শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

পবিত্র রমজানে ব্যবসায়ীদের করণীয়

 ধর্মচিন্তা ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০১৯, রবিবার ১১:১২ এএম

পবিত্র রমজানে ব্যবসায়ীদের করণীয়

ঢাকা: মুসলমানদের সবচেয়ে প্রিয় মাস পবিত্র মাহে রমজান। এ মাসটি মূলত ইবাদতের বসন্তকাল হিসেবেই মোমিন-মুসলমানদের কাছে পরিচিত। ইবাদত, আত্মশুদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে এ মাসটি মুসলিম উম্মাহর জন্য ব্যাপক তাৎপর্য বহন করে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন ‘রোজা আমার জন্য এবং এর পুরস্কার আমি নিজেই দেব।’ (বোখারি ও মুসলিম)। 

রোজার মাস যেমন ইবাদতের, তেমনি এটি ভেজালমুক্ত খাদ্য গ্রহণের মাসও। দেশের সব মানুষের মানবতবোধ এক রকম নয়। মানবতার যেমন বন্ধুর অভাব নেই, তেমনি শত্রুও কম নয়। রোজার মাস এলেই দেখা যায়, ইফতার-সাহরি সমাগ্রীসহ বেশ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজীয় দ্রব্যের দাম হঠাৎ করে অনেক গুণ বেড়ে যায়। অথচ রমজান মাস ছাড়া বছরের অন্য মাসগুলোতে এসব খাদ্যদ্রব্যের দাম অনেকটাই সহনীয় পর্যায় কিংবা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই থাকে। ব্যতিক্রম ঘটে শুধু পবিত্র রমজান মাসে। অধিক মুনাফালোভীরা তাদের গুদামে পবিত্র রমজান মাসের নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু খাদ্যদ্রব্য অবৈধ, অনৈতিকভাবে মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রমজানের এক মাস কিংবা ১৫ দিন আগে বাজারের চাহিদা অনুপাতে অনেক কম পরিমাণে দ্রব্য বাজারে সরবরাহ করে এবং এর মূল্য বৃদ্ধি করে দেয়। যদিও এদের সংখ্যা কম; কিন্তু বাজারব্যবস্থাকে এ কম সংখ্যক ব্যবসায়ীই নিয়ন্ত্রণ করে। তাই রমজান শুরু হওয়ার আগে দেখা যায়, চিনি, ছোলা বুট, পেঁয়াজ, সয়াবিনসহ সব ধরনের মশলা, ডালসহ এ জাতীয় পণ্যের দাম আগের তুলনায় কেজিতে ১০ টাকা থেকে শুরু করে শতাধিক টাকা পর্যন্ত ও বেড়ে যায়। 

হজরত আবু সাঈদ খুদুরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন‘সত্যবাদী আমানতদার ও বিশ্বাসী ব্যবসায়ী ব্যক্তি হাশরের দিন নবী-সিদ্দিক ও শহীদদের কাতারে থাকবেন।’ (তিরমিজি)। প্রিয় ব্যবসায়ী ভাইয়েরা নিশ্চয়ই ভাববেন, সঠিক ব্যবসার মাধ্যমে কত বড় উচ্চ মর্যাদার সুযোগ রয়েছে! 

পবিত্র রমজান মাস এলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কি নির্বিঘেœ রোজা রাখবেন, নাকি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কথা ভেবে চিন্তায় দিন পার করবেন? এমনিতেই দেশে বছরের পুরো সময় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষের প্রচুর ক্ষোভের কথা শোনা যায়। এরপরও যদি রমজান উপলক্ষে অমানবিকভাবে আরও কয়েকদফা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়; তবে সেটা শুধু অনৈতিক নয়, বরং অমানবিকও বটে। 

ব্যবসার ব্যাপারে ইসলাম কিছু বিধি নিষেধ দিয়েছে। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেনÑ ‘ব্যবসাকে তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে, আর সুদকে করা হয়েছে হারাম।’ (সূরা বাকারা : ২৭৫)। ইসলামে ব্যবসার সব দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। অথচ মুসলমানরা তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে অনৈতিকতার গহ্বরে পতিত হচ্ছে। নয়তো কোনো মুসলমান ব্যবসায়ী ভাই রমজান মাসে দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে অন্য মুসলমানকে আল্লাহর স্মরণের পথে কি কখনও বাধার সৃষ্টি করতে পারে? আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যের দাম কমিয়ে দেওয়া হয় এবং মুসলমানরা প্রতিযোগিতা করে রোজাদারদের সেবা দিয়ে থাকেন।

যেখানে বিশ্বব্যাপী পবিত্র রমজান মাস এলে মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি বেড়ে যায়, ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ রাখতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে, সেখানে আমাদের দেশের বাজারব্যবস্থা রমজানের আগের সঙ্গে রমজানের সময়ের সঙ্গে কোনো মিল থাকে না। এটি সত্যিই বড় বেদনার কথা।

সার্বিকভাবে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার লক্ষ্যে রোজাদারের যথাযথ দায়িত্ব পালন, আত্মশুদ্ধি অর্জন ও ইবাদত-বন্দেগিকে নির্বিঘœ করতে ব্যবসায়ীদের জন্যই এ মাসের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মর্যাদা উপলব্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। হাদিসের ভাষা অনুযায়ী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর নিজ হাতের প্রতিদান লাভের আশায় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি না করে বরং কমিয়ে আনা এবং বাজার স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল না মেশানোই হবে ব্যবসায়ী ভাইদের নৈতিক দায়িত্ব। 

ব্যবসায়ীরা যদি তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করেন; তবে প্রত্যেক রোজাদার স্বস্তিতে ইফতার-সাহরির সব দ্রব্য কিনতে পারবেন এবং তারা সঠিকভাবে রোজা পালন ও আত্মশুদ্ধি অর্জনে কষ্ট এবং হয়রানির শিকার হবেন না। ব্যবসায়ীরা যদি তাদের ব্যবসায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, রোজাদারদের পাশে সহানুভূতির দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়াতে পারেন; তবে নিশ্চয়ই তাদের জন্য থাকবে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে দুনিয়ায় রহমত-বরকত এবং পরকালের মাগফেরাত-নাজাতসহ অনেক অনেক কল্যাণ।

তাই আসুন, আমরা পবিত্র রমজান মাসকে যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে পালনের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করি, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্য ও সহমর্মিতার সম্পর্ক সুদৃঢ়করণে অঙ্গীকারবদ্ধ হই, রমজানজুড়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রেখে ভেজালমুক্ত খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন ও নৈতিক উন্নত চরিত্র গঠনে এগিয়ে আসি। আল্লাহ তায়ালা ব্যবসায়ী ভাইদের রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষা এবং যথাযথ দায়িত্ব পালনের তৌফিক দান করুন।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/এসআই