বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬

নৌকাবিরোধীদের বহিষ্কারে আ.লীগে ভিন্নমত

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯, মঙ্গলবার ০৮:৩৫ পিএম

নৌকাবিরোধীদের বহিষ্কারে আ.লীগে ভিন্নমত

ঢাকা : চলতি বছর অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ করা ও তাদের মদতদাতাদের আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে দলে ভিন্নমত আছে।

দলীয় শৃঙ্খলা অমান্যের অভিযোগ ও দায়ে অন্তত ২০০ নেতার নামের তালিকা হলেও তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর না করার পক্ষে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকে। কেন্দ্রীয় নির্দেশ না মানায় তৃণমূলের নেতাদের সাংগঠনিক ব্যবস্থা হিসেবে দল থেকে বহিষ্কারের পক্ষে মত থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকরের ব্যাপারে সন্দিহান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কয়েক নেতা।

সরকারি দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র এসব তথ্য জানায়।

দলীয় সূত্রমতে, ‘বিদ্রোহী’ ও তাদের ইন্ধনদাতাদের বহিষ্কারের বিষয়টি দলের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত ‘সতর্ক করে দেওয়া’ ও ‘শোকজ’ পাঠানোর মধ্যেই আওয়ামী লীগের সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ও দায়ে অতীতে এত নেতাকে একসঙ্গে বহিষ্কারের নজির দলে নেই।

গত দশ বছরের বেশি সময় ধরে টানা ক্ষমতায় থাকাকালে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠলেও অনেককেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। এমনকি অনেকের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

ফলে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দলের স্বার্থেই এবারো উপজেলা নির্বাচনে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত নেতারা মাফ পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে তাদের আমলনামা সাজিয়ে রাখা হচ্ছে।

আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠেয় দলের জাতীয় সম্মেলনে অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। সবার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হলেও কোনো না কোনোভাবে শাস্তির আওতায় আসবেন দায়ী ও অভিযুক্ত নেতারা। তাদের বিরুদ্ধে আগামী সম্মেলন ও এর আগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে তৃণমূলে শৃঙ্খলা ফেরাতে চায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক সূত্র জানায়, এবার সারা দেশে পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নেতাদের বহিষ্কার করতে গেলে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কয়েকজন মনে করেন।

তাদের মতে, দলের বিদ্রোহী ও তাদের মদতদাতাদের মধ্যে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য (এমপি) মিলিয়ে অন্তত ৫৫ জন আছেন বলে কেন্দ্রীয় নেতাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। মদতদাতা মন্ত্রী ও এমপিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু তৃণমূলের নেতাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিলে দলের তৃণমূলের কর্মী ও সমর্থকদের কাছে এক ধরনের ভুল বার্তা যেতে পারে।

তাছাড়া কারো বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ এসেছে কি না, দলীয় কোন্দলের রেশ ধরে এক পক্ষ অন্যপক্ষের নেতার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছে কি না, সেসবও খতিয়ে দেখছে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। ঢালাও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিলে তৃণমূলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও শীর্ষ নেতাদের আশঙ্কা।

তবে দলের নির্দেশ অমান্য করা সেসব নেতাদের বহিষ্কার বাদে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অন্য কোনো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে আওয়ামী লীগের ওই শীর্ষ নেতারা। অভিযুক্তরা দলের তৃণমূলে কোন্দল ও বিভেদের জন্য দায়ী বলে শীর্ষ পর্যায়ের সবাই একমত।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত শনিবার এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতাকারীদের বিষয়ে এ পর্যন্ত ২০০ অভিযোগ এসেছে, আরো অভিযোগ আসছে। এসব অভিযোগ যাচাই করে দেখছেন আওয়ামী লীগের বিভাগীয় পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারা। আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। তারপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২৮ জুলাই থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হবে।’

তথ্যমতে, গত ১২ জুলাই অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ‘বিদ্রোহী’ ও তাদের মদতদাতাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। গত ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত দলের সভাপতিমণ্ডলীর সভায়ও তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা গত মে মাসেও দলের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা গণমাধ্যমকে জানান। গত ৫ এপ্রিল এসব নেতাকে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কারণ দর্শানোর চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় দল।

এর কয়েকদিন পরে কেন্দ্রীয় কয়েক নেতা জানান, আপাতত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম থেকে সরে এসেছে আওয়ামী লীগ। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ ও দায়ে ‘তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা’ না নিয়ে আরো তদন্ত করে ধীরে ধীরে ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এসব বিবেচনায় কেউ কেউ বলছেন, বহিষ্কারের বিষয়ে সবশেষ সিদ্ধান্ত তাই বাস্তবায়ন নাও হতে পারে। তবে এবার অভিযুক্তদের কড়া ভাষায় শোকজ করা হবে। তাদের কাছ থেকে উত্তর এলে পাল্টা চিঠি পাঠিয়ে আবারো সতর্ক করে দেওয়া হতে পারে।

সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পেয়ে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হওয়া ও ইন্ধনদাতাদের নামের তালিকা সাজানো হচ্ছে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে। দলের আগামী জাতীয় সম্মেলনে তাদেরকে কেন্দ্রীয় পদ থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে।

দলীয় আদেশ না মেনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করা যেসব মন্ত্রী, এমপি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেই, তাদেরকে বিভাগীয়, মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব ধরনের কমিটির পদ থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে। এমনকি তাদেরকে আগামীতে জাতীয় থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনেও দলীয় প্রতীক নৌকা না দেওয়ার দলীয় সিদ্ধান্তও আছে।

আবার কাউকে কাউকে শুধু ভবিষ্যতে দলের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে না যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হতে পারে। তূণমূলের দায়ি নেতাদের বাদ দেওয়া হতে পারে তৃণমূলের কমিটি থেকে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই