সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬

বিশ্ব নদী রক্ষা দিবস আজ

নদীখেকোদের কাছে অসহায় কমিশন

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২০, শনিবার ০৩:৪৬ পিএম

নদীখেকোদের কাছে অসহায় কমিশন

ঢাকা : সরকার বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিলেও নদীখেকোদের নানা কৌশলের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে নদী রক্ষা কমিশন।

উজানে পানি কমে যাওয়া, ঘাটে ঘাটে বাঁধ, পলি ভরাট, দখল ও দূষণের কারণে গত চার দশকে দেশের ৪০৫টি নদ-নদীর মধ্যে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে ১৭৫টি। বাকি ২৩০টিও রয়েছে ঝুঁকির মুখে। ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ কমে গিয়ে হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুমে যা ৪ হাজার কিলোমিটারে এসে দাঁড়ায়। এমন বাস্তবতাকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ শনিবার পালিত হচ্ছে ২৩তম বিশ্ব নদী রক্ষা দিবস।

নদী রক্ষায় জাতীয় কমিশন গঠন করা হলেও সক্ষমতা দেওয়া হয়নি। ফলে ইচ্ছা থাকলেও রাঘব-বোয়ালদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামতে পারে না কমিশন। খোদ কমিশনের সদস্যদের মন্তব্য- আমাদের চেয়ে নদীখেকোদের প্রভাব অনেকগুণ বেশি। তাদের হাত অনেক লম্বা।

তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদী দখলমুক্ত করতে জিরো টলারেন্স প্রদর্শনের কারণে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মুক্ত হচ্ছে নদী। তবে নদী নীতিমালা অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণে অসাধুরা সুবিধা নিচ্ছে বলে নদী গবেষকরা অভিযোগ করেছেন।

এক সময়ের নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের নদীগুলোকে রক্ষা করাই এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, উজান থেকে এ দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণে পলি নেমে আসে, তা আর আগের মতো সহজে সাগরে মিশে যেতে পারে না।

সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা আয়োজনে দিবসটি পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল জানান, অনেক কর্মসূচি কাটছাঁট করা হয়েছে। মানববন্ধন, নৌকা প্রদর্শনসহ কিছু কর্মসূচি চলবে।

প্রকৌশলী তোফায়েল আহমদ বলেন, নদীগুলোর ওপর অসংখ্য সেতু ও বাঁধ নির্মাণ করার কারণে এ অবস্থা হয়েছে। এতে দুই পাড়ের জনগণের জীবনমান উন্নত হয় ঠিকই; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর গতিপ্রবাহ।

এ ছাড়া আবাসন প্রকল্প ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নদীকে প্রতিনিয়ত ভরাট করা হচ্ছে। জনবহুল এ দেশে তাই নদী রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্বের নদ-নদী রক্ষায় ১৯৯৭ সালে ব্রাজিলে ২০টি দেশের পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ডে অব অ্যাকশন ফর রিভার নামে একটি প্লাটফর্ম গঠিত হয়। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো অনেক দেশের প্রতিনিধি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), নদী রক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠন এদিন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।

বাপার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আবদুল মতিন বলেন, সরকার নদী রক্ষায় অনেক উদ্যোগ নিলেও সে অনুযায়ী সাফল্য আসেনি। ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত নদী রক্ষায় একটি যুগান্তকারী রায় দেন। তাতে নদীর সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্ত করতে বলা হয়। কিন্তু অনেক দখলদারকে সুবিধা দিতে ভুল সীমানা পিলার স্থাপন করে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা এ কাজটি বিতর্কিত করেন।

তিনি বলেন, ট্যানারি সরানো হয়েছে কিন্তু শোধনাগারের কাজ শেষ করতে ১৪ বছর লাগার কথা নয়। ধলেশ্বরীর দুঃখ বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পলিথিন প্রসঙ্গে ড. আবদুল মতিন বলেন, পলিথিনের কারখানা বন্ধ না করে মাঝে মধ্যে কিছু পলিথিন জব্দ করলে হবে না। পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছে কিন্তু আইনের বাস্তবায়ন নেই।

নদী রক্ষায় নৌ-মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন গঠিত জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরকার একটি নদী রক্ষা কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু এর কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। ১০০ বছরের জন্য নেওয়া সরকারের ব-দ্বীপ পরিকল্পনাও নদীর জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মনে করেন তিনি।

বাপার এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে ১৩ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর, কল-কারখানার ৬০ ভাগ, ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের ৩০ ভাগ এবং নৌযানের শতভাগ বর্জ্যই নদীতে ফেলা হয়। তবে নদী রক্ষায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।

দখল ও দূষণের বিরুদ্ধেও সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি ঢাকার চারদিকের নদ-নদীর দখলদার উচ্ছেদে কয়েক হাজার স্থাপনা ভেঙে দেয়া হয়েছে। নদীর দখল রোধে দুই পাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও সবুজায়নের পদক্ষেপের কথাও জানান তিনি।

খাল বিলীন বক্স কালভার্টে : আশির দশকে খাল ভরাটের মাধ্যমে ঢাকায় বক্স কালভার্ট নির্মাণ শুরু হয়। ধীরে ধীরে এই বক্স কালভার্টগুলো নগরবাসীর জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দেয়। উপলব্ধি ঘটে ঢাকার জলবদ্ধতার আরেক কারণ এই বক্স কালভার্টগুলোই। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বক্স কালভার্ট নির্মাণের নামে উন্মুক্ত খালের আশপাশের জায়গা ভরাট করে মুনাফা অর্জনই ছিল উদ্দেশ্য।

খিলগাঁও ফ্লাইওভার সংলগ্ন স্থান থেকে জোড়পুকুর মাঠ হয়ে তিলপাপাড়ার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ঢাকা ওয়াসার খাল। সরকারি এ খালটি ভরাট করে সেখানে বানানো হয়েছে মার্কেট। খাল ভরাট করে ফেলায় এখন সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিবন্দি হয়ে পড়ে পুরো এলাকার বাসিন্দারা।

রাসেল স্কয়ার থেকে গ্রিন রোড হয়ে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল, হাতিরপুলের মোতালেব প্লাজা থেকে সোনারগাঁও হোটেল, পরীবাগ, ইব্রাহিমপুর বাজার থেকে মিরপুর বাউনিয়া খাল, সেগুনবাগিচা থেকে আরামবাগ হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, খিলগাঁও থেকে তিলপাপাড়া পর্যন্ত কয়েকটি  বক্স কালভার্ট দেখা যায়।

কালভার্ট নির্মাণের পর ওয়াসার পক্ষ থেকে যে সতর্কতামূলক ফলক বসানো হয়, তাতে ‘খালের নাম : খিলগাঁও/বাসাবো’ উল্লেখ করে বলা হয়- খালের মধ্যে অবৈধ কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না, খালের মধ্যে বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না, খালের মধ্যে সাঁকো, পানির লাইন, ঘরবাড়ি, টয়লেট, দোকান, রিকশার গ্যারেজ স্থাপন দণ্ডণীয় অপরাধ।

ঢাকা ওয়াসার খাতায় এখনো খিলগাঁও-তিলপাপাড়া এলাকার খালটির অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে একটি নর্দমা মিলতে পারে; খালের কোনো চিহ্ন নেই। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বানানো এই কালভার্টগুলো কমবেশি ভরাট হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস জমে বিপজ্জনক পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে।

এই পথ ধরে গিয়ে দেখা যায়, স্থানে স্থানে বক্স কালভার্ট উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। উন্মুক্ত কালভার্টে ময়লা-আবর্জনার স্তর জমে তাতে পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ওয়াসা থেকে কালেভদ্রে পরিষ্কার করে যাওয়ার পর আবারো আবর্জনা ফেলার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ফলে অল্প কদিনেই তা আবার নর্দমা হয়ে ওঠে। খোলা কালভার্ট মশার প্রজননেরও সহায়ক ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্স কালভার্টের নেতিবাচক দিক বিবেচনা করে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বক্স কালভার্ট ভেঙে খাল উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বহুবার। তবে এই নির্দেশ বাস্তবায়নে এখনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও কার্যক্রম চোখে পড়ে না।

খিলগাঁও রেলগেট সংলগ্ন বক্স কালভার্টটি তিলপাপাড়া, দক্ষিণ গোড়ান ও উত্তর বাসাবোর মধ্য দিয়ে আগমন সিনেমা হলের পেছন দিয়ে মাণ্ডা-মুগদা, সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী হয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মিশেছে। খাল তো খেয়ে ফেলেছেই, নদীগুলোর দূষিত হওয়ার সুযোগ বাড়িয়ে তুলছে এই বক্স কালভার্টগুলো।

সোনালীনিউজ/এমটিআই