বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬

পাপিয়াদের পাপের দায় কে নেবে

মহিউদ্দিন খান মোহন | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শনিবার ০৪:৩৮ পিএম

পাপিয়াদের পাপের দায় কে নেবে

ঢাকা : ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনৈতিক পথে একজন মানুষ অর্থ-বিত্তে তরতর করে কতটা ওপরে উঠে যেতে পারে, তার তরতাজা নিদর্শন শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ। রাজধানীর লাগোয়া জেলা নরসিংদীর মেয়ে সে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন আওয়ামী যুব মহিলা লীগের নরসিংদী জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিল সে (বর্তমানে বহিষ্কৃত)।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে আটক করে র্যাব। খবরে বলা হয়েছে, তার ওপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে থেকেই নজর রাখছিল। তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তাকে গোয়েন্দা নজরদারির নেটওয়ার্কে নিয়ে আসে। আটকের পর তার সম্পর্কে যেসব খবরাখবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেছে সবারই। মাত্র পাঁচ বছরে একজন তরুণী কী করে এত বিত্ত-বৈভবের মালিক হলো, তা এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’।

খবরে বলা হয়েছে, রাজধানীর অন্যতম অভিজাত হোটেল ওয়েস্টিনে তিন মাসে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করেছে পাপিয়া। পাঁচ তারকা ওই হোটেলের প্রেসিডেন্ট সুটটি তার নামে বরাদ্দ থাকত সব সময়। হোটেলটির বারে সে নাকি প্রতি মাসে বিল পরিশোধ করত আড়াই লাখ টাকা। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করলে বিষয়টি টের পেয়ে তড়িঘড়ি দেশত্যাগের চেষ্টা করে পাপিয়া। কিন্তু বিধি বাম। পালানোর আগ মুহূর্তে বিমানবন্দরে র্যাবের হাতে স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন, ব্যক্তিগত সহকারী শেখ তায়্যিবা এবং সাব্বির খন্দকারসহ আটক হয় সে। গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে পাপিয়ার অপকর্মের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে কাজ আদায় করতে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য সুন্দরীদের হোটেলে সরবরাহ, চাঁদাবাজি, এমনকি অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ত থাকার খবর পাওয়া গেছে। এসব অনৈতিক ও অবৈধ কাজ করে সে রীতিমতো ধনকুবের বনে গেছে। ঢাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, বাড়ি, গন্ডাখানেক গাড়ি, বিস্তর জমিসহ বিপুল বিত্তের মালিক পাপিয়া-সুমন দম্পতি। অথচ তার প্রদর্শিত আয়ের উৎস নরসিংদীর একটি গাড়ি সার্ভিসিং সেন্টার।

পাপিয়ার এ উত্থানের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশয়ের কাহিনী। একজন সাধারণ তরুণী থেকে ক্ষমতাসীন দলের একটি সহযোগী সংগঠনের জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে তার অধিষ্ঠানের পেছনে বড়ভাই-বোনদের আশীর্বাদের বিষয়টি ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে এসেছে।

মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমেই সে তার অপকর্ম চালিয়েছে নির্বিঘ্নে। খবরে বলা হয়েছে, নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতার আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে পাপিয়াকে কেন্দ্র থেকে ওই পদে বসিয়ে দেওয়া হয়। পাপিয়ার স্বামী সুমন এক সময় ছাত্রলীগের নরসিংদী শহর শাখার আহ্বায়ক ছিল। একসময় এ দম্পতি নরসিংদী থেকে ঢাকায় এসে তাদের অবৈধ কাজকারবার শুরু করে। পাপিয়া পরিণত হয় মক্ষীরানিতে।

বিভিন্ন স্থান থেকে সুন্দরী তরুণীদের এনে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ও প্রভাবশালী আমলা এবং রাজনৈতিক নেতাদের মনোরঞ্জনের জন্য সরবরাহ করত। তারপর গোপনে ভিডিও করে তা দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেইল করত। হাতিয়ে নিত লাখ লাখ টাকা। পাপিয়ার অনৈতিক কাজকারবার সম্পর্কে যেসব খবর ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, তার ফিরিস্তি অনেক লম্বা।

সবকিছু ছাপিয়ে এখন যে প্রশ্নটি সচেতন ব্যক্তিদের তাড়িত করছে তাহলো, রাজনীতির জার্সি গায়ে একদল দুর্বৃত্ত এমনসব ক্রীড়া নৈপুণ্য কি দেখাতেই থাকবে? এদের এসব অপকর্ম যে রাজনীতির গায়ে অনপনেয় কালি লাগিয়ে দিচ্ছে তা কি আমাদের রাজনীতির ধারকরা ভেবে দেখেছেন? কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এরা রাজনীতিকে? কীভাবে নিয়ে যাচ্ছে? এরা তো একা একা হেঁটে এতদূর আসতে বা উপরে উঠতে পারেনি। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, ‘ওপরে ওঠার সময় অপরের সাহায্য লাগে, নিচে নামার সময় কারো সাহায্য প্রয়োজন হয় না।’

পাপিয়াদের রাজনীতির মঞ্চে উঠে আসার পেছনে কারো না কারো সাহায্য-সহযোগিতা তো ছিলই। সে সাহায্যকারী কারা? কোথায় তাদের অবস্থান? গত বছর যখন রাজধানীতে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হয় এবং ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন ডাকসাইটে নেতা সে জালে ধরা পড়ে, প্রশ্নটি তখনো উঠেছিল। একজন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া বা ইসমাইল হোসেন সম্রাট হঠাৎ করে জন্ম নেয়নি, একা একাও বেড়ে ওঠেনি। গ্রেপ্তারের পর সম্রাট তো বলেও ছিল, আমি একা কেন সাজা পাব? আমার থেকে যারা সুবিধা নিয়েছে তারা কোথায়?  

এই ‘তারা’রা সব সময় পর্দার অন্তরালেই থেকে যায়। তারা পেছন থেকে খালেদ, সম্রাট, পাপিয়াদের প্রম্পট করে, সামনে ঠেলে দিয়ে সুবিধা নেয়। আবার বিপদ দেখলে নিজেদের শামুকের মতো শক্ত খোলের ভেতর গুটিয়ে ফেলে।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়ার মুখ থেকে পিলে চমকানো তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সে জানিয়েছে তার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম।

কারা তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে, কমিটিতে বড় পদ পাইয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে এবং কারা তার কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে, এসব তথ্য এখন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে। ফলে অনেক রাজনৈতিক নেতার নাকি ঘুম হারাম হয়ে গেছে পাপিয়া-দুশ্চিন্তায়। সঙ্গত কারণেই পাপিয়ার পাপের অংশীদাররা এখন ভয়ে তটস্থ। যে কোনো সময় থলের বিড়াল বেরিয়ে ঘটিয়ে দিতে পারে মহাসর্বনাশ।

পাপিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সভানেত্রী নাজমা আখতার একাত্তর টেলিভিশনের টকশোতে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে তিনি জর্জরিত হয়েছেন সাংবাদিক ও উপস্থাপকের প্রশ্নবাণে। তিনি বলেছেন, পাপিয়ার অপকর্মের দায় সংগঠন নেবে না। কারণ সংগঠন তাকে এসব করতে বলেনি। সেই সাথে তিনি এটাও বলেছেন, পাপিয়াকে ওই পদে বসাতে তিনি রাজি ছিলেন না।

তার কথায় এটা অনুমান করা গেছে যে, এমন কোনো জায়গা থেকে পাপিয়ার জন্য তদবির হয়েছিল, যা উপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। নাজমা আখতার অবশ্যই ধন্যবাদার্হ এজন্য যে, এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সাধারণত মিডিয়াকে এড়িয়ে চলেন বা মুখ খুলতে চান না। তিনি তা করেননি।

তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, পাপিয়ার অপকর্মের দায় তার নিজের, সংগঠন এ দায় বহন করবে না। তবে সংগঠনের একজন কর্মী এতকিছু করে বেড়াল, আর তারা কোনো খবর রাখলেন না— এমন কথার জবাবে নাজমা আখতার বলেছেন, কারো ব্যক্তিগত কাজকর্মের খোঁজ রাখা সংগঠনের পক্ষে সম্ভব নয়। তার এ কথার যৌক্তিকতা মেনে নেওয়ার  মতো নয়।

কারণ সংগঠনের একজন কর্মী কোথায় কী করছে, তার জীবনযাত্রায় হঠাৎ পরিবর্তন বা অর্থ-বিত্তে ফুলেফেঁপে ওঠা এটা নিশ্চয়ই একেবারে অদৃশ্য ছিল না। পাপিয়ার এসব পরিবর্তনের পর সংগঠনের শীর্ষ নেত্রীদের কি উচিত ছিল না খোঁজখবর করা?

একটি বিষয় লক্ষণীয়, ক্যাসিনো থেকে পাপিয়া, সবখানেই অপকর্মগুলোর উদঘাটন করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র্যাবের অভিযানে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, ইসমাইল হোসেন সম্রাট, জি কে গাউস বা শফিকুল ইসলাম ফিরোজ গ্রেপ্তার হওয়ার আগে কারো জানা ছিল না তাদের অন্ধকার জীবনের কথা। তারা আটক হওয়ার পর স্ব স্ব সংগঠন তাদেরকে বহিষ্কার করেছে। পাপিয়ার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

এ থেকে এটা স্পষ্ট যে, সংগঠনগুলো তাদের নেতাকর্মীদের কাজকর্মের কোনো খবরই রাখে না। বরং অনেক সময় দেখেও না দেখার ভান করে, ক্ষেত্র বিশেষে উৎসাহিত করে। এমন একটি দৃষ্টান্ত কি পাওয়া যাবে, যেখানে কোনো সংগঠন তার দুর্বৃত্ত-দুষ্কৃতকারী বা অপরাধকর্মে সম্পৃক্ত কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশনের আগে?

এখন বহিষ্কার করে তারা তাদের ‘দায়িত্ব’ এড়াতে চান। অথচ প্রতিটি সংগঠনেরই উচিত নেতাকর্মীদের কাজকর্মের খোঁজখবরে রাখা। কেউ কোনো অপকর্মে জড়িয়ে পড়লে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহার বিষয়টি অস্বীকারের জো নেই। রাজনীতির কথা উঠলেই বেশিরভাগ মানুষ কপাল কুঞ্চিত করে বলেন, ওটা এখন আর জনসেবার ক্ষেত্র নেই, অর্থ-বিত্ত কামাইয়ের পন্থায় পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ভালো মানুষ এখন আর রাজনীতি করে না। আবার অনেকে সখেদে বলেন, রাজনীতি এখন নষ্টদের দখলে চলে গেছে। এসব অভিযোগ বা মন্তব্য সর্বাংশে সঠিক এটা বলা যাবে না। তবে মাঝেমধ্যে এমন সব ঘটনা ঘটে বা পর্দার অন্তরালে সংঘটিত ঘটনা সামনে আসে, তখন এসব অভিযোগের যৌক্তিকতাকে মেনে নিতেই হয়।

রাজনৈতিক দলে দুর্বৃত্তদের আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক বিষয় নয়। অতীতেও এমন ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। যে লোকটিকে সবাই বড়সড় নেতা বলে সালাম দিত, একসময় তার আসল রূপটি জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে। অনেকেরই মনে থাকার কথা ইমদাদুল হক ইমদুর কথা। ১৯৮২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের যুব উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী আবুল কাশেমের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে ছিল একজন খুনি। প্রতিমন্ত্রী আবুল কাশেমের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সে ছিল মহাপ্রতাপশালী।

মন্ত্রীর বাড়ি থেকে খুনি গ্রেপ্তারের ঘটনায় সে সময় দেশজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। নিন্দা প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। সে ঝড় সামাল দিতে পারেনি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকার। ওই একটি ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে সেনাপতি এরশাদ দখল করে নেন রাষ্ট্রক্ষমতা। আবার সেই এরশাদ সরকারের আমলেই এক হরতালের দিন গাজীপুরের কালিগঞ্জে সরকারদলীয় দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হন আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজউদ্দিন আহমেদ।

 ঘটনাগুলো উল্লেখ করলাম এজন্য যে, রাজনৈতিক দলে দুর্বৃত্তদের অনুপ্রবেশ নতুন নয়। তবে ইদানীং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের এতটাই বাড়বাড়ন্ত হয়েছে যে, তাদেরই এখন দাপট বেশি।

রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের দায় একক কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের ওপর চাপালে ভুল হবে। এ পর্যন্ত যে ক’টি দল আমাদের দেশের সরকারে গেছে, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে দুর্বৃত্তায়নকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলই এ দায় এড়াতে পারবে না। ইমদু, গালকাটা কমাল থেকে সম্রাট বা পাপিয়া— এরা সবাই দুর্বৃত্তায়িত্ব রাজনীতির প্রোডাক্ট। রাজনৈতিক দলগুলোই এদেরকে লালন পালন করে থাকে। সুতরাং এদের পাপের দায় রাজনৈতিক দলগুলো এড়াবে কীভাবে?

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।