বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শ্রমজীবী মা

ফয়জুন্নেসা মণি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১২ মে ২০১৯, রবিবার ০২:০৯ পিএম

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শ্রমজীবী মা

ঢাকা : পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শ্রমজীবী হচ্ছেন ‘মা’। কারণ তার কোনো কর্মবিরতি নেই। মজুরি নেই। ছুটি নেই। দাবি নেই, শর্ত নেই, স্বার্থ নেই। কেবলই নিঃস্বার্থভাবে সন্তানের জন্য শ্রম বিলিয়ে দেন অকাতরে। ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং বলেছিলেন, ‘মাতৃত্বেই সব মায়া-মমতা ও ভালোবাসার শুরু এবং শেষ।’ সন্তানের প্রিয় খাবার, প্রিয় বই, প্রিয় রঙ, প্রিয় পোশাক— সন্তানের জীবনের ছোটখাটো বিষয়গুলো, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বহীন বিষয়গুলোও  মায়ের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবু আমরা কেন যেন মায়ের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়ি! আমরা ভুলে যাই— প্রতিটি সন্তানের দায়িত্ব মায়ের প্রতি আন্তরিক হওয়া। মায়ের মন, চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-স্বপ্ন এবং প্রিয়-অপ্রিয় বিষয়গুলোর প্রতিও সন্তানদের যত্নবান হওয়া দরকার।

জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ বলে গেছেন, ‘মা হলো পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক, যেখানে আমরা আমাদের সব দুঃখ-কষ্ট জমা রাখি এবং বিনিময়ে নিই বিনাসুদে অকৃত্রিম ভালোবাসা।’ সত্যিই মা হলেন দুঃখজমানো একটি ব্যাংকের নাম। মাকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানানোর জন্য আলাদা কোনো দিবসের প্রয়োজন নেই। তবু আধুনিক বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রোববারটিকে ‘মা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। যার সূত্রপাত ১৯১৪ সালের ৮ মে থেকে, সঙ্গে উপহার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সাদা কারনেশন ফুল।

জন্মদাত্রী মা, গর্ভধারিণী মা, সন্তানের জন্য মা হলো দুনিয়ার জান্নাত। যারা দুনিয়ায় মা পেয়েছেন, তারা যেন দুনিয়াতেই জান্নাত পেয়েছেন। সেই মায়ের জন্য একটি দিবস নয়— মায়ের জন্য হবে প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ। মা আমাদের প্রাণের আকুতি। সন্তানের জীবনে আবেগে, অনুভূতিতে, অস্তিত্বে সর্বত্র মায়ের ভূমিকা বিরাজমান। মা দিবসটি যদিও পশ্চিমাদের প্রবর্তন করা, তবু সম্ভবত মায়ের জন্য সন্তানের অকৃত্রিম ভালোবাসায় বাঙালিরাই সেরা। বাঙালিরাই একমাত্র জাতি যারা রক্ত ও জীবন বিসর্জন দিয়ে মায়ের মুখের ভাষার অধিকার অর্জন করেছে।

মায়ের কাছে সন্তান কত না প্রিয়। সে সন্তান কালো হোক, ধলা হোক, ছেলে কিংবা মেয়ে হোক, বোবা হোক, কানা হোক- সব সন্তানই সব মায়ের কাছে শ্রেষ্ঠ সম্পদ; মানিক-রতন। আবার মা শব্দটি আমাদের কাছে এত প্রিয়— মায়ের বাহ্যিকতা সন্তানের কাছে অতি নগণ্য। মায়ের হাসি সন্তানের কাছে সেরা উপহার। মা সন্তানের কাছে তেমন কিছুই চায় না। মা শুধু সন্তানের সুখ-শান্তি আর হাসিমাখা মুখ দেখতে চায়। মায়ের প্রতি সন্তানের আস্থা ও নির্ভরতা বিষয়ে একটা ছোট গল্প

একটা ভাঙা সেতু পার হচ্ছে মা আর তার ছোট ছেলে। মা বলছে, আমার হাতটি ধরো বাবা। ছেলে বলছে, না মা, তুমিই আমার হাত ধরে রাখো। অবাক হয়ে মা বলছে— কেন, তুমি আমার হাত ধরলে অসুবিধা কী? মৃদু হেসে ছেলে বলছে— আমি যদি তোমার হাত ধরি, কোনো সমস্যায় পড়লে হয়তো আমি তা ছেড়ে দেব। কিন্তু মা, তুমি যদি আমার হাত ধরো— আমি জানি, যত বড় সমস্যাই হোক ওই হাত তুমি ছাড়বে না! এই হলেন মা।

মায়ের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। শিশুর যত্ন, রোগীর সেবা, ঘরের যাবতীয় কাজ পালনসহ অনেক দায়িত্বশীল কাজের দায়িত্ব নিতে হয় তাদের। মায়েদের এসব কাজ অদৃশ্য শ্রম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অথচ মায়েদের এসব কাজের যদি আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারসহ সব ক্ষেত্রে মায়ের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। যদিও অর্থনীতিতে মায়েদের অবদানের চিত্র তুলে ধরতে অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। মায়েরা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করে, অধিককাংশ সময়ই সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাত পর্যন্ত ১৬-১৮ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তাদের ছুটি খুব কম এবং অবসর নেই। গ্রামের মায়েরা কৃষিকাজসহ বহু কাজের সঙ্গে সমাজে সম্পৃক্ত। ধানের মৌসুমে, সবজির মৌসুমে বাগান করা, ফসল কাটা, ঘরে তোলা, বীজ সংরক্ষণ করা, খাবার প্রস্তুত করা, গৃহপালিত পশুপাখি পালন করা, হস্তশিল্প, গৃহকর্ম একসঙ্গে করতে হয়।

বিজ্ঞান বলছে, একজন মানুষ ৪৫ ইউনিট ব্যথা একবারে সহ্য করতে পারে। তার বেশি ব্যথা সহ্য করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু একজন মা সন্তান প্রসবকালে ৫৭ ইউনিটের বেশি ব্যথা সহ্য করেন!  এই ব্যথার যন্ত্রণা ১০টি হাড় একসঙ্গে ভেঙে যাওয়ার ব্যথার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। একবার ভাবুন মায়েরা কত কষ্ট করে আমাদের জন্ম দিয়েছেন? আমরা কি কখনো ভাবি— একজন মা ৫-১০ জন পর্যন্ত সন্তান জন্ম দিতে পারেন। যদিও তার চেয়ে অধিক সন্তান জন্মদান ও লালন পালনের রেকর্ড আছে। আর আমরা সেই ৫-৭ জন সন্তান মিলে একজন মায়ের দায়িত্ব নিতে পারি না! কী লজ্জার কথা। সেই রত্নগর্ভা মায়েরা জীবনের শেষ সায়াহ্নে এসে সন্তানদের অনাদর অবহেলার শিকার হলে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে ভাবুন!

মায়ের পরিচয় শুধুই মা। মাতৃত্বের চেয়ে সেরা সৃষ্টি আর কী হতে পারে! আরেকটি গল্প শুনুন মায়ের। একজন মা পাসপোর্ট করার জন্য অফিসে গেলে অফিসার জানতে চাইলেন, আপনার পেশা কী? তিনি জবাব দিলেন— আমি একজন মা। কী অদ্ভুত তাই না, শুধু মা তো কোনো পেশা হতে পারে না! কারণ এর বিনিময়ে তো অর্থ উপার্জিত হয় না। অফিসার বললেন- ঠিক আছে, আমি লিখে নিচ্ছি গৃহিণী। সেই মা পাসপোর্ট পেলেন এবং সন্তানের চিকিৎসা নিতে বিদেশে গেলেন। তারও অনেক দিন পর, পাসপোর্টটি নবায়ন করা দরকার। আবার পাসপোর্ট অফিসে গেলেন। এসে দেখেন সেই অফিসার নেই। মা ফরম পূরণ করতে গেলে অফিসার জানতে চাইলেন, আপনার পেশা? মা এবার সাহস করে বললেন, আমি একজন গবেষক। নানা রকম চ্যালেঞ্জিং প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করি। শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ সাধন পর্যবেক্ষণ ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করি। বয়স্কদের নিবিড় পরিচর্যার দিকে খেয়াল রাখি। সুস্থ পরিবার ও সমাজ বিনির্মাণে নিরলস শ্রম দিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামো-ভিত মজবুত করি। কারণ আমার সামান্য ভুলের জন্য পরিবার, সমাজ তথা জাতির বিশাল ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। কথা শুনে অফিসার নড়েচড়ে বসলেন। শ্রদ্ধায় অবনত নজরে তাকিয়ে অফিসার জানতে চাইলেন, আচ্ছা মা, আমাকে বলুন আপনার পেশাটির নাম কী? মা বলতে লাগলেন, আমার রিসার্চ প্রজেক্ট তো দীর্ঘমেয়াদি চলছে তো চলছেই। আমাকে সার্বক্ষণিক ল্যাবরেটরি এবং বাইরেও কাজ করতে হয়। নাওয়া-খাওয়া এমনকি ঘুমেরও সময় পাই না কখনো কখনো। আমার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আমি তিনবার জীবনের মূল্যবান পুরস্কারে ভূষিত হয়েছি। এখন আমি সমাজবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান আর পারিবারিক বিজ্ঞান— এ তিনটি ক্ষেত্রেই একসঙ্গে কাজ করছি। প্রতিদিন আমাকে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা আবার কোনো কোনো দিন ২৪ ঘণ্টাই আমার ল্যাবে গবেষণা ও কাজকর্ম চলে। পৃথিবীর সব পেশাতেই কাজের পর ছুটি বলে যে কথাটি আছে, আমার পেশায় তা নেই। ২৪ ঘণ্টাই অন কল ডিউটি। শিশু, কিশোর, যৌবন, তারুণ্য, বিয়ে, সংসার জীবন, বিপদ-বিপর্যয় মোকাবেলা, জীবন সাজানো, মধ্য বয়স, বয়স্ক সব পর্যায়ে আমার নিবিড় তত্ত্বাবধানে বিকশিত হচ্ছে জীবন থেকে জীবনে। অফিসারের শ্রদ্ধাবনত অবস্থা দেখে তিনি আরো বলছেন- এই পেশা থেকে আমার কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই। বেতন নেই, প্রমোশনও নেই। অবসরও নেই হয়তোবা। প্রশান্তি আছে, অর্জন আছে, ডিপোজিট আছে। অফিসার অবাক বিস্ময়ে— এ কেমন পেশা মা, বেতন নেই, প্রমোশন নেই কিন্তু ডিপোজিট আর অর্জন আছে। মা হেসে বললেন, আমি যাদের জন্য কাজ করি তাদের সফলতাই আমার শ্রেষ্ঠ অর্জন এবং প্রশান্তি। তারাই তো আমার পৃথিবী, আমার ডিপোজিট। এর পরও কি আমার পেশার বিশেষ পরিচয় দরকার আছে? অফিসার আমতা আমতা করে বলতে চাইলেন, না মানে মা...। অফিসারকে থামিয়ে দিয়ে তিনি বললেন— আমি একজন মা। অতি সাধারণ একজন মা। এর চেয়ে বড় পেশাদার পরিচয় আর কী হতে পারে বলতে পারো বাবা? অফিসার মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে এই মায়ের কথাগুলো শুনলেন। অফিসারের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। আসলেই তো ‘মা’ একটি মধুর শব্দ ঝংকার। মায়ের আলাদা কোনো উপাধির প্রয়োজন নেই। মা নিজেই একটি বিজ্ঞানাগার। এই মায়ের মাতৃত্ব গবেষণাগার নিবিড় যত্নে গড়ে তোলেন একেকটি মানবিক নক্ষত্র। সেই নক্ষত্ররাজি কি সত্যিই আলোকিত করে মায়ের মুখ!

আমরা যদি দায়িত্বশীল হই, মায়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হই- তাহলে আর কোনো মায়ের দুঃখ থাকবে না। আর পৃথিবীতে বৃদ্ধাশ্রম বলে কিছু থাকবে না। বৃদ্ধাশ্রম হলো পৃথিবীর দায়িত্বহীন সব সন্তানের জন্য অভিশাপ, আর পৃথিবীর ঘৃণা। আমাদের ধর্মেও একথা আছে— ‘তোমরা কোনো অবস্থাতেই এমন আচরণ করো না যাতে মা দুঃখ পেয়ে উহ্ শব্দটি উচ্চারণ করেন।’ মায়ের মন সন্তানের জন্য সবসময়ই কাঁদে। মা তখনো কাঁদে যখন সন্তান খাবার খায় না আবার মা তখনো কাঁদে যখন সন্তান খাবার দেয় না। আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি, আর কখনো মাকে কাঁদতে দেব না। সবকিছু উজাড় করে দিয়ে সুখী করব প্রিয় মাকে। মায়ের মুখে হাসি ফোটাবো। কেননা আমাদের যা কিছু সবই মায়ের অবদান।

লেখক :  কবি


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।