শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো কেন বন্ধ নয়?

ড. হারুন রশীদ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২০, শুক্রবার ০৯:৫৮ পিএম

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো কেন বন্ধ নয়?

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় গণজমায়েতকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এমনকি স্থগিত করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে দেশ-বিদেশের বরেণ্য অতিথিদের উপস্থিতিতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে মুজিববর্ষের এই অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল।

দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অনুষ্ঠান স্থগিত করে বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ায় প্রশংসাও পাচ্ছেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় আরও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। স্কুল কলেজে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন শিশু দিবসে জমায়েতের ব্যাপারেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা না হওয়ায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা রয়েছেন গভীর উৎকণ্ঠায়।

কোমলমতি সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে নিরুদ্বেগ থাকতে পারছেন না তারা। এজন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানাভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার দাবি তুলছেন তারা। কিন্তু ‘পরিস্থিতি তেমন ভয়াবহ নয়’, বা ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে আতঙ্ক ছড়াতে পারে’- এ ধরনের একটি মানসিকতা থেকে এখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত আসছে না।

অথচ সারাবিশ্বেই করোনাভাইরাসের প্রভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদানেও। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, অন্তত ৩৩টি দেশ এ ভাইরাস থেকে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি দেশ গোটা রাষ্ট্রে এবং ১৬টি দেশ বিশেষ কোনো শহর, জেলা বা অঞ্চলে স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) পর্যন্ত ইউনেস্কোর হিসাবে, ১৭টি দেশে পুরোপুরিভাবে স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের কারণে শিক্ষাবঞ্চিত হচ্ছে ৩৬৩ মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থী। আরও ১৬টি দেশে বিশেষ শহর, জেলা বা অঞ্চলে বন্ধ করা হয়েছে স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়, এতে শিক্ষাবঞ্চিত হচ্ছেন আরও ৫৬৭ মিলিয়ন শিক্ষার্থী। গোটা দেশে স্কুল বন্ধ করে দেয়া রাষ্ট্রগুলো হলো- চীন, ইতালি, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, মঙ্গোলিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, জর্জিয়া, ইরাক, কুয়েত, লেবানন, কাতার, উত্তর কোরিয়া, পোল্যান্ড, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর মধ্যে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা সামলে নেয়ায় চীনের কিছু অঞ্চলের গুটিকয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে শুরু করেছে। জাপানে চলছে গ্রীষ্মকালীন ছুটি। আর দক্ষিণ কোরিয়ায় ছুটি শেষে স্কুল খোলার কথা থাকলেও করোনাভাইরাসের কারণে সরকার তা পিছিয়ে দিয়েছে।

সারাদেশে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া হাইস্কুল, মাদরাসা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তো রয়েছেই। কোটি কোটি শিক্ষার্থী প্রতিদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জমায়েত হচ্ছে। একদিকে গণজমায়েতকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হচ্ছে। এই বৈপরীত্য কেন? সারাদেশে প্রতিদিন কোটি কোটি শিক্ষার্থীর জমায়েতের থেকে বড় জমায়েত আর কী হতে পারে? এতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যদি কোনো শিক্ষার্থী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় তার দায় নিবে কে? কথায় আছে prevention is better than cure। কিন্তু কে শোনে কার কথা।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও এর কারণে এখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো কোনো মহল থেকে এ বিষয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বুধবার (১১ মার্চ) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নসরুল হামিদ মিলনায়তনে ‘প্রজন্ম হোক সমতার সকল নারীর অধিকার’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘কেন আমরা এখনও সিদ্ধান্ত দেইনি, তার কারণ আপনারা নিজেরাই শুনেছেন, আইইডিসিসিআর মহাপরিচালক বলেছেন, করোনাভাইরাস নিয়ে বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি বিদ্যমান, তাতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পরিস্থিতি হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার প্রয়োজন হলে তারা আমাদের জানাবেন।’

এছাড়া গত সোমবার রাজধানীর একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন জানান, করোনা আতঙ্কে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার মতো কোনো পরিস্থিতিই তৈরি হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোনো ধরনের নির্দেশনা দেয়া হলে তা বাস্তবায়ন করা হবে। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে এখনই তারা কিছু ভাবছেন না বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সব ধরনের সতকর্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব, তবে এখনই প্রাথমিক স্কুল বন্ধের কথা ভাবছি না।’

কিন্তু কিছুদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলে কী এমন ক্ষতি? প্রয়োজনে রমজানে মাসে প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে কিংবা অন্য সময় বাড়তি ক্লাশ নিয়ে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যাবে। মানুষের জীবন আগে না শিক্ষা? প্রসঙ্গত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লাল সালু উপন্যাসের একটি উক্তি মনে পড়ে গেল ‘ধান দিয়ে কী হবে মানুষের জান যদি না থাকে।’

দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের ভূমিকা প্রশংসনীয়। কিন্তু আমরা এখনো ঘটনা না ঘটা কিংবা কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে চাই না। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের কাদম্বিনীর মত আমাদের মরিয়া প্রমাণ করতে হয় ঘটনার ভয়াবহতা। কোনো দুর্যোগে আমরা কতটা সতর্ক থাকতে পারি, ধৈর্য ধারণ করতে পারি, সেটিও কিন্তু দেখার বিষয়।

স্বস্তির বিষয় যে দেশে আর কোনো নতুন করোনা রোগী পাওয়া যায়নি। গত ২৪ ঘণ্টায় ১০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হলে কারও দেহে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ১০ জনকে আইসোলেশন ইউনিটে রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১৪২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রোববার (৮ মার্চ) বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত তিনজন শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দু’জন পুরুষ ও একজন নারী। তাদের সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে বিদেশফেরত দেশি-বিদেশি নাগরিকদের অনেকেই ১৪ দিন ‘স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি’ থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও তথ্য গোপন করে তারা ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন। সম্প্রতি চাকরির কারণে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশসহ অন্যান্য দেশ সফর করে এসেছেন- এমন অনেকে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে অফিসে যোগদান করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

তাছাড়া বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা হু করোনাকে ‘বৈশ্বিক মহামারী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েই যাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে এ নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য সংক্রমণের ব্যাপারে অনেকেই সচেতন নন। এ অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখাই হবে যুক্তিযুক্ত। সময়ের কাজ সময়েই করতে হয়। নইলে মাশুল দিতে হতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

সোনালীনিউজ/এইচএন


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।