বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬

ছিনতাই হলেও নেওয়া হয় হারানোর জিডি

ফাঁকা ঢাকায় সক্রিয় ছিনতাইচক্র

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২২ মার্চ ২০২০, রবিবার ০২:১৭ পিএম

ফাঁকা ঢাকায় সক্রিয় ছিনতাইচক্র

ঢাকা : গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচা এলাকায় দুই নারী রিকশাযোগে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল আরোহী দুই ছিনতাইকারী তাদের ব্যাগ ধরে টান দেয়। এরপর তারা পালিয়ে যাওয়ার সময় আশপাশের লোকজন ধাওয়া দিলে মোটরসাইকেল নিয়ে পড়ে যায়। পরে তাদের স্থানীয়রা গণধোলাই দেয়। পরে পুলিশ জনরোষ থেকে তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করে।

একই দিন রাত সোয়া ১২টার দিকে মনির হোসেন নামে এক যুবক সেতু ভবনের সামনে দিয়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। সে সময় ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। পরে টহল পুলিশ এসে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। রাত ১টার দিকে সেখানে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মনিরকে মৃত ঘোষণা করেন।

এভাবে প্রতিদিনই ছিনতাইকারীর কবলে পড়ছেন নগরবাসী। একটু রাত হলেই ছিনতাইকারী চক্র নেমে পড়ে মাঠে। ভোর পর্যন্ত চলে তাদের অপরাধ কার্যক্রম। রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশার যাত্রীরাই মূলত তাদের টার্গেট।

মাঝরাতে কাজ শেষে কিংবা বিভিন্ন জেলা থেকে বাস, ট্রেন বা লঞ্চে চড়ে নগরবাসী স্টেশনে নেমে যখন বাসায় ফেরেন তখন রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা থাকে।

অন্ধকার ও ফাঁকা রাস্তার সুযোগ নিয়ে ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীরা এ সময় প্রায়ই হামলে পড়েন রিকশা বা অটোরিকশায় থাকা যাত্রীদের ওপর। কেড়ে নেন যাত্রীদের সঙ্গে থাকা সবকিছু। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সর্বস্ব হারানোর পাশাপাশি প্রাণও হারাচ্ছেন কেউ কেউ। অনেকে আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টানা পার্টি, সালাম পার্টি, বন্ধু পার্টি, গামছা পার্টি নামে রাজধানীতে দাপিয়ে বেড়ায় ছিনতাইকারীচক্র। ডিবি পরিচয়ে গ্রেপ্তার ও মামলার ভয় দেখিয়েও ছিনতাই হচ্ছে। তাদের কবলে পড়ে হতাহত হচ্ছে মানুষ।

রিকশা থামিয়ে, চলন্ত রিকশা, বাসের জানালা, প্রাইভেটকারের খোলা জানালার মধ্যে থাবা মেরে ও পথচারীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ছিনতাই করা হচ্ছে। বিভিন্ন মার্কেটে ভিড়ের মধ্যে এবং জনসমাগমস্থলে কৌশলে নারীদের ব্যাগ কেটে কিংবা ব্যাগের চেইন খুলে মোবাইল ফোনসহ টাকা-পয়সা লুটে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। নারীর শরীর থেকে গহনা হ্যাঁচকা টানে নিয়ে যাচ্ছে। এতে কান ছিঁড়ে রক্তাক্ত হচ্ছেন ভুক্তভোগী নারী।

ছিনতাইকারীরা ছিনতাই কাজে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস ব্যবহার করছে। চলন্ত গাড়ি থেকে তাদের থাবায় রাস্তায় পড়ে মানুষের প্রাণহানিও ঘটছে।

পুলিশ বলছে, ছিনতাইয়ের মামলা করতে নগরবাসীর অনীহা থাকায় অপরাধী গ্রেপ্তারে ধীরগতি। অন্যদিকে নগরবাসীর পাল্টা অভিযোগ, থানায় গেলে ছিনতাইয়ের মামলার ব্যাপারে সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এসব কারণে সব সময়ই তারা আতঙ্কে থাকেন।

ডিএমপির তথ্যানুযায়ী, তুলনামূলক পুরান ঢাকা, মিরপুর, গাবতলী ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাই বেশি ঘটে। তারা বলছে, ছিনতাইয়ের ঘটনায় শেষ ৫ বছরে ডিএমপির আওতাধীন থানায় মামলা হয়েছে প্রায় ৯০০। গত জানুয়ারি মাসে রাজধানীতে ছিনতাই হয়েছে মাত্র পাঁচটি। আর ফেব্রুয়ারিতে হয়েছে ৯টি।

মূলত অপরাধপ্রবণতা কম দেখাতে ছিনতাইয়ের ঘটনা আড়াল করে হারানোর জিডি করতে বাধ্য করেন সংশ্নিষ্ট থানার পুলিশ সদস্যরা। ছিনতাইয়ের শিকার অধিকাংশ লোকই পুলিশের কাছে তাদের ঘটনায় আইনি প্রতিকার চাইতে যান না।

নগরবাসীকে মামলার বিষয়ে আরো উৎসাহিত হতে হবে জানিয়ে পুলিশ বলছে, সহজে মামলা গ্রহণ করতে সব থানায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, মোবাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ মালপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় অল্প কিছুসংখ্যক জিডি হলেও তার তদন্তে গড়িমসি ভাব পুলিশের। অধিকাংশ ঘটনায় ছিনিয়ে নেওয়া মালপত্র উদ্ধার করতে পুলিশ আগ্রহ দেখায় না।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক (অর্থ) জুলফিকার আলী তালুকদার বলেন, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ের সামনে থেকে তিনি বাসে উঠেন। বাসটি সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে মতিঝিল শাপলা চত্বরে গিয়ে আটকা পড়ে যানজটে। মাঝখানের সিটে বসে ছিলেন তিনি, জানালা খোলা। হাতে মোবাইল ফোন।

সড়ক বিভাজকের ওপর থেকে এক ছিনতাইকারী জানালা দিয়ে থাবা মেরে তার মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় তিনি মতিঝিল থানায় যান মামলা করতে। থানার ডিউটি অফিসার তাকে ছিনতাইয়ের মামলা করতে নিরুৎসাহিত করে জিডি করতে বলেন। অবশেষে তিনি হারানো জিডি করেন। যার নম্বর ১৬৬০।

গত ১ মার্চ মিরপুর ১ নম্বরের চায়নিজ এলাকায় এক রিকশাযাত্রীর মোবাইল ফোন থাবা মেরে ছিনিয়ে নিয়ে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় দুই ছিনতাইকারী। ওই ঘটনায়ও থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। মিরপুর মডেল থানা পুলিশ ছিনতাইয়ের ঘটনা আড়ালে রেখে তাকে হারানো জিডি করতে বাধ্য করে। মতিঝিল ও মিরপুর থানায় পৃথক দুটি জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘মোবাইল ফোন রাস্তায় হারিয়ে গেছে।’

অথচ দুটি ফোনই দিনের আলোয় থাবা মেরে ছিনিয়ে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা।

ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না নিয়ে জিডি কেন নেওয়া হলো জানতে চাইলে মিরপুর থানার ওসি মেস্তাজিরুর রহমান বলেন, থাবা দিয়ে কিছু ছিনিয়ে নিলেই ছিনতাই বলা যায় না। ভয়ভীতি ও বল প্রয়োগ করে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে ছিনতাই হিসেবে গণ্য করা হয়।

কেউ যদি অবচেতন মনে থাকেন এবং থাবা দিয়ে তার কাছ থেকে কেউ কিছু কেড়ে নেয়, তবে সেটি গণ্য করা হয় চুরি হিসেবে। যদি তাই হয়, তাহলে চুরির মামলা নিলেন না কেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ঠিক আছে, পাঠিয়ে দিন। মামলা নেওয়া হবে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকায় ছিনতাই করার সময় দুই শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। ওই দিনস ভোর সাড়ে ৪টার দিকে হাইকোর্ট মোড় এলাকা থেকে শাহবাগ থানা পুলিশ তাদের আটক করে।

আটক হওয়া ওই দুজন হলো— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জোবায়ের আহমেদ শান্ত এবং শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের আল আমিন। তারা দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সোহেল নামের এক ট্রাকচালক।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, ছিনতাইয়ের সময় পুলিশ তাদের হাতেনাতে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। ভুক্তভোগীরা মামলা করলে তাদের কোর্টে চালান করে দেওয়া হয়। আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়েছেন।

গত ১৮ মার্চ রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলা এলাকায় ছিনতাইকারীকে ধরতে গিয়ে বাসচাপায় জাহাঙ্গীর আলম নামে এক পুলিশ কর্মকর্তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ বলেন, ছিনতাইকারী দৌড়ে পালানোর সময় তাকে ধাওয়া করেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। তখনই এ ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় দায়ী বাসটি জব্দ করা হলেও পালিয়ে গেছেন চালক ও হেলপার।

কাফরুল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) জাহানুর আলী বলেন, তালতলা এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন জাহাঙ্গীর। সেখানে এক ব্যক্তির ব্যাগ কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল ছিনতাইকারী। জাহাঙ্গীর তাকে ধরার উদ্দেশ্যে দৌড়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় আলিফ পরিবহনের একটি বাস তাকে ধাক্কা দেয়। এতে ছিটকে পড়ে তিনি মারাত্মক আহত হন। এরপর তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালে।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ রাজারবাগে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ হারান রিকশা আরোহী তারিনা বেগম লিপি। প্রাইভেটকারে থাকা ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ ধরে হেঁচকা টান দিলে তিনি রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে মহানগর ডিবি পুলিশ মাঠে রয়েছে। চলতি বছরে প্রায় শতাধিক ছিনতাইকারী পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে।

ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মো. মশিউর রহমান বলেন, ছিনতাইকারী ধরতে প্রতিদিন রাতেই অভিযান চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি একদিনেই অর্ধশতাধিক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue