বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬

দ্বিতীয় মেয়াদে মোদি সরকার

পানি চুক্তিসহ নানা বিষয়ে নতুন আশাবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৫ মে ২০১৯, শনিবার ০৭:৩২ পিএম

পানি চুক্তিসহ নানা বিষয়ে নতুন আশাবাদ

ফাইল ছবি

ঢাকা : ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করতে যাওয়ায় তিস্তাসহ অভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে নতুন আশাবাদ জন্মেছে। বিশেষ করে প্রস্তাবিত তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি মোদি সরকারের আমলেই হবে বলে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ায় ও দুই দেশের সরকারের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করায় নতুন আশাবাদের জন্ম হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে ভারতের চাপ দেওয়াসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ভারতের ভূমিকার বিষয়েও আশাবাদী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সরকার।

বিজেপির দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারের সময় বহুল প্রত্যাশিত পানিবণ্টন চুক্তিসহ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঝুলে থাকা বিষয়গুলোর সমাধানে আশাবাদী দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্র। বিজেপি সরকার গঠন করতে যাওয়ায় নতুন সরকারের মেয়াদে এসব বিষয় বাস্তবায়ন হওয়ার আশা তাদের। নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে আগামীতে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ থাকছে বলেও মত তাদের। দ্বিতীয় মেয়াদে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত বিষয়ে সুরাহা হবে। দুই দেশের মধ্যে যেসব দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে সহযোগিতা চলমান আছে, সেগুলোর ধারাবাহিকতাও চলতে থাকবে।

কূটনৈতিক সূত্রের মতে, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি মোদি সরকারের আমলেই হবে বলে বাংলাদেশ সরকারকে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দেয় মোদির সরকার। গত বছরের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদল ভারত সফরে গেলে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে তাদের আশ্বাস দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের প্রধান, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওয়ায়দুল কাদের দেশে ফিরে গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান। সদ্য শেষ হওয়া মোদির সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিরোধিতার কারণে তিস্তা চুক্তি সই হয়নি। এবার মোদির সরকার প্রথম দফার চেয়ে বড় ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসছে। পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি অতীতের চেয়ে এবার সাফল্যের দেখা পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তিস্তা নিয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুই দেশেই সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় অমীমাংসিত ও ঝুলে থাকা ইস্যুগুলো সমাধানের বিষয়ে বেশি আশাবাদ জন্ম নিয়েছে। তাছাড়া গত এক দশকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে সুসম্পর্ক রাখার ব্যাপারে দুই দেশেই বড় পরিসরে মতৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসেবেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের পর বিভিন্ন সময় অন্য সরকারের আমলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে শিথিলতা এলেও ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন আসে। গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক বিশেষ উষ্ণতায় অনন্য উচ্চতায় আসীন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন আশা প্রকাশ করে এসব প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, মোদি সরকারে আবার এসেছেন, তিস্তা সমস্যা আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারব। তিস্তাসহ অভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টন চুক্তি বিজেপির দ্বিতীয় মেয়াদেই বাস্তবায়ন হবে। মোদি সরকারের নতুন মেয়াদেই দুই দেশের ঝুলে থাকা অন্যান্য সমস্যারও সমাধান হবে।’ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও ভারত সরকারের আরো সহযোগিতা মিলবে বলে আশা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নতুন মেয়াদে দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধান হবে। তার সরকারের গত মেয়াদে আমরা অনেক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছি। আগামীতে অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তিসহ অনেক সমস্যার সমাধান হবে। প্রধানমন্ত্রী মোদি দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী।’

অন্যদিকে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, ‘বিজেপি পুনরায় সরকার গঠন করতে যাওয়ায় দুই দেশের মধ্যে যেসব দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে সহযোগিতা চলমান আছে, সেগুলোর ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে। বাংলাদেশের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো। গত মেয়াদে অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথা বললেও মোদি সরকার ততটা অগ্রগতি করতে পারেনি। হয়তো এবারে নতুন দফায় সেদিকে অগ্রগতি হবে, এ আশা করা যায়।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঐতিহাসিক কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতীয় জাতীয় দল কংগ্রেসের সম্পর্ক সুবিদিত। ভারতে পালাবদলের পর বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে একটা সংশয় ছিল। গত পাঁচ বছরে সেই সংশয় শুধু ঘুচেই যায়নি, বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ক্রমশ জমাট বেঁধেছে। পারস্পরিক নির্ভরতাও সৃষ্টি হয়েছে। বিজেপির সরকারও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আরো উষ্ণতার দিকে নিয়ে যায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটের ‘প্রশ্নবিদ্ধতাকে’ গুরুত্ব না দিয়ে বিজেপির নতুন সরকার শুরু থেকেই বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলের পাশে দাঁড়িয়ে সেই ভোটকে মান্যতা দেয়। ভারতের মান্যতার প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের কাছে অনস্বীকার্য।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের মতে, গত ৫ বছরে বিজেপি ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ভালোই ছিল। এবারও সেই যাত্রা অব্যাহত থাকবে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের জন্য দলের শীর্ষ কয়েক নেতা ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সরকারকে দায়ী করেন। আর ওই সময় ভারতে বিজেপি ক্ষমতাসীন ছিল। সেই অবস্থা এখন আর নেই।

কূটনৈতিকরা মনে করেন, সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষায় দুই দেশের ক্ষমতাসীন দলই এখন সচেষ্ট। পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি।  গত দশ বছরে দুই দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, ছিটমহল বিনিময়, ভারতকে সড়ক পথে ট্রানজিট দেওয়া, চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া, দুই দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে বাংলাদেশের আন্তরিক সহায়তা- এসব কিছুতে অগ্রগতি হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান মনে করেন, ‘বিজেপি জোট নিরঙ্কুশ বিজয় পাওয়ায় বাংলাদেশের প্রত্যাশা থাকবে তিস্তার পানিবণ্টন ও অন্যান্য যেসব চুক্তি ঝুলে আছে, সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন হবে। আগামী পাঁচ বছরে ভারত থেকে আরো বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারে বাংলাদেশ। পাশাপাশি নয়াদিল্লিতে রপ্তানি বাড়াতেও কাজ করতে হবে ঢাকাকে।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই