বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

ফের জাঁতাকলে বিএনপি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার ০১:৪৭ পিএম

ফের জাঁতাকলে বিএনপি

ঢাকা : একযুগ ধরে নানা চাপে ছিল বিএনপি। লাখো মামলায় জর্জরিত অগণিত নেতাকর্মী আইনি লড়াই করে জামিনে মুক্ত হয়েছিলেন। বড় মাপের নেতাদের মধ্যে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া কারাবন্দি। তাকে মুক্ত করতে মেজাজটা ছিল আন্দোলনমুখী।

এরই মধ্যে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ও পদধারী নেতাদের গ্রেপ্তার এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সরকারের কিছু চুক্তিকে ইস্যু করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল দলটি। পুলিশি অনুমতির বাধা ভেঙে দলীয় সভা-সমাবেশও করেছে।

দলীয় নেতাদের মতে, সামনের দিনে সরকার পতনের মতো কর্মসূচির ছক কষতে শুরু করেছে দলটি। তাতে সায় মিলেছে সরকারবিরোধী মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর। কিন্তু কোমর সোজা করে দাঁড়ানোর আগেই আবারো জাঁতাকলে বিএনপি।

এখন সরকারকে ধাক্কা দেওয়ার বদলে উল্টো নিজেদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। জামিনবিহীন জুনিয়র-সিনিয়র ও শীর্ষনেতারা এখন নিরাপদ অবস্থানে চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ যাচ্ছেন আত্মগোপনেও। গ্রেপ্তার এড়িয়ে নেতাদের নিরাপদে থাকার নির্দেশনাও দল থেকে দেওয়া হয়েছে।   

আলাপকালে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, বুয়েটের ছাত্র হত্যাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী চলমান অস্থির অবস্থার মধ্যে দলীয় কর্মসূচি পালনকালে বেশকিছু নেতাকর্মীকে আটক করে বিএনপিতে গ্রেপ্তার আতঙ্ক তৈরি করা হয়।

এর মধ্যে বিএনপির সিনিয়র এক নেতা ও কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের কারণে এই আতঙ্ক আরো বেড়ে যায়। বিশেষ করে যেসব নেতা জামিনে নেই তারা এরই মধ্যে গা-ঢাকাও দিতে শুরু করেছেন।

গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে দেশে একরকম স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল না। এ সময় বিএনপির যেসব নেতার বিরুদ্ধে মামলা ছিল, তাদের বেশিরভাগই  জামিনে মুক্ত ছিলেন।

এদিকে ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি এবং বুয়েট ছাত্র হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহ ধরে দেশব্যাপী অস্থির অবস্থা চলছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে বিএনপিও কর্মসূচি পালন করেছে। গত শনিবার জনসমাবেশের কর্মসূচি থেকে দলের শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে বিএনপির কাছে তথ্য আছে।

আর রাতে বিমানবন্দর এলাকা থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ) প্রধান সমন্বয়কারী মেজর (অব.) ইসহাককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সমাবেশে ও বিমানবন্দরে গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আটক হওয়ার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত রোবারর আদালত মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে জামিন দিলেও নেতাদের অনেকেই গ্রেপ্তার আতঙ্কে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় গ্রেপ্তার এড়িয়ে নেতাদের নিরাপদে থাকারও নির্দেশনাও দল থেকে দেওয়া হয়েছে।

এ কারণে আন্দোলন সংগ্রাম সফলের দায়িত্বে সাধারণত যেসব নেতা থাকেন, তাদের অধিকাংশই গতকাল রাতে বাড়ি ফেরেননি। অনেক নেতা নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ রেখেছেন। যোগাযোগ হচ্ছে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা, সেসব মামলার অনেকগুলোর আসামি আবার অজ্ঞাত। এজন্য চাইলেই যে কাউকেই সেসব মামলায় গ্রেপ্তার করা যেতে পারে। এভাবে মামলার পর মামলা দিয়ে দলটিকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সরকার বিনা ভোটের হওয়ায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক আছে যে কোনো সময় পতন হতে পারে।

এজন্য বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি নেতাকর্মীদের কোমর সোজা করতে দেওয়ার মতো ঝুঁকি ক্ষমতাসীনরা নেবে না। তাই গ্রেপ্তারের পথ বেছে নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা।

বিএনপির এই নেতার মতে, সরকার তার নিজের অবস্থানকে ধরে রাখতে বিএনপির ওপর নতুন করে গ্রেপ্তারের খড়্গ চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নতুন করে আরো কিছু নেতাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। উদ্দেশ্য, বিএনপিকে সুসংগঠিত হতে না দেওয়া।

গত এপ্রিলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত এক দশকে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় লাখখানেক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসবের আসামি ২৫ লাখের মতো। বিএনপির বিরুদ্ধে যত মামলা করা হয়েছে তার মধ্যে পঁচিশ হাজারের মতো আছে ‘গায়েবি মামলা’।

সেসব মামলায় আসামির সংখ্যাও লাখ দশেকের মতো হবে। এজন্য দলটির অনেক নেতাকর্মীর এখন সময় কাটে আদালতে হাজিরা দিয়ে আর আগাম জামিন নেওয়া নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে।

দীর্ঘদিন বিরতির পরে আবারো গ্রেপ্তার শুরু হওয়ায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দেশে বাক স্বাধীনতা নেই, যে কারণেই হত্যা করা হয়েছে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে। এর প্রতিবাদে বিএনপি রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়েছে। তাতে ভীত হয়েই সরকার এখন দলের নেতাকর্মীদের আটক করছে। এমন করে সরকার পার পাবে না।

একই বিষয়ে স্বেচ্ছসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল বলেন, ভারতের সঙ্গে দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল ও আবরার হত্যার প্রতিবাদে সমাবেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বিএনপিসহ বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসত্য মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার এবং নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে দেশে এখন ভয়াবহ ত্রাসের রাজত্ব চলছে। আর এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কবজায় নিয়ে বিরোধী নেতাকর্মীদের ঘায়েল করার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে সরকার। বানোয়াট মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে বিএনপি নেতাকর্মীদের এখন দুঃসহ জীবন অতিবাহিত হচ্ছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই