শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২০, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

নামে লেম্বুর বন, বাস্তবে ধূ ধূ বালুচর

কলাপাড়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১২ মার্চ ২০২০, বৃহস্পতিবার ০১:৫৩ পিএম

নামে লেম্বুর বন, বাস্তবে ধূ ধূ বালুচর

কক্সবাজার : কুয়াকাটার অন্যতম পর্যটন স্পট লেম্বুর বন। হাজারো বৃক্ষরাজির সারি, পাখির কলরব আর  সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য উপভোগের জন্য শেষ বিকালে পর্যটকদের ঢল নামতো এই বনাঞ্চলে।

কিন্তু সাগরের অব্যাহত ভাঙ্গনে ক্রমশ সৈকত ঘেষা এই বনাঞ্চলটির দুই তৃতীয়াংশ বিলীন হয়ে গেছে। এখন গোটা সৈকত জুড়ে শুধুই পড়ে আছে ভেঙ্গে যাওয়া গাছের গুঁড়ি বা গোড়া। ভাটায় সৈকতে এ গাছের গুড়ি দেখা গেলেও জোয়ারের সময় সাগরের পানিতে তলিয়ে থাকায় এখন পর্যটকদের কাছে এই বনাঞ্চল ঘেষা সৈকতটি দূর্ভোগ আর আতঙ্কের সৈকতে পরিণত হয়েছে।

 প্রতিনিয়তই এ গাছের গুঁড়িতে পা আটকে পর্যটকরা দূর্ঘটনার শিকার হলেও এ গাছের গুঁড়ি উত্তোলনে প্রশাসন কিংবা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে রাতের আঁধারে ও সমুদ্রে জোয়ারের সময়। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মহীপুর বন কর্মকর্তা পর্যটকদের এ দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে বলেন খুবই দ্রুতই এ বনাঞ্চলে নতুন করে বৃক্ষ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কুয়াকাটা সৈকত থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে লেম্বুর বনাঞ্চলটি এখন লেম্বুর চর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে পর্যটকদের কাছে। ঝাউ, ছইলা, কেওড়া, গড়ান, নারিকেলসহ হাজার হাজার ফলজ ও বনজ প্রজাতির গাছের সমাহার ছিল এই বনাঞ্চলে। এক যুগ আগেও এই বনে দেখা মিলতো বিভিন্ন বন্য পশু পাখি।

কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সাগরের ঢেউয়ের ঝাপটায় মূল থেকে বালু সরে বাগানের গাছ উপড়ে পড়ে সৈকতে ভাঙনের কারণে বিলীন হয়ে যাওয়ায় এখন গোটা বনাঞ্চল এলাকা বালুচরে পরিণত হয়েছে। কোথাও কোথাও সৈকতে দু’একটি গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হিসেবে।

স্থানীয়রা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবং সমুদ্রের তলদেশে পলি জমায় পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপর্যস্ত হচ্ছে প্রকৃতি। ফলে সাগরের বিশাল বিশাল ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ছে। এ কারণে গত ১১ বছরে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানসহ সংরক্ষিত বনের এক হাজার ১০০ একর বনভূমি ও শত শত বসত ঘর সাগরে বিলীন হয়েছে।

কলাপাড়ার মহিপুর বন বিভাগ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কুয়াকাটায় বনের আয়তন দুই হাজার ১৬৫ দশমিক ৮০ একর। ২০০৫ সালে সরকার খাজুরা, গঙ্গামতি ও লেম্বুর বনকে নিয়ে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে। পর্যটকদের কাছ আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে প্রাকৃতিক বনসংলগ্ন এ সৈকত ঘেঁষে ১০ হাজার হেক্টর ভূমির ওপর ঝাউ-বাগান গড়ে তোলা হয়। তবে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আয়লা, মহাসেন ও সর্বশেষ বুলবুল তান্ডব ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের ঝাপটায় ভাঙনের মুখে পড়ে বনাঞ্চল।

লেম্বুর বনে ঘুরতে আসা পর্যটক সাহেদ কায়সার, সবুজ, সাইফুল ইসলাম শাহীন বলেন, তারা বনাঞ্চল মনে করে এখানে ঘুরতে এসেছেন, কিন্তু এসে দেখেন বালু চর। গোটা সৈকতে হাজার হাজার গাছের গোড়া পড়ে আছে। জোয়ারের সময় এ সৈকতে নামলে গাছের গুঁড়িতে পা আটকে দুর্ঘটনার কবলে পড়ছেন।

পর্যটকরা আরও বলেন, কয়েক বছর আগেও তারা যখন কুয়াকাটায় ভ্রমণে এসেছিলেন তখন হাজারো বৃক্ষরাজির সমাহার ছিলো এখানে। লেমউসহ বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছের সারি ছিলো। মাঝে মধ্যে বন্য পশু পাখিও দেখা যেত। কিন্তু মাত্র এক দশকের মধ্যে গোটা বনাঞ্চলের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তারা হতাশ।

কুয়াকাটা সৈকতে পর্যটকদের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ঘুড়িয়ে দেখাতে নিয়োজিত ট্যুরিস্ট গাইডরা বলেন, তারা লেম্বুর বনে পর্যটকদের নিয়ে আসেন, কিন্তু পর্যটকরা এখানে এসে প্রশ্ন করে বনাঞ্চল কোথায়। আগে এখানে প্রচুর বনাঞ্চল ছিল। এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু গাছই অবশিষ্ট দাড়িয়ে আছে।

কুয়াকাটার বাসিন্দারা বলেন, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ছাড়া শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে কুয়াকাটায় প্রতি বছর প্রায় কোটি পর্যটকের সমাগম ঘটে। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই আজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সাগরের ভাঙ্গনে বনাঞ্চল ছাড়াও বিলীন হচ্ছে মূল সৈকত। সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে সৈকতে প্রচুর বৃক্ষ রোপন করে আবার তৈরি করা এবং ভেঙ্গে পড়া গাছের গুঁড়ি উঠিয়ে পর্যটকদের নিরিবিলি পরিবেশে ভ্রমণের ব্যবস্থা করা।

মহিপুর বন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকার জলবায়ু পরিবর্তণের ঝুঁকি থেকে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে প্রায় ৩০ একর জমিতে নতুন করে বনাঞ্চল সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে লেম্বুর বন এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার ঝাউসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ গাছ রোপন করা হবে। এ বর্ষা মেীসুমেই এই বৃক্ষ রোপনের কাজ শুরু হবে ।

এ ব্যাপারে কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনিবুর রহমান বলেন, রাখাইন লেম্বু মগের নামানুসারে লেম্বুর বনাঞ্চল হলেও সেই বনটির অধিকাংশ বনাঞ্চল বিলীন হয়ে গেছে সাগরের ভাঙ্গনে। সরকার এ বনাঞ্চলের বাকি অংশ রক্ষা এবং নতুন করে বনাঞ্চল তৈরি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। খুব শীঘ্রই লেম্বুর বনের বালু চরে নতুন করে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ রোপন করা হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue