শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬

নির্বাচন কমিশনারের ‘উদ্বেগ’ আমলে নিচ্ছে না আ.লীগ

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২০, বৃহস্পতিবার ০৫:২৮ পিএম

নির্বাচন কমিশনারের ‘উদ্বেগ’ আমলে নিচ্ছে না আ.লীগ

ঢাকা : ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী কার্যক্রম ও প্রচারে ‘অংশ নেওয়ার’ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার যে ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন, তা আমলে নিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। তার ‘উদ্বেগ’ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নয় বলে মনে করে ক্ষমতাসীন দলটি।

এর আগে বিভিন্ন সময়ের মতো আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘অহেতুক বিতর্কে’ জড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি এবারো এমন ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন কি না, সেদিকেও নজর রাখছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।

ইসির আচরণবিধি অনুযায়ী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারে নিষেধাজ্ঞা থাকা নিয়ে সরকারি দলের নেতাদের আপত্তি থাকলেও তারা ওই নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ইসির কারো সঙ্গে বিতর্কে জড়াতে চাই না। অতীতে মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য নিয়ে তর্কের রেশ ধরে তাকে পদত্যাগ করে এ জাতীয় বক্তব্য দেওয়ার কথাও দলের কোনো কোনো নেতা বলেন।

এ ধরনের বিতর্কে এ মুহূর্তে না জড়ানোর বিষয়ে সতর্কতা আছে দলে। নির্বাচনের মাঠে ইসির আচরণবিধি মেনে চলার বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের খেয়াল আছে বলেও দাবি নীতিনির্ধারকদের।

ইসির সচিবালয় সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী, সরকারি সুবিধাভোগী অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে মন্ত্রী ও সদস্যরাসহ আরো নির্ধারিত কয়েক পদে দায়িত্বরতরা নির্বাচনের প্রচার বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না।

গত বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদাকে লেখা একটি অনানুষ্ঠানিক চিঠিতে এ প্রসঙ্গে নিজের ‘উদ্বেগের’ কথা জানান মাহবুব তালুকদার।

চিঠিতে তিনি বলেন, ‘আমি উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি আসন্ন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কার্যক্রম ও প্রচারে সংসদ সদস্যরা অংশ নিচ্ছেন। এটি সিটি করপোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা ২০১৬-এর লঙ্ঘন।’

তিনি মনে করেন, ‘এতে সবার জন্য সমান সুযোগ নষ্ট হবে, নির্বাচনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।’ এ বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যরা সিটি নির্বাচনে প্রচার চালাতে পারবেন না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

সাবেক সংসদ সদস্যরা প্রচার চালাতে পারলে বর্তমান সংসদ সদস্যরা পারবেন না, এটা কোনো কথা হলো না। এ বিধান নাগরিক অধিকার খর্ব করার জন্য করা হয়েছে।’

তথ্য বলছে, ২০১৮ সালের ২৪ মে অনুষ্ঠিত ইসির সভায় নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে বক্তব্য দেন কমিশনার মাহবুব তালুকদার।

সেখানে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের প্রচারণায় সংসদ সদস্যদের অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হবে। নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্যরা ভোটদান ছাড়া নিজের এলাকায় না গেলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়বে না। বরং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের উপস্থিতিতে ভোট অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে না।’

আওয়ামী লীগের নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমান ইসির সময়েই ২০১৮ সালে চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের আগে দলটি নির্বাচনী প্রচারে আচরণবিধি পাল্টানোর দাবি তোলে। তখন দলটির নেতৃত্বের ১৪ দলীয় জোটও একই দাবি জানায়। এর আগে কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনের সময়ে বিধিটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলেও তা শেষ পর্যন্ত হয়নি।

দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আচরণবিধি পরিবর্তনে ইসি উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের অনেকে ‘বিস্ময়’ও প্রকাশ করেন।

ইসি তা না করায় এবারো ঢাকার জোড়া সিটির নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় আওয়ামী লীগকে ‘হোঁচট’ খেতে হলো।

নির্বাচনী প্রচারণায় যেসব কর্মসূচি ও কৌশল আগেভাগেই চূড়ান্ত করে রেখেছিল দলটি, আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর থেকে গতকাল পর্যন্ত ছয় দিনেও সেসবের পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। ওই বিধি অনুযায়ী, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদসদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেকটা ‘বেকায়দায়’ পড়েছে দলটি।

এমনকি এ নিয়ে ইসির অনেকটা বিপরীতমুখী অবস্থানে দলটিকে একপর্যায়ে চলে যেতে হয় বলে মনে করেন ক্ষমতাসীনরা। আচরণবিধি পরিবর্তনের দাবিতে এবারো আওয়ামী লীগ ইসির সঙ্গে বৈঠকে বসে। ১৪ দলের জোটও ওই আচরণবিধি বাতিলের দাবি জানায় নতুন করে।
অন্যদিকে সংসদ সদস্য না হওয়ায় ভোটের মাঠে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রায় সব নেতা তাদের দলের প্রার্থীদের প্রচারণায় অংশ নিতে পারছেন। ইসির আচরণবিধির কারণে বিএনপি ‘বেশি সুবিধা’ পাচ্ছে বলেও আওয়ামী লীগের অভিযোগ।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মতে, সংসদ সদস্যদের ভোট চাওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকলেও দলের অবস্থান তুলে ধরা, দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী কৌশল প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে বাধা নেই। অতীতেও সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে এমনটা করেছেন। এবার অনেকটা আড়ালে থেকেই তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এবার নির্বাচন হচ্ছে দলীয় ভিত্তিতে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নানা ব্যবস্থাপনা থাকে। এ জন্য চাইলে যে কেউ যেকোনো যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন। এতে ইসির আচরণবিধির লঙ্ঘন হচ্ছে না।

দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ভোট চাওয়া ও প্রচার চালানো ছাড়া সংসদ সদস্যরা সবই করতে পারেন।’

আওয়ামী লীগ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনী আইনের আচরণবিধি পরিবর্তনের দাবি জানালেও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, আইনের ওই ধারা এখন পরিবর্তনের সময় নেই।

তা ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই প্রণীত ওই আইনে এখন পরিবর্তন এলে সরকার বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনী প্রচারণার কৌশলে নানা পরিবর্তনের পরিকল্পনা করে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন দুই সিটির নির্বাচন সমন্বয়ে দলের অনানুষ্ঠানিক সমন্বয়ক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

আমির হোসেন আমু ডিএসসিসির আর তোফায়েল আহমেদ ডিএনসিসির জন্য গঠিত সমন্বয় কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কমিটির সদস্যরা প্রায় প্রতিদিনই দুই সিটির নির্বাচনসংক্রান্ত নানা কৌশল নিয়ে বৈঠক করছেন।

সোনালীনিউজ/এমটিআই