শনিবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬

লেড-ক্যাডমিয়াম ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি

নিকোটিনের থেকেও বড় বিষ সিগারেটে!

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, মঙ্গলবার ০৪:২০ পিএম

নিকোটিনের থেকেও বড় বিষ সিগারেটে!

ঢাকা : সিগারেটের তামাকে নিকোটিনের উপস্থিতি থাকায় ক্যানসারসহ নানা মরণব্যাধি হয়, সেটা প্রায় সবারই জানা। তবে এর থেকেও ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে দেশে পরিচালিত কিছু গবেষণায়।

সেসব গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে উৎপাদিত সিগারেটের তামাকে ভারী ধাতুর উপস্থিতিও রয়েছে। যার মধ্যে লেড, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়াম উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ এসব ভারী ধাতুর কারণে সিগারেটে মৃত্যুর হার আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

তবে ওই গবেষণায় ভারী ধাতুর উপস্থিতির প্রমাণ মিললেও সুস্পষ্টভাবে এর কারণে কী মাত্রায় ক্ষতি হচ্ছে, তা নিরূপণ করা হয়নি। এ জন্য সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়াও আলাদা গবেষণার পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, দেশের ছয়টি ব্র্যান্ডের সিগারেট পরীক্ষা করা হয়েছিল, ওই গবেষণার জন্য। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গবেষণার জন্য ওই পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ শিল্প ও গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), অ্যাটমিক এনার্জি সেন্টার, ওয়াফেন রিসার্চ ল্যাব। সে সময় বিসিএসআইআর নমুনাগুলোর প্রত্যেকটিতে ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি আর তিনটি নমুনা বাদে সবগুলোতেই লেডের উপস্থিতি পাওয়া যায়। অ্যাটমিক এনার্জি সেন্টারের পরীক্ষায় সবগুলোতেই মেলে তিন ভারী ধাতু। আর ওয়াফেন রিসার্চ ল্যাব প্রত্যেকটি নমুনায় লেড ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি পেয়েছে। ওই সব নমুনায় ভারী ধাতুর মাত্রা ছিল বিপজ্জনক। ব

লা হচ্ছে, দেশে উৎপাদিত সিগারেটের তামাকপাতা পরীক্ষা করে লেড, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা যথাক্রমে ০.৪৯-১০০.৯৫ গ্রাম/কেজি, ০.৪০৫-১.৩৭ গ্রাম/কেজি এবং ০.৮২-১.৪৯ গ্রাম/কেজি পাওয়া গিয়েছিল। যা স্বাভাবিক মাত্রার থেকে বহুগুণ বেশি।

এ বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুব কবির বলেন, সিগারেটের তামাকে উপস্থিত এসব হেভি মেটাল ধূমপায়ী ও পরোক্ষ ধূমপায়ীদের জন্য ক্ষতিকর। তবে তা কী মাত্রায় ক্ষতিকর, তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারণ করা অতি আবশ্যক।

এ ছাড়া এ বিষয়ে জনগণকে সতর্ক করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অনুরোধ করা হয়েছে।

এর আগে, হাকিমপুরি জর্দায় মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যায় বলে জানিয়েছিল নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। দুই ধাপে পরীক্ষা করে লেড, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়াম পেয়েছে সংস্থাটি। সরকারি এ সংস্থা বাজার থেকে এ জর্দা তুলে নিতে বলেছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে। এ বিষয়ে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা করা হয়েছে।

এদিকে ২০১৮ সালের সর্বশেষ তথ্য বলছে, তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৬১ হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ধূমপানের কারণে বাংলাদেশে ১২ লক্ষাধিক মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮২ হাজার মানুষ অকালপঙ্গুত্বের শিকার হয়। তামাকজনিত রোগব্যাধি ও অকালমৃত্যুর কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, তামাক সেবনে মানুষ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়। এসব রোগের মধ্যে ফুসফুস ক্যানসার ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগ ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পলমনারিডিজিজ (সিওপিডি) হয়।

এ ছাড়া মুখ, খাদ্যনালি, পাকস্থলী ও যকৃতের ক্যানসারের জন্য তামাক সরাসরি দায়ী। এর পাশাপাশি মূত্রনালি ও নারীদের জরায়ুর ক্যানসারে পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালন করে তামাক। সঙ্গে হূদরোগ, স্ট্রোক, বার্জাজ ডিজিজের মতো বহু রোগ হয় এই তামাকের কারণে।

এমন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) অনুযায়ী, বর্তমান দেশে মোট তামাক ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৭৮ লাখ, যা মোট জনগোষ্ঠীর (১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব) ৩৫.৩ শতাংশ। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার অনেক বেশি। প্রায় ৪৮ শতাংশ অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী তামাক ব্যবহার করে, যা খুবই উদ্বেগজনক।

গবেষণা বলছে, দেশে অতি উচ্চবিত্তের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ২৪.৮ শতাংশ। অন্যদিকে শহরের ২৯.৯ শতাংশ তুলনায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৩৭.১ শতাংশের মধ্যে তামাক ব্যবহারের উচ্চ হার এবং নারীদের ২৪.৮ শতাংশের মধ্যে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের উচ্চ প্রবণতা আশঙ্কাজনক।

বাংলাদেশে ব্যাপক হারে তামাক ব্যবহারের অন্যতম প্রধান কারণ তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, পৃথিবীতে যেসব দেশে সিগারেটের দাম অত্যন্ত কম, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিয়ানমার, নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ার পরই বাংলাদেশে সস্তা ব্র্যান্ডের সিগারেট পাওয়া যায়। বিড়ি ও ধেঁয়াবিহীন তামাকপণ্য এখানে আরও সস্তা।

তামাকবিরোধীরা বলছে, সরকারের এখন সময় হয়েছে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। তামাক গ্রহণ করলে তা কতটা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করে, সে ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় দেশে তামাকের ব্যবহার একেবারে নিষিদ্ধ করা। এ জন্য তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। সিগারেটসহ তামাকজাতপণ্যের আমদানি বন্ধ করতে হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই