বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫

পেটের তাগিদে স্কুল ছেড়ে হোটেলে ওরা!

চট্টগ্রাম ব্যুরো | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৯, শুক্রবার ০৪:৪৩ পিএম

পেটের তাগিদে স্কুল ছেড়ে হোটেলে ওরা!

চট্টগ্রাম: যে বয়সে বই, খাতা, কলম নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার কথা। সে বয়সে এরা পেটের তাগিদে হোটেলে কঠোর পরিশ্রম করছে। পড়ার ইচ্ছা ছিলো প্রবল কিন্তু পরিবারের দৈন্যদশা, অভাব অনটন ও বাবার বৈরী মনোভাবে তাদের সে আশা-আকাঙক্ষা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। দারিদ্রতার কারণে আর লেখাপড়া করতে পারছেনা। তারা এখন হোটেলের শিশু শ্রমিক।  

বলছিলাম আরাফাত হোসেন (১১) ও আব্দুল আহাত (৯) নামে দুই সহোদরের কথা। তারা একই হোটেলে বয় হিসেবে কাজ করছে। আরাফাত পড়ত কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যারটেক বাগদাদ মাদরাসায়। আর আহাত পড়ত চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের ইছানগর পুড়াবাড়ির ব্রাক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে।

কিন্তু অভাবের কারণে আরাফাত ও আহাত দুজনেই পুরাতন ব্রীজঘাট হোটেল ক্যাফে আয়ান রেস্টুরেন্টে কাজ করে। বাবা থেকেও নেই মাদকে বিপর্যস্ত। মা গৃহিণী সংসার চলবে কেমনে। এই দুই শিশুর হোটেলের দৈনিক মজুরি ২০০ টাকা। যা দিয়ে সংসার চলে এবং এতেই ভরসা তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

অথচ তাদের দুজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা পড়তে চায়। কিন্তু কে তাদের পড়াবে! তারা যদি পড়তে স্কুলে যায় তাহলে সংসার চলবে কেমনে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের রাষ্ট্র, সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে হয়তো থাকতে পারে কিন্তু আমাদের কাছে নেই।

শিশু শ্রম সরকারি আইনে দন্ডনীয় অপরাধ হলেও তা কেউ মানছে না। সর্বত্র শিশু শ্রম নিষিদ্ধ হলেও ঘর থেকে বের হলে দেখা যায় শিশু শ্রমের করুণ চিত্র।
সরেজমিনে কর্ণফুলীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, শিশু শ্রমিকরা হোটেল, ইটভাটা, পাথর ভাঙা, শিল্প কলকারখানা, জাহাজ ভাঙা, পশুপালন, নির্মাণ কর্ম, রিকশা-ভ্যান চালানো, লোহা কাটা মোটর ওয়ার্কশপ থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি, মিষ্টির দোকান, চায়ের দোকান, সবজি দোকানসহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। আবার কিছু কিছু শিশু উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত ফেরি করে বেড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে।

এসব শিশু শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে তারা আজ স্কুল ছেড়ে জীবন ও জীবিকার তাগিদে এ পথে নেমেছে। তাদের কচি মুখে পরিবারের নানা কষ্টের কথা শোনে যে কারো চোখে পানি আসবেই। অথচ এখনো তাঁরা পড়তে চায়। কে নেবে তাদের দায়িত্ব! কে এগিয়ে আসবে তাদের পাশে?

দেখা যায়, বেশ কিছু অস্বচ্ছল পরিবার তাদের শিশুদের একটু বাড়তি আয়ের আশায় কলকারখানায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ঠেলে দিচ্ছেন। শিশুরা না জেনেই ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাজ গুলো করছে।

জানা যায়, আরাফাত হোসেন (১১) ও আব্দুল আহাত (৯) এর বাবার নাম আনোয়ারা হোসেন। পেশায় একজন রং মিস্ত্রি। কোনো দিন বাসায় টাকা দেয় আবার কোনো দিন তিনি বাসায় ও আসেন না। মাদকের সঙ্গে জড়িত ছিলো এক সময়। মায়ের নাম জান্নাত বেগম। তিনি একজন গৃহিণী। পুর্বে এরা চাঁদপুরের নাওলা গ্রাম থেকে ৬ বছর আগে কর্ণফুলীতে আসেন। পরে ইছানগর এলাকার এক কলোনীতে বসবাস করছেন।

সংসারে অভাবের কারণে মাদরাসা আর স্কুলের বারান্দায় পৌঁছাতে পারছেনা তারা দুভাই। ভোর হতেই আনোয়ার সিটির হোটেল আয়ানে চাকরি। সারাদিন এ টেবিল থেকে ও টেবিল। পুরাদিন কত জনের দমকি আর বকা শিশু বয়সেই তাদের হজম করতে হয়।

একমাত্র পরিবারের অভাবের কারণেই খাবার হোটেলে চাকরি করছে তাঁরা। আরাফাত হোসেন জানায়, সমাজের আর দশজন শিশুর মতো তার ইচ্ছে ছিল লেখাপড়া করে অনেক বড় মানুষ হবে। বড় বড় মানুষের মতো তার স্বাদ ছিল। বড় বড় গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াবে দেশ-বিদেশ। আর মায়ের চোখের জল মুছে দেবে। কিন্তু তা কি সম্ভব!

উল্লেখ্য, শিশুদের অধিকার, সুরক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম প্রতিরোধের লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ’ অনুমোদিত হয়।১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শিশুশ্রম বন্ধ করতে কর্মসূচি হাতে নেয় এবং ২০০২ সালের ১২ জুন থেকে আইএলও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবছর বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।

আইএলও’র সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি ছয় শিশুর মধ্যে একজন শ্রমিক এবং প্রতি তিন শিশুশ্রমজীবীর মধ্যে দুজনই গৃহকর্মের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই গৃহকর্মী শিশুদের সুরক্ষায় তেমন কোনো ব্যবস্থা নাই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রম একটি প্রকট সমস্যা। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, বিপুল পরিমাণ দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে জীবনের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হয়, এদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের নিয়োগ করা হয় বিভিন্ন শ্রমে। কারণ তারা শিশুদের শ্রমে নিয়োগ করা একটি লাভজনক প্রক্রিয়া মনে করেন। পাশাপাশি মালিকগোষ্ঠিও শিশুদের দ্বারা স্বল্পমূল্যে কাজ করানোর সুবিধা পান। এতে শিশুদের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হয় প্রতিনিয়ত।

সরকারি জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে শিশুশ্রমজীবী সংখ্যা ৭৯ লাখ। এদের মধ্যে ৬৪ লাখ গ্রামাঞ্চলে এবং বাকী ১৫ লাখ শহরে বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত। এসব শ্রমিকের মধ্যে ৪৫ লাখ শিশুশ্রমজীবী ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত। এদের মধ্যে ৩২ লাখ শিশু সপ্তাহে ১৪ ঘণ্টা এবং ১৩ লাখ শিশুশ্রমজীবী সপ্তাহে ৪৩ ঘণ্টা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮০টি দেশে নানান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুশ্রম বিরোধী জনসচেতনতা মূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। কিন্তু বন্ধ হচ্ছেনা শিশুশ্রম। বন্ধ হচ্ছেনা বলে আজ শিশুরা স্কুল ছেড়ে হোটেলে।

সোনালীনিউজ/এমএইচএম

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue