রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

নিঝুম দ্বীপের সাত-সতেরো

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০১৯, শনিবার ১২:৪৫ পিএম

নিঝুম দ্বীপের সাত-সতেরো

ঢাকা : বঙ্গোপসাগরের কোলে জেগে ওঠা এক নিঝুম অঞ্চল নিঝুম দ্বীপ। প্রায় ১৪ হাজার ৫০ একরের দ্বীপটি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে জেগে ওঠে। প্রথমে স্থানীয় জেলেরা দ্বীপটি আবিষ্কার করে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের আগপর্যন্ত কোনো লোকবসতি ছিল না, তাই দ্বীপটি নিঝুমই ছিল। বাংলাদেশের বন বিভাগ সত্তরের দশকে কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চার জোড়া হরিণ ছাড়ে। নিঝুম দ্বীপ এখন হরিণের অভয়ারণ্য। হরিণের সংখ্যা প্রায়  ৩০ হাজার। নিঝুম দ্বীপে ৯টি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। এই গুচ্ছগ্রাম ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ছোটখাটো ঝুপড়ি ঘর।

শীতকালে এখানে হাজার হাজার অতিথি পাখির সমাবেশ ঘটে। জেলেদের ধরা নানা ধরনের মাছ শুকানোর জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান হিসেবে ব্যবহূত হতে থাকে। নিঝুম দ্বীপে ছয়টি বড় বাজার আছে। বাজারগুলোতে প্রধানত চাল-ডাল, ওষুধ, মনোহারি সামগ্রী ও কিছু খাবারের দোকান আছে। গোটা দ্বীপাঞ্চলে শুধু এই বাজারগুলোতেই জেনারেটর উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে, আছে সৌর বিদ্যুৎ।

সরকারের বন বিভাগ নিঝুম দ্বীপে উপকূলীয় বনাঞ্চল গড়ে তুলেছে। এখানে বন বিভাগের একটি বাংলোও রয়েছে। এখানকার বন এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার চিত্রা হরিণ আছে। গাছগাছালির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গাছ কেওড়া, যা স্থানীয়ভাবে কেরফা নামে পরিচিত।

এই দ্বীপে রয়েছে প্রচুর হরিণ, যা বন বিভাগ দেখাশোনা করে। আগামী দিনে নিঝুম দ্বীপ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ২০০১ সালে বাংলাদেশ সরকার নিঝুম দ্বীপের বনাঞ্চলকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করেছে। নিঝুম দ্বীপে হরিণ এবং মহিষ ছাড়া অন্য কোনো হিংস্র প্রাণী নেই। নিঝুম দ্বীপে রয়েছে প্রায় ৩৫ প্রজাতির পাখি। এ ছাড়া শীত মৌসুমে অজস্র প্রজাতির অতিথি পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হয় নিঝুম দ্বীপ। জোয়ারের পানিতে বয়ে আসা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এদের একমাত্র খাবার।

এখানে রয়েছে মারসৃপারি নামে একধরনের মাছ, যাদের উভচর প্রাণী বলা হয়। পাঁচ বছর পর্যন্ত বাঁচে এই মারসৃপার, ৬-৯ ইঞ্চি লম্বা হয়। বর্ষা মৌসুমে ইলিশের জন্য নিঝুম দ্বীপ বিখ্যাত। এ সময় ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা নিঝুম দ্বীপে মাছ কিনতে আসেন। এ ছাড়া শীত কিংবা শীতের পরবর্তী মৌসুমে নিঝুম দ্বীপ চেঁউয়া মাছের জন্য বিখ্যাত। জেলেরা এই মাছ ধরে শুঁটকি তৈরি করেন।

ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন হাতিয়ার উদ্দেশে লঞ্চ ছাড়ে সন্ধ্যা ৬টায়। নিঝুম দ্বীপে পর্যটকদের থাকার জন্য অবকাশ পর্যটন নির্মাণ করেছে বন বিভাগের বাংলো ছাড়াও নিঝুম রিসোর্ট এবং নামার বাজার মসজিদ কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করেছে মসজিদ বোর্ডিং। অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে জোয়ারভাটার ওপর নির্ভর করতে হয় নিঝুম দ্বীপের মানুষদের। হাতিয়া, ভোলা কিংবা ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে তাদের পুরোপুরি জোয়ারভাটা মেনে চলতে হয়। ঢাকায় যেতে হলে তাদের সকাল ৯টার পর হাতিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করতে হয়। প্রায় ২-৩ ঘণ্টা পর ট্রলার হাতিয়া পৌঁছায়।

অতঃপর পাওয়া যায় ঢাকাগামী লঞ্চ, যেটি প্রতিদিন একবেলা ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে। এই লঞ্চটি বরিশাল এবং ভোলা হয়ে ঢাকায় পৌঁছায় বিধায় নিঝুম দ্বীপের মানুষজন ভোলা কিংবা বরিশালে যেতে পারেন এই লঞ্চে করেই। এছাড়া হাতিয়া কিংবা ঢাকায় আসার জন্য রয়েছে বিকল্প পথ। বন্দরটিলা থেকে নদী পার হয়ে হাতিয়ায় পৌঁছতে হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন যানবাহন পার করে প্রথমে হাতিয়া শহরে, তারপর লঞ্চে পার হয়ে মাইজদী অতঃপর ঢাকায় পৌঁছতে হয়।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপের শতকরা ৯৫ জন লোক মারা যায়। তবে ’৯১-এর পর এখানকার কোনো লোক সাপের কামড়েও মারা যায়নি। অবশ্য বিরূপ আবহাওয়ায় গভীর সমুদ্রে জেলেদের নৌকাডুবির কিছু ঘটনা রয়েছে। যদিও আশঙ্কা করা হয়, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের কিছু অংশ যদি ডুবে যায় তাহলে নিঝুম দ্বীপ সে আওতায় পড়বে। তবে বাস্তবতা হলো, নিঝুম দ্বীপের অদূরে বদনার চরের পাশে গড়ে উঠছে আরেক বাংলাদেশ। ভাটির সময় জেগে ওঠে বিশাল ভূমি। ধারণা করা হয়, এর আয়তন ৬০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

নিঝুম দ্বীপে আপনি একই সঙ্গে পাবেন বন, সমুদ্র এবং দ্বীপ— তিন ধরনের ল্যান্ডস্কেপ। আপনি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মতো অনুভূতি পাবেন কারণ এটা চারদিক সমুদ্রবেষ্টিত। সুন্দরবনের অনুভূতি পাবেন কারণ এখানে ম্যানগ্রোভ বন ও প্রচুর হরিণ দেখা যায় (তবে রয়েল বেঙ্গল টাইগার নেই)। এখানে ঢাকা থেকে আপনার পথ কমে যাবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অর্ধেক। তবে সময় কমবে না। ক্যাম্পিং হতে পারে খুব মজার একটা আইডিয়া। আপনাকে ক্যাম্পিংয়ের জন্যে স্থান নির্বাচনে তেমন চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। পুরো দ্বীপেই প্রায় সব জায়গায় আপনি ক্যাম্পিং করতে পারেন চাইলে।

কয়েকভাবে নিঝুম দ্বীপে যেতে পারেন। ঢাকা থেকে লঞ্চে সদরঘাট থেকে সোজা চলে যাবেন হাতিয়া। হাতিয়া থেকে বোট বা ট্রলারে যেতে পারেন নিঝুম দ্বীপ বন্দরটিলা। বন্দরটিলা হলো নিঝুম দ্বীপের প্রধান সৈকত। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় লোকদের জন্যে হাতিয়া দিয়ে গাড়িতে চড়ে দ্বীপের শেষ মাথায় চলে গেলে সেখান থেকে সামুদ্রিক অংশ নদীর মতো নৌকা পার হয়ে উঠতে হবে নিঝুম দ্বীপে। তারপর দ্বীপের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত নৌকা, ট্রলার, রিকশা, ভ্যান বা হেঁটে পার হওয়া যাবে।

এ ছাড়া বাসে চড়ে নোয়াখালী, মাইজদী বা সোনাপুর যেতে পারেন। সেখান থেকে সিএনজিতে যেতে হবে ঘাটে। ঘাট থেকে নৌকা, স্পিড বোট বা ট্রলারে চড়ে হাতিয়া হয়ে বা সরাসরি যেতে পারেন নিঝুম দ্বীপ। তবে সকাল আটটার মধ্যে পৌঁছে যেতে পারলে যেতে পারবেন সি-ট্রাকে। সি-ট্রাকে উঠে হাতিয়া হয়ে নিঝুম দ্বীপ।

সোনালীনিউজ/এমটিআই