রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

করোনা ভাইরাস

প্রস্তুতি স্বল্প বাড়ছে শঙ্কা

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২০, সোমবার ০৩:৫০ পিএম

প্রস্তুতি স্বল্প বাড়ছে শঙ্কা

ঢাকা : বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র। প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত দেশটির প্রতি ১০০ জনের মধ্যে মারা গেছে ৬ দশমিক ৯২ জন। এরপর ইরাক, চীন, অস্ট্রেলিয়া। নাগরিকদের সর্বোচ্চ সেবাদানকারী দেশগুলোতেই যদি করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা এমনটি হয়; তাহলে ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশের অবস্থা কেমন হবে?

এ হিসাব কষতে বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনবোধ করছেন না সাধারণ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতি হলে দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা নিদেনপক্ষে লাখের কোঠায় পৌঁছাবে তাতে সন্দেহ নেই। শঙ্কা থেকেই গত সন্ধ্যায় নিত্যপণ্য ব্যতীত দোকান মালিক সমিতি ঘোষণা দিয়েছে তারা ২৫ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে দোকানপাট বন্ধ রাখবে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যে ‘জনতার কার্ফু’ ডাক দিয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সপ্তাহ দুয়েক পরেই দেশে ভয়াবহরূপ নিতে পারে করোনা। ইতোমধ্যে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তে ভুল ছিল বলেও দাবি তার। এর এক দিন আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে সাঈদ খোকন জানিয়েছেন দেশকে এখনই লকডাউনের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

আর গতকালই তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ মেয়রের কথার পাল্টা জবাব দিয়ে জানিয়েছেন ওই কথাটি (লকডাউন) সঠিক নয়। শাসক দলের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী’।

মহামারীর নিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কথামালা, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আর চিকিৎসাব্যবস্থাপনার সঙ্গে গরমিল পাওয়ায় দিনে দিনে শঙ্কিত হয়ে পড়ছে দেশবাসী। ধাপে ধাপে দেশের খণ্ডাংশ লকডাউন করায় ভীতি আরো বাড়ছে।

ইতোমধ্যে মাদারীপুরের শিবচর, গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর, রাজধানীর মিরপুরের একটি বাড়িসহ নতুন করে জামালপুর ও ফরিদপুরের যৌনপল্লি লকডাউন করা হয়েছে। লকডাউনে আছে সীমান্তবর্তী স্থল ও নৌপথ বন্দরও। গণবিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।

গতকাল রোববার জানা গেছে, সরকারের আশ্বাসে আস্থা পাচ্ছেন না রাজধানীর একাধিক এলাকায় বহুতল ভবনের মালিক-ভাড়াটেরা। তারা নিজ উদ্যোগে লকডাউনের মতো ব্যবস্থা নিয়েছেন। পরিবারের ২-১ জন সদস্য ছাড়া কেউ বাইরে যাচ্ছেন না। যশোরেও সপ্তাহের জন্য দোকানপাট বন্ধ রাখবে স্থানীয়রা। দিন যত যাচ্ছে লকডাউনের পরিধি তত বাড়ছে।     

এদিকে আসন্ন বিপর্যয় ঠেকাতে দেশে এখনই জরুরি অবস্থা জারি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ দাবি করছেন এখনই জরুরি অবস্থা জারি প্রয়োজন আবার কেউ বলছেন পরিস্থিতি এখনই তেমন হয়নি।

সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরে গতকাল নগর ভবনের সভাকক্ষে সিটি করপোরেশন এলাকায় করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ এবং মোকাবিলার লক্ষ্যে গঠিত কমিটির জরুরি সভায় সভাপতির বক্তব্যে সাঈদ খোকন বলেন, প্রবাসীরা অবাধে বিচরণ করার মাধ্যমে করোনা ছড়িয়ে দিয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটার দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। প্রবাসীদের দেশে এসে অবাধ বিচরণের সুযোগ দেয়া ছিল মারাত্মক ভুল। তিনি আক্রান্তদের খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের খবর করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি এড়াতে বরিশালের গৌরনদীর সীমান্তবর্তী স্থল ও নৌপথ লকডাউন (বন্ধ) করে দিয়েছে প্রশাসন। অন্যদিকে জামালপুরের রানীগঞ্জ যৌনপল্লি এবং গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর লকডাউন করা হয়েছে।

গৌরনদী (বরিশাল) : উপজেলার পার্শ্ববর্তী মাদারীপুর জেলায় করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি থাকায় উপজেলার সীমান্তবর্তী স্থল ও নৌপথ বন্ধ করে পুলিশের চেকপোস্ট বসিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

উপজেলা করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও ইউএনও ইসরাত জাহান জানান, মাদারীপুর জেলা লকডাউন থাকায় সীমান্তবর্তী কালকিনি উপজেলার লোকজন গৌরনদীতে ভিড় করে। জনসাধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে গত শনিবার বিকেল ৫টা থেকে ৬টি স্থল ও ৬টি নৌপথে পুলিশ পাহারা বসিয়ে সব ধরনের যানবাহন লোক চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সীমান্তবর্তী সব খেয়া পারাপার বন্ধ রাখা হয়েছে। গৌরনদী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মাহাবুবুর রহমান জানান, প্রতিদিন সকাল ৬ থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পুলিশ পাহারায় সব ধরনের যানবাহন ও জনসাধারণ চলাচল বন্ধ থাকবে।

জামালপুর : করোনা প্রতিরোধে জামালপুরের রানীগঞ্জ যৌনপল্লি লকডাউন ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল রোববার থেকে আগামী এক মাস এই যৌনপল্লি লকডাউনের আওতায় থাকবে। জামালপুর জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জন অফিসের আয়োজনে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে গঠিত জেলা পর্যায়ের কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক এনামুল হক। এ সময় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসক এনামুল হক বলেন, লকডাউন সময়কালীন যৌনকর্মীদের জনপ্রতি ৩০ কেজি চাল ও বিদ্যুৎ বিল দেওয়া হবে। মালিকদের বাড়িভাড়া না নেওয়ার জন্য নিদের্শ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের সহযোগিতা করার জন্য শহরের বিত্তবানদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

পৌর মেয়র মির্জা সাখাওয়াতুল আলম মনি বলেন, রানীগঞ্জ যৌনপল্লিতে ৫০ জন বৃদ্ধা, ৯৭ জন সক্রিয় যৌনকর্মী ও ২ জন পাহারাদার রয়েছেন। তাদের জনপ্রতি ৩ কেজি চাল দেওয়া হবে।

একাধিক যৌনকর্মী জানিয়েছেন, এখানে দুই শতাধিক যৌনকর্মী রয়েছেন। ৯টি বাড়িতে ১৭৪টি ঘর রয়েছে। প্রতিটি ঘরে থাকেন ১জন করে যৌনকর্মী। এ ছাড়া প্রায় যৌনকর্মীদের রয়েছে একাধিক সন্তান। লকডাউন সময়ে যৌনকর্মী ও তাদের সন্তানদের খাদ্যসহ বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণ সাহায্য চেয়েছেন প্রশাসন ও বিত্তবানদের প্রতি।

গাইবান্ধা : সাদুল্যাপুর উপজেলায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন দুই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। প্রথমে বিষয়টি কেউ না জানলেও পরে পরীক্ষায় তাদের করোনা শনাক্ত হয়। এ জন্য গোটা উপজেলা লকডাউন ঘোষণা করে প্রশাসন। গতকাল রোববার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সাদুল্যাপুর ইউএনও মোহাম্মদ নবী নেওয়াজ।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর মহাখালীর বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিসিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়, বাংলাদেশে নতুন করে আরও তিনজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

এ তথ্য জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। নতুন তিনজন আক্রান্তের মধ্যে সাদুল্যাপুর উপজেলার দুজন রয়েছেন বলে জানা গেছে। এরপরই বিকেল থেকে সাদুল্যাপুর উপজেলা লকডাউন করা হয়।

সাদুল্যাপুর ইউএনও মোহাম্মদ নবী নেওয়াজ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার ৯নং বনগ্রাম ইউনিয়নের হাবিবুল্লাপুর গ্রামের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেন করোনায় আক্রান্ত দুই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। রোববার তাদের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

কিন্তু বিয়ে অনুষ্ঠানে সাদুল্যাপুর উপজেলার পাঁচ শতাধিক মানুষ অংশ নিয়েছেন। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় পুরো উপজেলা লকডাউন ঘোষণা করা হলো। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত লকডাউন বলবৎ থাকবে।

এ সময় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হতে পারবে না। ইউএনও মোহাম্মদ নবী নেওয়াজ বলেন, রোববার বিকেলে ঢাকা থেকে আমাদের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ওই দুই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীর শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া গেছে। তারা দুজন ইতোপূর্বে বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ায় পুরো উপজেলা লকডাউন করা হয়েছে।

অবশ্য এমন ঘোষণার পর ইউএনও মোহাম্মদ নবী নেওয়াজ ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘পুরো সাদুল্যাপুর লকডাউন করা হয়নি। শুধু আক্রান্তদের পরিবার এবং সন্দেহভাজনদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। ভুল তথ্য ছড়াবেন না।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই