রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬

না-ফেরার দেশে অভিনেত্রী, নির্দেশক ইশরাত নিশাত

ফুলে ফুলে ঢেকে গেল নিশাতের কফিন

বিনোদন প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২০, মঙ্গলবার ০২:৪৫ পিএম

ফুলে ফুলে ঢেকে গেল নিশাতের কফিন

ঢাকা : বাংলাদেশের থিয়েটার অঙ্গনের ‘বিদ্রোহী কণ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত ইশরাত নিশাত চলে গেলেন অন্যলোকে।

রোববার (১৯ জানুয়ারি) দিবাগত রাত সাড়ে ১১টায় গুলশানে বোনের বাসায় হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা ফয়সল হাসাম তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।

সোমবার (২০ জানুয়ারি) দুপুর ১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তার মরদেহ সেগুনবাগিচার জাতীয় নাট্যশালার সামনে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়।

ইশরাত নিশাত প্রয়াত অভিনেত্রী নাজমা আনোয়ারের কন্যা। তিনি ‘দেশ নাটক’ নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মঞ্চে একাধারে অভিনেত্রী, নির্দেশক ও আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। তার নির্দেশনায় ‘দেশ নাটক’ প্রযোজনা ‘অরক্ষিতা’ প্রশংসিত হয়। অসংখ্য নাটক ও আবৃত্তি প্রযোজনার মঞ্চ ও আলোক নির্দেশকের কাজ করে সংস্কৃতি অঙ্গনে তিনি নিজেকে করে তুলেছেন অনন্য। পাশাপাশি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার কণ্ঠ ছিল সব সময় সোচ্চার।

মঞ্চের প্রিয় মুখ বিশিষ্ট অভিনেত্রী, নির্দেশক ও আবৃত্তিশিল্পী ইশরাত নিশাতের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ।

প্রতিমন্ত্রী এক শোকবার্তায় মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। শোকবার্তায় প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ জানান, বাংলাদেশের থিয়েটার অঙ্গনে ‘বিদ্রোহী কণ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন ইশরাত নিশাত। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার কণ্ঠ ছিল সব সময় সোচ্চার। অসংখ্য নাটক, আবৃত্তি প্রযোজনার মঞ্চ ও আলোক নির্দেশকের কাজ করে সংস্কৃতি অঙ্গনে তিনি নিজেকে করে তুলেছেন অনন্য।

অনন্য এই শিল্পীর আকস্মিক চলে যাওয়াতে তার সহকর্মী এবং স্বজনরা একই সঙ্গে শোকাহত এবং হতবাক। সামাজিক মাধ্যমে তারা প্রকাশ করছেন এই শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা নানাভাবে।

ইশরাত নিশাতের মৃত্যুতে নাট্য নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু শোক প্রকাশ করে লেখেন, ‘বাংলাদেশের নাটকের বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর ইশরাত নিশাত কন্যা আমার এভাবে কী চলে যেতে হয়!’

মঞ্চ কুসুমখ্যাত থিয়েটার কর্মী শিমুল ইউসুফের ভাষ্য : ‘আজ প্রথমবারের মতো শুধু তোর (ইশরাত নিশাত) জন্য অপেক্ষা করছে সবাই। তোর জন্য আলাদা করে কোনো আয়োজন করার সুযোগ তুই আমাদের দিস নাই। এমন আয়োজন চাইনি নিশু।’

ইশরাত নিশাতের সঙ্গে স্মৃতি আওড়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদ কন্যা শাওন মাহমুদ লিখেছেন, ‘ইশরাত নিশাত, সবার নিশাত আপা, আমার নিশি। জীবনের সবচেয়ে ভঙ্গুর সময়ে, নিশি কাছে ডেকে বলেছিল, সেলফ রেসপেক্ট বলে একটা কথা আছে জানিস তো? উত্তরে বলেছিলাম, হুম। পাল্টা জবাবে নিশি বলেছিল, যার সেলফ রেসপেক্ট নাই, তার জীবন উপেক্ষায় আর তাচ্ছিল্যে ভরপুর হয়। নিশির একটি বাক্যে জীবনের মানে পাল্টিয়ে ফেলেছিলাম একদম সেদিন থেকেই। সব সময় বলেছি নিশিকে তা। আবারো বলতে ইচ্ছে হলো। নিজের মতন জীবনযাপন করেছে নিশি। কাউকে কখনো বিরক্ত করে নাই। এমনকি যাবার সময়ও না। ভালোবাসার মানুষের মৃত্যুদিন থাকতে নেই। সে বেঁচে থাকে তার ভালোবাসার মানুষের চোখের পাতায়। এখন থেকে তোমার জন্য নীলমনি ফুল ফুটবে আমার ছাদবাগানে। গুডবাই নিশি। ভালোবাসা।’

নাট্য নির্দেশক সুভাশীষ সিনহা লিখেছেন, ‘এই চাহনিতে আমরা অনেকেই চমকে গিয়েছি, কখনো বিব্রত হয়েছি, সংকোচে পড়েছি, আমাদের সকল গতি একেকবার থমকে গেছেই এই চাউনির সামনে, কী যে বলে উঠবেন! কী যেন মানে করবেন! তারপর নাটকীয়ভাবে হঠাৎ পিঠ চাপড়িয়ে দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠা! শিল্পকলার গেটের কোণে এই মূর্তিমান মহানাট্য আর দেখব না! এই তীক্ষ্ন প্রশ্নমধুর ভালোবাসা আর পাওয়া হবে না এ জীবনে! জীবন ছোট, তবু বেশি ছোট হয়ে গেল না, নিশাত আপা?’

অভিনেত্রী সোহানা সাবার ভাষ্য, ‘তোমার মতো মানুষদের অনেক বছর বেঁচে থাকা উচিত! অথচ তোমরা স্বল্প আয়ু নিয়ে আসো এই অভাগা পৃথিবীতে! ভালোবাসা নিও ইশরাত নিশাত আপু!’

মঞ্চ ও পর্দার দাপুটে অভিনেতা শতাব্দী ওয়াদুদ লিখেছেন, ‘ইশরাত নিশাত’- একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তখন বেইলি রোডে জম্পেশ থিয়েটার হয়। সব দলের কর্মীরাই কমবেশি আড্ডায় অংশগ্রহণ করে। মহিলা সমিতির মূল গেট বন্ধ করার সময় সবার শেষে যে মানুষটি বের হতেন তিনি নিশাত আপা! অনেকদিন সঙ্গী হয়েছি তার আমি, সঞ্জীবন, জগলুল, জাহাংগীর ভাই, রেজভী ভাই, সুজন ভাই- তখন তিনি শান্তিবাগে থাকতেন! বিদায়ের আগে মালিবাগ মোড়ে ডিম-পরোটা খাওয়াতেন! আমাদের থিয়েটার করার দুঃসময়ে অনেকেই যখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তখন তাকে প্রাচ্যনাটের পাশে পেয়েছি বন্ধু হিসেবে, অভিভাবক হিসেবে! আদরও পেয়েছি, কড়া শাসনও পেয়েছি! ৯০-এর দশকে থিয়েটার নিয়ে তার প্যাশন ছিল আইকনিক পর্যায়ের। থিয়েটার-এর সব সেক্টরেই তার দখল ছিল। এরকম একজন মানুষ, বন্ধু চলে গেলেন হুট করেই। ভালোই হয়েছে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকা দুস্থ শিল্পীর তালিকায় আপনার নাম দেখতে হয়নি নিশাত আপা। আসলে বেঁচে থাকাটাই আকস্মিক। আপনাকে নিশ্চয়ই অনেক মিস করব। ভালো থাকবেন।’

নাট্য নির্মাতা আবু হায়াত মাহমুদ লেখেন, ‘ইশরাত নিশাত আপা আপনি সত্যিই থিয়েটারপ্রাণ একজন যোদ্ধা ছিলেন। আপনার স্পষ্টবাদিতা আর অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা, নাট্যকর্মীদের জন্য অনুকরণীয়। ভালো থাকবেন ওপারে।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই