বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার ০১:৪০ পিএম

পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই

ঢাকা : আমদানিতে সামান্য ছন্দপতন, তাতেই আবার পেঁয়াজের দাম শতক পেরিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশে উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই; আর সে পর্যন্ত পণ্যটির ঝাঁজ কাঁদাতেই থাকবে এমন মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।

দুই সপ্তাহ আগে যখন ভারত রপ্তানি বন্ধ করেছিল ওই সময় পেঁয়াজের দাম শতক পেরিয়ে যায়। এরপর চারদিনের মাথায় দাম কিছুটা কমলেও তার মূল কারণ ছিল রপ্তানি বন্ধের পরও ভারতে আটকা থাকা পেঁয়াজ দেশে আসা।

কারণ তখন রপ্তানি বন্ধের আগে ভারত যেন প্রতিবেশীদের জানিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ করে দেয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন মন্তব্যের পরিপেক্ষিতে ভারত আগে খোলা এলসির প্রায় ১০ হাজার টন পেঁয়াজ বাংলাদেশে পাঠায়। আর সে পেঁয়াজে পরের কয়েকদিন বাজারে জোগান বেড়েছিল।

এখন ভারত থেকে আর কোনো পেঁয়াজ আসছে না। তোড়জোড় কমে গেছে মিয়ানমার, তুরস্ক ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানিরও। যেখানে আমদানি নিষিদ্ধ করার পর পাঁচ দিনে দেশে ওই তিন দেশ থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার টন পেঁয়াজ এসেছিল। এখন শেষ পাঁচ দিনে এসেছে তার অর্ধেকেরও কম। আর এ কারণে পেঁয়াজের দামে দ্বিতীয় দফার উল্লম্ফনের কারণ সরবরাহ সংকট।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুরশিদ বলেন, ভারত থেকে আমদানি বন্ধ হওয়াতে পেঁয়াজ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সময় এসেছে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি এটা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিচ্ছে, আমাদের পর্যাপ্ত পেঁয়াজের জোগান নেই। ফলে এখন নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, ধান ছাড়া অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ছে না, সেটা জমির স্বল্পতার কারণে। ফলে সরকারের বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি কিছুটা চাহিদা অবশিষ্ট থাকলে সেটা আমদানি করতে হবে। আর পেঁয়াজ যেহেতু মৌসুমি পণ্য, সেটা সব সময়ই ভোগাবে।

দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন। তবে উৎপাদন নিয়ে হিসাব দুই রকম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসেবে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে ১৮ লাখ ৩ হাজার টন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ১১ লাখ টনের মতো।

এতে ডিএইর হিসাব ধরলে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় ৩৪ লাখ টনের বেশি। এখান থেকে ৩০ শতাংশ পচে যাওয়া বাবদ বাদ দিলে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় ২৪ লাখ টনের মতো।

বিবিএসের উৎপাদনের পরিসংখ্যান ধরে হিসাব করলে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় ২০ লাখ টনের কিছু বেশি (৩০ শতাংশ বাদ দিয়ে)। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৪ লাখ টন।

কিন্তু বাংলাদেশ যতটুকুই পেঁয়াজ উৎপাদন করুক না কেন পেঁয়াজের দাম কী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে এর আমদানি মূল্যের ওপর। এক কথায় এতদিন সেটি হতো ভারতে পেঁয়াজের দাম ঠিক কি না তার ওপর।

এদিকে চলতি মাসের শেষ দিকে পেঁয়াজ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ভারত তুলে নিতে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

সোমবার (১৪ অক্টোবর) সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বস্ত্র খাতের সামগ্রিক বিষয়ে আলোচনা ও ‘জাতীয় বস্ত্র দিবস-২০১৯’ উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় কমিটির সভার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন।

তিনি বলেন, এ মাসের শেষে ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানিতে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল সেটা তুলে নেবে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, আশা করা যায় চলতি মাসের শেষে তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে।

তিনি আরো বলেন, শেষ কয়েকদিন মিয়ানমার একটা সাধারণ উৎসবের কারণে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রেখেছিল। ফলে সাপ্লাই বন্ধ ছিল, এজন্য দাম বেড়েছে। তারপরও অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। আমরা পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি।

টিপু মুনশি বলেন, বাণিজ্য সচিব পেঁয়াজ আমদানিকারদের সঙ্গে ইতোমধ্যে বৈঠক করেছেন। বড় কিছু আমদানিকারক যেমন সিটি গ্রুপের সঙ্গে কথা হয়েছে, এ ধরনের বড় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

আমদানির মাধ্যমে পেঁয়াজে সহসা স্বস্তি ফিরবে না সেই ইঙ্গিত এসেছে বাণিজ্যমন্ত্রীর কথায়ও।

তিনি বলেন, পেঁয়াজের যে সোর্স ছিল (ভারত) সেটা বন্ধ হওয়ার কারণে চাপ বেড়ে গেছে। পেঁয়াজের দাম আরো কিছুদিন থাকতে পারে। আমি আজকেও বলব প্রধানমন্ত্রী বলেছেন একটু কষ্ট করতে হবে। যেহেতু আমাদের নিজেদের উৎপাদন কম, সেহেতু আমাদের পরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ভারত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এ চাপ থাকবে।

এদিকে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের পরে পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমলেও ফের বাড়তে শুরু করায় ভোক্তামনে আবারো শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাজারে সরকারিভাবে পেঁয়াজ বিক্রির একমাত্র প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) আইনি জটিলতার কারণে কোনো পণ্য আমদানি করতে পারে না। প্রতিষ্ঠানটি বাজারে ৪৫ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি করলেও চাহিদার তুলনায় এর সরবরাহ খুবই নগণ্য।

বেসরকারি উদ্যোগে পেঁয়াজ আমদানি করতে গেলে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে হচ্ছে। মিয়ানমার থেকে আসা পেঁয়াজের চালান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং মানও ভালো নয় বলে নতুন করে আমদানি করার সাহসও দেখাচ্ছেন না আমদানিকারকরা। এ কারণে অন্যান্য ব্যবসায় জড়িত বড় বড় কোম্পানিকে বেছে নিচ্ছে সরকার।

এ ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশেষ করে মেঘনা, সিটি, এস আলম বা এ মোনেমের মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পেঁয়াজ আমদানির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিন।

কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যারা কখনোই পেঁয়াজের ব্যবসা করেননি বা পেঁয়াজ আমদানি করেননি, তারা কোন সুবিধায় পেঁয়াজ আমদানি করবেন?

সোনালীনিউজ/এমটিআই