন আদালত। এ সময়ের মধ্যে কে বা কারা গোপনে পুলিশকে জানায়; ওসি মোয়াজ্জেম আদালত এলাকায় অবস্থান করছেন। এরপরই তিনি আদালত থেকে বের হয়ে যান। পরে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অভিযান চালিয়ে বিকাল চারটায় তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

এর পর সোমবার (১৭ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাকে ফেনী পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান দৈনিক অধিকারকে ফোনালাপে নিশ্চিত করেন।

শাহবাগ থানার পরিদর্শক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সোনাগাজী থানা পুলিশের একটি দল গতরাতেই ঢাকা আসে। আজ সকালে আমরা তাদের কাছে হস্তান্তর করে দিয়েছি। তারাই মোয়াজ্জেম হোসেনকে আদালতে হাজির করবে।’

এর আগে ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের পালানো ঠেকাতে যশোর সীমান্তে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। শুক্রবার (১৪ জুন) এ তথ্য জানায় বন্দর পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনের ওসি আবুল বাশার জানান, ‘মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জেলা পুলিশ সুপারের মাধ্যমে আমাদের কাছে তার পাসপোর্ট নাম্বার দেওয়া হয়েছে। মোয়াজ্জেম যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারেন সেজন্য চেকপোস্টে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।’

শার্শা থানার ওসি এম মশিউর রহমান জানান, মোয়াজ্জেমের গ্রেফতারির আদেশ তার বাড়ি যশোরে পাঠানোর পর সীমান্তবর্তী শার্শা, বেনাপোল, চৌগাছা থানাকে তা জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে তারা সতর্ক রয়েছেন।

সীমান্তে কড়া নজরদারি রয়েছে জানিয়ে যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সেলিম রেজা জানান, মোয়াজ্জেমের পালানো ঠেকাতে সীমান্তে রেড অ্যালার্ট জারি রয়েছে। সীমান্তে সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারি রয়েছে।

গত ১৫ এপ্রিল ওসির বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। ব্যারিস্টার সুমনের মামলাটি প্রথমে অভিযোগ আকারে ছিল। পরে পিটিশন মামলা হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন আদালত। ওসির বিরুদ্ধে থানায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির বক্তব্য ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দেওয়াসহ প্রত্যেকটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্তে প্রমাণিত সব তথ্য-উপাত্তসহ প্রতিবেদন আদালতকে দেওয়া হয়।

গত ২৭ মে ওসির বিরুদ্ধে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ৩১ মে পরোয়ানার চিঠি ফেনীর পুলিশ সুপার কাজী মনির-উজ-জামানের কার্যালয়ে যায়। তবে পুলিশ সুপার বিষয়টি অস্বীকার করতে থাকেন। তিনি ৩ জুন পরোয়ানা পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। এর দুই দিন পর রংপুর রেঞ্জে পরোয়ানা পাঠানো হয়। তখন কাজটি বিধি মোতাবেক হয়নি বলে জানায় রংপুর রেঞ্জ। পুলিশের এমন গড়িমসির মধ্যে আত্মগোপনে যান মোয়াজ্জেম। পরে তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।

গত ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে আলিম পরীক্ষা দিতে যান ওই ছাত্রী। এরপর কৌশলে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে চার-পাঁচজন বোরকা পরিহিত ব্যক্তি ওই ছাত্রীর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে উদ্ধার করে স্বজনরা সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাফি মারা যান। এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া ও মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।

সোনালীনিউজ/এমটিআই