বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ৪ মাঘ ১৪২৫

ব্যাংকে বড়দের বড় ছাড়

নীতি ও নেতৃত্ব সঙ্কটে পরিস্থিতি নাজুক

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০১৯, বৃহস্পতিবার ১২:১৫ পিএম

নীতি ও নেতৃত্ব সঙ্কটে পরিস্থিতি নাজুক

ঢাকা : তফশিলি ব্যাংকের ভল্ট প্রভাবশালীদের দখলে। ঋণ পাওয়া, পরিশোধ না করা, খেলাপি হওয়া, নিয়মিতকরণসহ সব ক্ষেত্রে ব্যাংকে বড় ব্যবসায়ীদের বড় ছাড়। প্রভাবশালীরা ব্যাংকগুলো থেকে সহজে ঋণ পান।

অপরদিকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেন না, ফলে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংকগুলো এসব প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ পুনঃতফশিল করে দিচ্ছে। এভাবে সাময়িকভাবে ব্যাংকের স্বাস্থ্য ভালো দেখালেও গভীর ক্ষত তৈরি হচ্ছে অর্থনীতির মেরুদণ্ডে।

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক একটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে ৩০০ কোটি টাকা পাওনা। দীর্ঘদিন ধরে পাওনা পরিশোধ না করে প্রতিবছর পুনঃতফশিল করে নিয়ে যাচ্ছে গ্রুপটি। বিপুল অঙ্কের ঋণ কাগজে নিয়মিত করে ব্যাংকের স্বাস্থ্য ঠিক রাখছে কর্তৃপক্ষ।

অবশ্য দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ব্যাংক থেকে টাকা নিলে ফেরত দিতে হবে। আমি আত্মীয়-স্বজন কে তা দেখব না। অপরদিকে, ভালো গ্রাহক ও মন্দ গ্রাহক চিহ্নিত করা হবে। ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা দেওয়া হবে।

ব্যবসায়ীদের কারো কারো অভিযোগ, ব্যাংকগুলোতে ভালো প্রকল্প নিয়ে গেলেও অনেকে বিনিয়োগ পাচ্ছেন না। প্রভাব না থাকায় তারা সহায়তা না পেয়ে এগিয়ে যেতে পারছেন না ঠিকমতো। এগিয়ে গেলেও অনেক ব্যবসায়ীকে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এমনকি ব্যবসায়িক মন্দার কারণে এসব ব্যবসায়ীর ঋণ পুনঃতফশিল করার মুহূর্তে ব্যাংকগুলো অনাগ্রহ দেখায়। কিন্তু প্রভাবশালীদের জন্য যেন সাত খুন মাফ। প্রতিবছরই বাড়ছে ঋণের পুনঃতফশিল হার। কাগজে নিয়মিত এই ঋণের পরিমাণ ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের প্রায় ৮ ভাগের এক ভাগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো ব্যাংক খাতে কাগজে নিয়মিত ঋণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে এর পরিমাণ এক লাখ ৯৬৩ কোটি টাকা। গত ৬ বছরে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়মিত করে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যার মধ্যে বিদায়ী বছরে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা নিয়মিত করেছে ব্যাংকগুলো।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পুনঃতফশিল করা ঋণের অর্ধেকের বেশি এক সময় খেলাপি হয়ে পড়ে। কিছু গ্রাহক সাময়িক ব্যবসায়িক লোকসানে পড়ে এই সুযোগ নেন। তবে প্রভাবশালী ও দুষ্ট একটি ব্যবসায়িক চক্র রয়েছে এটিকে ফায়দা হিসেবে ব্যবহার করছে।

সূত্র মতে, ২০১৭ সালে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফশিল করে নিয়ে গেছেন ব্যবসায়ীরা, যা বিগত কয়েক বছরে সর্বোচ্চ। ২০১৩ সালের পর থেকে এত বড় অঙ্কের ঋণ আর কোনো একক বছরে পুনঃতফশিল করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। সরকারি ও বেসরকারি উভয় শ্রেণির ব্যাংকে বর্তমানে একই চিত্র।

ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৮ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যার প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা মন্দ ঋণ। মন্দ ঋণের বড় অঙ্কই আদায় হয় না। আর এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের হিসাবের খাতা থেকে ‘রাইট অফ’ করতে হয়েছে।

২০১৩ সালে ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্ন গ্রাহক ১৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ ন্যূনতম কিস্তি পরিশোধ করে নিয়মিত করে নেন। তবে পরের বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা মোতাবেক এই সুযোগ কমে যায়। ফলে কমে ঋণের পুনঃতফশিল হার। ২০১৪ সালে ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফশিল করার অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে মোট ১৫ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফশিল হয়েছে। তবে পুনঃতফশিলে বড় উল্লম্ফন হয়েছে ২০১৭ সালে। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণের পুনঃতফশিল করে নিয়েছেন গ্রাহকরা।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঋণের সবচেয়ে বেশি পুনঃতফশিল হয় তৈরি পোশাক খাতের। মোট পুনঃতফশিল ঋণের ৫ ভাগের এক ভাগ এই খাতের। অথচ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। প্রায় ৩০ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় এসেছে পোশাক খাতের মাধ্যমে।  

হিসাব বলছে, পোশাক খাতের মোট ঋণের ১৫ শতাংশ হারে প্রতিবছর পুনঃতফশিল করে নেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। আর ঋণের পুনঃতফশিল হার সবচেয়ে কম চলতি মূলধনের জোগান হিসেবে প্রদত্ত অর্থে। ঋণ পুনঃতফশিলের অর্ধেকই বেসরকারি ব্যাংকগুলোর। মোট পুনঃতফশিল ঋণের ৫১ শতাংশ করে থাকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অদৃশ্য প্রভাব তৈরি হয়েছে। একটি বড় বলয় নিয়ন্ত্রণ করছে এই খাতকে। এটি ভাঙতে হবে। তা না হলে ব্যাংক থেকে টাকা বেরিয়ে যাবে। ব্যাংকের ভল্টে সেই টাকা আর ফিরবে না।

সোনালীনিউজ/এমটিআই