মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

পুনর্গঠন হবে বিএনপি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০১৯, রবিবার ০২:২৭ পিএম

পুনর্গঠন হবে বিএনপি

ঢাকা : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি নিয়ে নানা রকমের বিশ্লেষণ করছেন দলটির বোদ্ধারা। নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক ত্রুটি চিহ্নিত করতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন শীর্ষস্থানীয় ও নীতিনির্ধারণী মহল।

প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে তৃণমূলের নেতৃত্ব ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিকেই সংস্কার কর্মসূচির প্রাথমিক কাজ বলে মনে করছেন দলটির বোদ্ধারা। সে অনুযায়ী কাজও শুরু করেছেন। স্বচ্ছ পরিকল্পনায় বিভিন্ন স্তরের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

তাই অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ ভেবে নতুন নেতার খোঁজে নামছে বিএনপি। আন্দোলন গড়ে তোলার মতো সক্ষম নেতাদের হাতেই যাবে দলটির নেতৃত্ব। এজন্য আগামী মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে দলের সপ্তম কাউন্সিলের প্রস্তুতি চলছে। কাউন্সিলের মাধ্যমেই নতুন নেতা নির্বাচিত হবে। আলোচনা চলছে— কমিটি বাণিজ্য বন্ধ করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে শীর্ষ নেতারা।

বিদেশে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তার সিদ্ধান্ত মতেই চলছে কাউন্সিলের প্রস্তুতি। এই আয়োজনের উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি আন্দোলন উপযোগী নেতৃত্ব তৈরি করা। দলটির অনেক নেতাকর্মীর মুখে শোনা যাচ্ছে বর্তমান কমিটির অনেক নেতাই বাদ পড়বেন, একই সঙ্গে নতুন মুখ আনার প্রক্রিয়াও চলছে।

বিএনপির পরামর্শক বা বোদ্ধারা মনে করেন, সর্বশেষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে এ দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হবে না। পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন গণআন্দোলন। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে দরকার যোগ্য নেতা। জানা গেছে, এবারের নেতৃত্ব নির্বাচনে তৃণমূলের মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সেজন্যই দলকে শক্তিশালী করতে নতুন নেতার খোঁজে নতুন পরিকল্পনায় এগোচ্ছে দলটির শীর্ষস্থানীয়রা।

তাই এই সময়ে দল পুনর্গঠনই একমাত্র লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন দলের শীর্ষস্থানীয় সূত্রগুলো। দল পুনর্গঠনের বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, যেসব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ রয়েছে সেগুলো পুনর্গঠনে দ্রুতই উদ্যোগ নেওয়া হবে। যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, কাউন্সিলে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া এরই মধ্যে ড্যাব দিয়ে শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় একাধিক নেতা আলাপকালে জানিয়েছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর চলমান পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে নানারকম কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। এজন্য তৃণমূলের চাহিদা অনুযায়ী দলকে ঢেলে সাজাতে বিভিন্ন পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে তৃণমূল নেতাদের সরাসরি ভোটে নেতা নির্বাচনের বিষয়টিকেও রাখা হয়েছে।

বিএনপির দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ তিন বছর মেয়াদি জাতীয় কাউন্সিল করেছিল বিএনপি। কিন্তু মেয়াদের প্রায় শেষ পর্যায়েও কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি দলটি। বিষয়ভিত্তিক কমিটি গঠনের কাজও হয়নি। এক নেতার এক পদ করার বিধি সর্বক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির ২টি পদ ঘোষণার সময়ই ফাঁকা ছিল। বাকি ১৭ সদস্যের মধ্যে ৩ সদস্য মারা গেছেন। বর্তমানে ৫টি পদ ফাঁকা।

এ ছাড়া অসুস্থতা, বিদেশে অবস্থান ও কারাগারে থাকার কারণে কমপক্ষে ৪ নেতা বলতে গেলে অনুপস্থিত। উপদেষ্টা পরিষদেরও কয়েকজন সদস্য মারা গেছেন। বয়সের কারণে অনেকে নিষ্ক্রিয়। বয়স, সাজা, দল ত্যাগসহ বিভিন্ন কারণে অনেক ভাইস-চেয়ারম্যানও নিষ্ক্রিয়। যুগ্ম মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে বেশিরভাগ নেতার অসংখ্য মামলা এবং অনেকেই কারাগারে থাকার কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারছেন না।

মৃত্যু, বয়সবৃদ্ধ-মামলাসহ নানা কারণে সম্পাদকমণ্ডলী ও নির্বাহী কমিটির অনেক সদস্যও সংগঠনের তেমন কাজে আসছে না। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটির মতোই বেহাল দশা ঢাকা মহানগর বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর।

১ মাসের সময় দিয়ে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের আংশিক কমিটি দেওয়া হলেও বছরের পর বছর পার হলেও তা পূর্ণাঙ্গ হয়নি। সব কিছুতে দলটির বেহাল দশার কারণে ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই। তাই দুই মাসের মধ্যে কাউন্সিল করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাহিদা কি, তা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। তৃণমূলের চাহিদা অনুসন্ধানে প্রথম বিষয়টি বের হয়ে এসেছে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি। সবার আগে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার বিষয়ে কোনো নেতাকর্মীর দ্বিমত নেই। এজন্য খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন বেগবান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার কারাবন্দির এক বছরপূর্তি হতে যাচ্ছে।

সেদিকে লক্ষ্য রেখে আইনি লড়াইসহ মুক্তি আন্দোলন আরো বেগবান করা হবে। এর বাইরে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অন্যান্য চাওয়ার মধ্যে রয়েছে, জাতীয় সংসদের পুনর্নির্বাচনের দাবিতে কর্মসূচি প্রণয়ন, ভবিষ্যতে ভোটাভুটির মাধ্যমে সাংগঠনিক কমিটি গঠন, স্থানীয় সরকারসহ প্রতিটি নির্বাচনে বিএনপির অংশ গ্রহণ বা বর্জনের বিষয়ে আগে থেকেই সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া।

এদিকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা না নেওয়ার বিষয়েও তৃণমূলের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নিতে কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন পর্যায়ের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃণমূলের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে দল পুনর্গঠনের ভাবনাকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হলে দ্রুত দল পুনর্গঠন করতে হবে।

সূত্রমতে, তৃণমূলের মতামত অনুযায়ী নির্বাচনের পর স্থায়ী কমিটির দুই বৈঠকে দল পুনর্গঠনের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবারের দুই ঘণ্টার বৈঠকে ভিডিও কনফারেন্সে তারেক রহমানও উপস্থিত ছিলেন। তাতে নতুন নেতৃত্বের আলোচনাই এসেছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই