রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

নাজুক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২০, রবিবার ০৫:২৬ পিএম

নাজুক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা

ফাইল ছবি

ঢাকা : দেশে করোনার প্রাদুর্ভাবের দেড় মাস পেরোলেও এখনো রোগটির চিকিৎসায় সঠিক কোনো ব্যবস্থাপনা আসেনি। করোনার জন্য নির্দিষ্ট হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা যায়নি।

ইতিমধ্যেই ক্লান্ত হয়ে আসা এসব হাসপাতালের কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সদের টানা আরও কত দিন সেখানে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং তাদের বিশ্রামে পাঠিয়ে নতুন চিকিৎসক-নার্সদের আনা হবে কি না, সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই।

এমনকি ভর্তি হওয়া রোগীদের সুস্থ করে তুলতে কীভাবে চিকিৎসা ও সেবা দেওয়া যেতে পারে, এ নিয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই সরকারের পক্ষ থেকে। ফলে এসব হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের যেমন সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, তেমনি করোনা রোগীদের ভর্তি না করিয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও আসছে।

সরকারি জেনারেল ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সাধারণ রোগীর শরীরে করোনা শনাক্ত হলে, তাদের চিকিৎসার ব্যাপারেও নির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন তৈরি করেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ফলে এসব হাসপাতালের চিকিৎসকরা নিজেদের মতো করে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন রোগীদের। সে ক্ষেত্রে অনেক হাসপাতালে সাধারণ রোগীরা ভর্তি হতে পারছে না। আবার তথ্য গোপন করে ভর্তি হওয়া রোগীদের থেকে করোনার সংক্রমণ ছড়াচ্ছে অন্যদের মধ্যে। ফলে ভয় পেয়ে অনেক হাসপাতাল করোনা শনাক্ত পরীক্ষা ছাড়া রোগী ভর্তি করছে না। ফলে জটিল সাধারণ রোগীরাও মুমূর্ষু হয়ে পড়ছে।

সবচেয়ে বেশি অব্যবস্থাপনা বেসরকারি হাসপাতালে। এসব হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের করোনা শনাক্তের ন্যূনতম ট্রায়াগ সেন্টার (যেখানে রোগীর সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে করোনা সন্দেহজনকদের শনাক্ত করা হয়) না থাকায়, একের পর এক এসব হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। আবার করোনা জানলে চিকিৎসার মাঝপথেও রোগীদের ছুটি দিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। এমনকি এসব হাসপাতাল থেকে যেসব রোগী বিশেষায়িত হাসপাতালে আসছে বা পাঠানো হচ্ছে, সেসব রোগীর ক্ষেত্রে ন্যূনতম কোনো তথ্য দিচ্ছে না বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া রোগীরা করোনায় শনাক্ত হওয়ার ভয়ে তার রোগ ও এলাকাসংক্রান্ত তথ্য গোপন করছে। রাজধানীর যেসব হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, এর অনেকগুলোতেই রোগীদের পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত ভর্তি করা হচ্ছে না। আবার নিজ দায়িত্বে নমুনা নেওয়া সন্দেহজনকদের পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলে তাও জানানো হচ্ছে না। ফলে এসব রোগী যেমন অন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছে না, তেমনি মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে।

করোনা চিকিৎসার এমন অব্যবস্থাপনায় উদ্বিগ্ন দেশের চিকিৎসকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সরকারি বিশেষায়িত ও সাধারণ হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেন, সরকারের উচিত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করা। করোনায় এসব হাসপাতাল এমন মহামারীর সময় সাধারণ রোগীদের কীভাবে চিকিৎসা দেবে, সেটা নির্ধারণ করা। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও কাঠামো গড়ে তোলা। তা না হলে করোনা চিকিৎসায় বিপর্যয় নেমে আসবে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আযাদ বলেন, করোনাভাইরাস মিউটিশন হচ্ছে। তার জৈবিক পরিবর্তন বাংলাদেশে মিউটিশন হয়ে এমন রূপ নিয়েছে, দেখা যাচ্ছে, ৩০-৪০ বছর বয়সী তরুণরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

তার মানে অন্য দেশে যেটা ছিল, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের অ্যাটাক করবে। কিন্তু এখানে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি তাদের আক্রান্ত করছে। বিদেশে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, বয়স্ক লোক, হার্টের রোগ আছে, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে পর্যুদস্ত, তাদের হচ্ছে। বাংলাদেশে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি তাদের সঙ্গে এই ভাইরাসের সেল পর্যায়ে সংঘর্ষ হচ্ছে।

সেলের সাইকোটাইন নামে একটি জিনিস আছে, সেটা  যার যত বেশি নিঃসরণ হবে, তার সেল তত বেশি ড্যামেজ হবে। বাংলাদেশে এ কারণেই কম বয়সীদের হচ্ছে। এ ছাড়া প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যাচ্ছে। হার্টের রোগীদের করোনা হচ্ছে। লাংসে ইনফেকশন হয়ে নিউমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে।

করোনার কিন্তু সাধারণ লাংসে অ্যাটাক হওয়ার কথা, গলায় ব্যথা হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক করোনা রোগীর ডায়রিয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের শিশু কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, এই মহামারীর সময় অবশ্যই কোনো রোগীকে বিনা চিকিৎসায় বিদায় করা যাবে না। সবার চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের সবাইকে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

দেশে করোনার সংক্রমণ, উপসর্গ ও চিকিৎসা জটিল হচ্ছে। কারণ করোনা কমিউনিটিতে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে। কে কোথায় থেকে কার মাধ্যমে সংক্রমিত হচ্ছে, এটা এখন আর বোঝা যাচ্ছে না।

আপনারা কীভাবে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, আমরা নিজেরা কিছু পদ্ধতি ও নিয়ম করে নিয়েছি। আমরা ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নিয়ে রোগীদের সেবা দিচ্ছি। চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভর্তি করানোর পর রোগীদের করোনা পরীক্ষা করাচ্ছি। নিজেরাও পরীক্ষার ফল সংগ্রহ করছি। নেগেটিভ এলে তো সমস্যা নেই। পজিটিভ এলে কনজারভেটিভ বা রক্ষণাত্মক চিকিৎসায় চলে যাচ্ছি। এমনভাবে ওষুধ দিচ্ছি, যাতে করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার পর তার অন্য রোগের চিকিৎসা করা যায়।

তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা চিকিৎসা বা সাধারণ রোগীদের করোনা শনাক্তের ব্যাপারে কোনো দায়িত্ব নিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। এ ব্যাপারে একটি উদাহরণ দিয়ে এক বিশেষায়িত হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, মিরপুর এলাকার একটি বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল থেকে এক রোগী এলেন। আমাদের ট্রায়াগ রুমে তাকে করোনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম। কিন্তু তারা তথ্য গোপন করেছেন।

এমনকি যে হাসপাতালে থেকে এসেছেন, তারাও ওই রোগীর করোনার ব্যাপারে কোনো তথ্য জানাতে পারল না। অথচ সেখানে কয়েক দিন চিকিৎসা নিয়ে বেশ বড় অঙ্কের অর্থ বিল গুনতে হয়েছে। পরে আমরা রোগীকে সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার করোনা পরীক্ষা করি এবং পজিটিভ আসে। আমরা তাকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দিয়ে করোনা হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছি।

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলো যদি এমন করে, তাহলে তারা নিজেরা যেমন বিপদে পড়বে, তেমনি অন্যদেরও বিপদে ফেলবে। তাই তাদের সঠিক ব্যবস্থাপনা দরকার।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ব্যবসার স্বার্থে বেসরকারি হাসপাতাল দায়িত্বসহকারে করোনা রোগী শনাক্তের কাজটা করছে না। তারা চাইছে করোনা চিকিৎসা থেকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হোক। কারণ তারা বুঝে গেছে এ রোগের চিকিৎসায় ব্যবসার চেয়ে ঝুঁকি বেশি। তবে তাদের নিজেদের রোগীদের জন্যই উচিত করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা করা। তারা এ ধরনের সন্দেহজনকদের জন্য আলাদা কর্নার করে ফেলুক। রূপরেখা দিক। এ ধরনের রোগী সেদিক দিয়ে ঢুকবে, যেখানে ফ্ল্যাগ থাকবে।

দায়িত্ব নিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার উদাহরণ টেনে ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, একটি স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতাল থেকে এক বাচ্চা রোগী এলো আমাদের হাসপাতালে, তাকে কিন্তু ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করোনার পরীক্ষা করিয়েছে, কিন্তু ফল জানায়নি। আমি তখন নিজ দায়িত্বে ওই হাসপাতালে ফোন করে জানলাম সে নেগেটিভ। এই না জানানোর কারণে ওই রোগী একদিকে যেমন মানসিকভাবে কষ্ট পেল, তেমনি সঠিক সময়ে তার হার্টের চিকিৎসাও শুরু করতে পারলাম না।

এমনকি সাধারণ ও বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালে কোনো ট্রায়াগ সেন্টারও নেই জানিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ট্রায়াগ সেন্টারে প্রথমে রোগীর সঙ্গে কথা বলে, উপসর্গ বুঝে নেওয়া হয়।। প্রথমে তারা শনাক্ত করে দেয় এই রোগীটা করোনার রোগী কি না।

রোগীর নাম, এলাকার নাম, রোগীর ইতিহাস জিজ্ঞেস করবে। যদি করোনার জন্য সন্দেহ হয়, তাহলে তাকে করোনার জন্য নির্দিষ্ট হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবে।

কিন্তু অনেক রোগী ট্রায়াগ সেন্টারেও তথ্য গোপন করছে জানিয়ে ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, আমাদের এখানে শিশু হাসপাতাল থেকে একটি রোগী এলো। সে ট্রায়াগ সেন্টারকে ফাঁকি দিয়ে এসেছে। তাই সাধারণ রোগী ভেবেই আমাদের সিস্টার ওর গায়ে হাত দিয়েছে। ওর মা-বাবাও কিছু বলেনি।

যখন নার্স ওই বাচ্চার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, এমন সময় বাচ্চার বাবা বলে তাদের বাসা নারায়ণগঞ্জে ও নিউমোনিয়া। সিস্টারের হাতে গ্লাভস মুখে মাস্ক কিছুই ছিল না। সিস্টার এ কথা শোনার পর কাঁদতে কাঁদতে ফোন করে।

পরে আমি তাকে পিপিই পরে নিতে বলি, হাত ভালো করে ধুয়ে গ্লাভস পরতে বলি। রোগীকে ফেরানো যাবে না। রোগীকে অ্যান্টিবডি ইনজেকশন শট দিয়ে দিই। আর ওই এলাকার যে ডাক্তার আছে, তাকে বলে দিই ওকে ক্যানেলা দিয়ে প্রতিদিন এই ইনজেকশন দিতে হবে। এভাবে তাকে চিকিৎসা দিয়ে পাঠিয়ে দিই। পরে ওই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে ও তার করোনা পরীক্ষায় নেগেটিভ আসে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনটি বিশেষায়িত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নিজেদের দায়িত্বে নিজেদের রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ড খুলেছে। সেখানে রোগীদের রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তারা করোনা রোগী পেলেও ওই ওয়ার্ড বা আইসিইউ লকডাউন করছে না। তারা ওয়াচ করে প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে।

কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, আমরা যদি এখানে মাসের পর মাস থাকি, আমরা আমাদের মূল চিকিৎসা ভুলে যাব। সরকারের উচিত তিন মাস পরপর বদলি করা। আমাদেরও তো জীবন আছে। নতুন গ্রুপ আসবে। আমরা মানসিকভাবে অস্থির হয়ে আছি। পরিবারের সঙ্গে দেখা নেই। বাসায় যেতে পারি না। পরিবারের সঙ্গে মিশতে পারছি না। হোটেল-হাসপাতাল। ছেলেমেয়েদের দেখতে পারছি না। এটা তো জীবন নয়।

সোনালীনিউজ/এমটিআই