রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২০, ১৪ চৈত্র ১৪২৬

পাপিয়াকাণ্ডে আওয়ামী লীগে স্বস্তি ও অস্বস্তি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বৃহস্পতিবার ১২:৫৩ পিএম

পাপিয়াকাণ্ডে আওয়ামী লীগে স্বস্তি ও অস্বস্তি

ঢাকা : যুব মহিলা লীগের সদ্য বহিষ্কৃত নেত্রী শামিমা নূর পাপিয়ার নানা কাহিনীতে আওয়ামী লীগের কয়েক শীর্ষ নেতার মধ্যে অস্বস্তি কাজ করছে।

গ্রেপ্তারের পর ১৫ দিনের রিমান্ডে থাকা পাপিয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিদিন যেসব তথ্য দিচ্ছেন, তাতেও নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে তাদের জন্য।

গত বছর দলে শুদ্ধি অভিযান শুরু হলেও পাপিয়ার মতো বিতর্কিত নেত্রী কীভাবে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কে বা কারা তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন, এমন প্রশ্নও দলে উঠেছে। তবে পাপিয়াকে দলের সহযোগী সংগঠনের পদ থেকে বহিষ্কার ও তাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সরকারি দলের নেতারা স্বস্তিও প্রকাশ করছেন।

তাদের মতে, দলীয় পদ ব্যবহার করে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করলে ‘দলে কারো ঠাঁই হয় না ও সরকারও তাকে ছাড় দেয় না’- পাপিয়াকে গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হচ্ছে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার মধ্য দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদেরও আবার কড়া বার্তা দেওয়া যাচ্ছে।

অন্যায় ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও সরকারের ‘কঠোর’ অবস্থান দেশের জনগণও ইতিবাচকভাবে বিচার করছে। এতে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে।

শূন্য হওয়া দেশের পাঁচটি সংসদীয় আসনে (ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৩, বাগেরহাট-৪, বগুড়া-১, যশোর-৬) উপনির্বাচন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) আসন্ন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের ভোটের বাক্সে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও মনে করেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের দাবি, পাপিয়াকে গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে দলের ঝিমিয়ে পড়া চলমান শুদ্ধি অভিযান আরো জোরালো হয়ে ওঠার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অভিযানও কঠোর হচ্ছে। বিষয়টি জোরালোভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরার নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। অপকর্মে জড়িত দলের অন্যদেরও শিগগির একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।

পাপিয়াকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকার গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব।

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশে দলে শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পর তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। গতবার দলে শুদ্ধি ও সরকারে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হলে দল ও সরকারের জনপ্রিয়তা আরো বাড়ে বলে বিদেশি একাধিক জরিপে উঠে আসে।

দলীয় সূত্র জানায়, পাপিয়াকে নিয়ে জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে নানা খবর প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি তাকে নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী যুব মহিলা লীগ বেশ বিব্রতকর অবস্থায় আছে।

বিশেষ করে পাপিয়ার সঙ্গে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও মন্ত্রীদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর কারো কারো মধ্যে বিরাট অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের নাম বলেছেন।

দলীয় প্রশ্রয়ে তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীর তার সঙ্গে ওঠাবসা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

আলোচনার আগুনে একের পর এক ঘি ঢালছে নানা তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া সূত্রহীন উড়ো ‘কথাবার্তা’।

তাকে কারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন, কারা বিভিন্ন কমিটিতে বড় পদ পাইয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছেন এবং কারা তার কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন এর সব তথ্য এখন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে। কীভাবে পাপিয়ার উত্থান হয়েছে সে বিষয়টি নিয়েও তদন্ত চলছে। ফলে অনেক রাজনৈতিক নেতার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তাকে নিয়ে আলোচনাও থামছে না।

অনেকের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের একটি সহযোগী সংগঠনের নেত্রী কীভাবে এত প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অর্থ-বিত্তের মালিক হলেন?

পাপিয়া নরসিংদীর যুব মহিলা লীগের নেত্রী। তার স্বামী মফিজুর রহমানও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। এই দম্পতিকে পুলিশের বিশেষ বাহিনী র‍্যাব গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা আরো দুজন সহযোগীসহ ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ প্রসঙ্গে বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বলেন, ‘অপরাধীদের আওয়ামী লীগে স্থান হবে না। পাপিয়ার অপরাধের বিচার হবে। এরই ধারাবাহিকতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশেই পাপিয়া গ্রেপ্তার হয়েছেন। আমরা নিজের ঘরের অপরাধীকেও ক্ষমা করছি না।’

তিনি বলেন, ‘অপরাধ করে আওয়ামী লীগের কেউই পার পাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের দল থেকেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছেন। অতীতে কোনো সরকার, কোনো প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি নিজের দলের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়েছেন। তাদের অপরাধের কোনো বিচার হয়নি।’

অন্যদিকে রিমান্ডে থাকা পাপিয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেন, যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষস্থানীয় দুই নেত্রী এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এক সংসদ সদস্যের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি।

ওই তিনজনের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তার। এমন তথ্যের পর ওই নেত্রীকে নিয়েও নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তিননেত্রীর ‘ভূমিকা’ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

তবে হঠাৎ করেই যুব মহিলা লীগের নরসিংদী জেলা সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেওয়া পাপিয়ার নানাজনের পৃষ্ঠপোষকতায় উত্থানের খবর মিললেও তাদের কেউ এখন আর সে দায় নিতে চান না।

গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাপিয়ার নানা অপকীর্তি প্রকাশ হওয়ার পর এখন আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে যুব মহিলা লীগের নেতা-নেত্রীরা একে অন্যকে দোষারোপ করছেন।

পাপিয়ার পৃষ্ঠপোষকতা কারা করেছেন, তাদের খোঁজও বের করার আশ্বাস দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

সোনালীনিউজ/এমটিআই