শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২০, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

প্রস্তুতি পর্বে অন্যগুলো

পরিপূর্ণ চিকিৎসা মাত্র এক হাসপাতালে

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২০, শনিবার ১১:৪৭ পিএম

পরিপূর্ণ চিকিৎসা মাত্র এক হাসপাতালে

ঢাকা : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের নির্ধারিত হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হবে। সেখানে আইসিইউতে ভেন্টিলেশনসহ অন্যান্য সুবিধা থাকতে হবে।

বাংলাদেশে এমন নির্ধারিত হাসপাতাল হিসেবে রাজধানী ঢাকায় এখন মূলত কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা হচ্ছে। সেখানে ১০টি আইসিইউ বেড প্রস্তুত রয়েছে। তবে আরো ১৬টি বেড প্রস্তুতের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক)

আমিনুল হাসান। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল ও আরো কয়েকটি হাসপাতালে ৯০টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে আরো ৪ হাসপাতালে ১৯টি বেড স্থাপনের কাজ শেষ পর্যায়ে বলেও জানান তিনি। কিন্তু রাজধানীর বাইরের কোনো হাসপাতালে এই ভাইরাসে আক্রান্তদের জন্য আইসিইউ বেড নেই বলে জানান এই কর্মকর্তা।

জানা গেছে, এর বাইরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতাল, মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, মিরপুর লালকুঠি হাসপাতাল, রিজেন্ট হাসপাতাল উত্তরা ও মিরপুর এবং যাত্রাবাড়ীর সাজেদা ফাউন্ডেশনে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেসব হাসপাতালে এখনো আইসিইউ বেড রেডি হয়নি। তবে অধিদপ্তরের

তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ১০টি ছাড়াও শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে ৮টি, উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে ৩টি, মিরপুর রিজেন্ট হাসপাতালে ৩টি ও যাত্রাবাড়ীর সাজেদা ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ৫টি আইসিইউ বেড প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেগুলোও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আগে থেকেই সরকারি হাসপাতালে ৫০৮টি আইসিইউ বেড এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৭৩৭টি আইসিইউ বেড আছে। তবে সেগুলো করোনা রোগীদের জন্য নয়। সাধারণ বা অন্য রোগীদের জন্য।

এদিকে করোনায় অধিক ঝুঁকিতে বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকরা। বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে মৃত্যুবরণ করা ৫ করোনা রোগীর সবার বয়স ৬০ থেকে ৭৫ বছর।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ সালের হিসাব বলছে, দেশের  ১৬ কোটি ৪৬ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের বয়স ৬০ বছরের বেশি। ফলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রবীণদের নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের জন্য আলাদা আইসিইউয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ এই রোগে আক্রান্তদের হাসপাতালের অন্য রোগীদের সঙ্গে রাখা যায় না।

গত ২১ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেক বলেছিলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালে ১০০ আইসিইউ বেড বসানো হবে। তিনি আরো বলেছিলেন, পর্যায়ক্রমে আরো ৩০০ আইসিইউ বেড বসানো হবে।  যদিও তিনি এজন্য কোনো সময়সীমার কথা উল্লেখ করেননি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক্তন পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) বেনজির আহমেদ বলেছেন, সারা দেশের নিবিড় পরিচর্যা সুবিধা বাড়াতে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় ১০০ থেকে ২০০ আইসিইউ বেডসহ একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করা উচিত সরকারের।

চিকিৎসকরা বলছেন, চিকিৎসক-নার্স ও হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছায়নি। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়ার সুবিধা বা ভেন্টিলেশন জরুরি। কিন্তু নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর সবগুলোতে এসব সুবিধা নেই।

তবে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সরঞ্জাম সরবরাহকারী সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ডিপোর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদুল্লাহ জানান, সম্প্রতি রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালের আইসিইউগুলোতে ৩৬টি ভেন্টিলেটর সরবরাহ করা হয়েছে। এখন মোট ১৬৪টি ভেন্টিলেটর আছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল) অধ্যাপক মোজাহেরুল হক বলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের একটি নির্ধারিত হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হবে। সেখানের আইসিইউতে ভেন্টিলেশনসহ অন্যান্য সুবিধা থাকতে হবে। আমাদের দেশে করোনা ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কমিউনিটিতে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে যে পরিমাণ আইসিইউ বেড দরকার সেই তুলনায় আমাদের রয়েছে খুবই স্বল্প। জনসংখ্যা ও পারসেন্টেজ অব সিনিয়র সিটিজেনের তুলনায় এ একেবারে কম। নির্দিষ্ট হাসপাতাল ও আইসিইউ বেডের সংখ্যা শিগগিরই আরো বাড়াতে হবে এবং প্রস্তুত রাখতে হবে।

করোনা ভাইরাস পরীক্ষা হচ্ছে মাত্র ৪ স্থানে : এদিকে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগী বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আইইডিসিআরের নমুনা পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় দেরি নিয়ে ক্ষোভের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০টি পরীক্ষাগার চালুর ঘোষণার এক সপ্তাহ গড়ালেও এ পর্যন্ত চালু হয়েছে মাত্র তিনটি।

আইইডিসিআরের নিজস্ব পরীক্ষাগার ছাড়াও আরো যে ১০টি পরীক্ষাগার স্থাপন করা হচ্ছে সেগুলো হলো-ঢাকায় জনস্বাস্থ্য হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর মধ্যে মাত্র তিনটিতে কেবল পরীক্ষা করা যাচ্ছে। এগুলো হলো রাজধানীর মহাখালীর জনস্বাস্থ্য হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল এবং চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসেস হাসপাতাল।

পরীক্ষা নিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা : করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ব্যাপক অভাব দেখা দিয়েছে। সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা নন-মেডিকেল পারসনদের অনভিজ্ঞতা কিংবা মতলববাজির কারণে অনেকটা হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। সমন্বয়ে আরো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। এদিকে একমাত্র চট্টগ্রাম ছাড়া বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে করোনা শনাক্তকরণের কোনো ব্যবস্থা নেই।

অপরদিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কিটের সংকট রয়েই গেছে। যেখানে প্রায় ৭ লাখ বিদেশফেরত দেশে অবস্থান করছে, সেখানে মাত্র ১ হাজার ২৬ জনের পরীক্ষা করার কথা জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। গতকাল শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান। এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান দেশে করোনার বিস্তার অনুযায়ী এ-সংক্রান্ত প্রস্তুতি পরের ধাপে নেওয়া হচ্ছে। নমুনা সংগ্রহের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। জেলা পর্যায়েও হটলাইন চালু হয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমপক্ষে বিদেশফেরতদের এক-তৃতীয়াংশের এবং তাদের সরাসরি সংস্পর্শে আসাদের উল্লেখযোগ্য অংশের পরীক্ষা করা হলে বোঝা যেত কী পরিমাণ লোক সংক্রমিত হয়েছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ জানান, ঢালাওভাবে পরীক্ষা করার দরকার নেই। জ্বর, সর্দি, কাশি, গলায় ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হলেই করোনা নয়। দেখতে হবে তার আগের ইতিহাস। তিনি বিদেশফেরত কারোর সংস্পর্শে গেছেন কি না, আক্রান্ত দেশ থেকে এসেছেন কি না-এসব ইতিহাস ও উপসর্গ দেখে করোনার পরীক্ষার করতে হবে। তবে বয়স্করা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি জ্বর, সর্দি, কাশি ও নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে গেলে তাকে করোনা পরীক্ষা করতে হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই