বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

যান্ত্রিকীকরণ ও সমন্বিত ফসল উৎপাদন

বদলে যাবে কৃষি

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৪ জুন ২০১৯, সোমবার ০৩:৪০ পিএম

বদলে যাবে কৃষি

ঢাকা : মালিকানা অনুযায়ী খণ্ডিতভাবে নয়, সমন্বিতভাবে ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করতে চায় সরকার। কৃষিযন্ত্রের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এমন বিধান রেখে ‘জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা-২০১৯’ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রণীত খসড়াটি শিগগির মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র এমন খবর জানিয়েছে।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে নীতিমালায় বলা হয়, বাংলাদেশে খামারের গড় আয়তন ছোট এবং খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত। ফলে খণ্ডিত জমিতে চাষ, বপন, রোপণ, কর্তন ইত্যাদিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেশ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। এমনকি ছোট ও মাঝারি আকারের কৃষিযন্ত্রের পূর্ণ ক্ষমতার ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এতে বলা হয়, ভাড়া ব্যবস্থায় কৃষিযন্ত্র সেবার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে কৃষকদের সংগঠিত করে সমন্বিত ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা প্রণয়নে উৎসাহিত করা হবে। এক্ষেত্রে জমি ইজারা ও চুক্তিভিত্তিতে ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হবে।

বাংলাদেশ কৃষি যান্ত্রিকীকরণে চ্যালেঞ্জ হিসেবে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, কৃষিযন্ত্রের বিক্রয়োত্তর সেবার অপ্রতুলতা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ডের সীমাবদ্ধতা, স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনে আধুনিক মূলধনী যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাব, আমদানি করা ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রপাতির গুণগতমান ঘোষণা ও নির্ধারণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার উপযোগী গ্রামীণ অবকাঠামোর অভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরা হয় নীতিমালায়। এতে আরো বলা হয়, অঞ্চল ও ফসলভেদে আধুনিক ও লাগসই কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণাকে উৎসাহিত করা হবে। গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে।

নীতিমালায় বলা হয়, প্রতিকূল পরিস্থিতি (কাদামাটি, জলমগ্নতা ও ফসলের নুয়ে পড়া অবস্থা ইত্যাদি) অনুযায়ী উপযুক্ত যন্ত্র সহজলভ্য করতে উৎসাহ দেওয়া হবে।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সরকারি প্রণোদনা নীতি তুলে ধরে নীতিমালায় বলা হয়, বর্তমানে কৃষিযন্ত্র জনপ্রিয়করণ ও সম্প্রসারণে হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ হারে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ভর্তুকি) দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে শুধু কৃষক-পর্যায়ে পরিচিতি ও জনপ্রিয়করণে এ প্রণোদনা দেওয়া হবে। প্রণোদনা অবশ্যই মানসম্পন্ন বা প্রত্যয়নকৃত কৃষিযন্ত্রের ওপর প্রযোজ্য হবে। বছরে স্বল্প সময়কালে ব্যবহার্য অথচ অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হবে। বেসরকারি উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে যন্ত্রের চাহিদা ও সরবরাহ সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পরবর্তীকালে প্রণোদনার হার ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন করা হবে।

কৃষক ও যন্ত্রসেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তাদের কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে উৎসাহিত করতে প্রয়োজন মতো সরকারি বাণিজ্যিক, এনজিও ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে কৃষি ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। বছরের স্বল্প সময়ে ব্যবহার্য বপন, রোপণ, কর্তন, শুকানো, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ক কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে বিশেষায়িত দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আমদানি করা এবং স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত কৃষিযন্ত্র বিপণনে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা বজায় রাখা হবে। বর্তমানে কৃষিযন্ত্র আমদানিতে আরোপিত শুল্কহার ন্যূনতম রয়েছে। তবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের স্বার্থে পোর্ট অব এন্ট্রিতে আমদানি করা যন্ত্রের ওপর আবগারি, বিক্রয় এবং অন্যান্য শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে। দেশে উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে এমনসব যন্ত্রের যুক্তিসঙ্গত প্রতিরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া হবে।

এতে বলা হয়, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ ও বাস্তবায়নের জন্য কৃষক ও কৃষিযন্ত্রের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ, তথ্য ও সেবাপ্রদান নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সংস্থায় উপজেলা থেকে সব উচ্চতর স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকৌশল জ্ঞানসম্পন্ন আলাদা জনবল কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী শিল্পকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতির ওপর যুক্তিসঙ্গত হারে প্রণোদনামূলক আমদানি কর নির্ধারণ করা হবে। কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী ও সংযোজন শিল্পে ব্যবহূত যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক রেয়াতি সুবিধা অব্যাহত রাখা হবে। এ শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশের স্বার্থে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার ভিত্তিতে কর রেয়াত-সংশ্লিষ্ট তালিকার যন্ত্রাংশের সংখ্যা প্রয়োজনের নিরিখে সম্প্রসারণ করা হবে।

নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী শিল্পে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর বিধিবদ্ধ শুল্ক বিদ্যমান থাকায় কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ বিক্রয় ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ভ্যাট রেয়াতি সুবিধার বিষয় বিবেচনা করা হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রাংশের উৎপাদন খরচ ও কৃষক উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমদানিকৃত কৃষি যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক যৌক্তিক-পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে।

এতে আরো বলা হয়, দেশে কৃষি যন্ত্রপাতি সংযোজন শিল্পকে উৎসাহিত করা হবে। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে। সংযোজন শিল্পে দেশে উৎপাদিত যন্ত্রাংশের একটি অংশ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। উচ্চ মূল্যের নতুন কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির পাশাপাশি পুনঃসংযোজিত কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ থাকবে। কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী শিল্পাঞ্চলসমূহে ‘কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী জোন (এএমপিজেড)’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ শিল্পের উন্নয়নে বিশেষায়িত উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ‘উচ্চতর সেবাকেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করা হবে।

বিশেষ অঞ্চলভিত্তিক যান্ত্রিকীকরণের আওতায় হাওর অঞ্চল, উপকূলীয় ও চরাঞ্চল, পাহাড়ি ও বরেন্দ্র অঞ্চলে বিশেষ পদক্ষেপ নেবে সরকার।

পাশাপাশি গ্রামের শিক্ষিত যুবকদের যন্ত্রসেবা উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি এবং যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে যুব সম্প্রদায়ের অধিক অংশগ্রহণ নিশ্চিতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া কৃষি যন্ত্রপাতি পরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই নারীদের আরো উৎসাহিত করতে সরকার পদক্ষেপ নেবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে কৃষক, যন্ত্রসেবা প্রদানকারী ও স্থানীয় কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারক-পর্যায়ে মূলধনের অপ্রতুলতা রয়েছে। এজন্য কৃষিযন্ত্র তৈরিতে মূলধনী যন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে সরকারি বিশেষায়িত ঋণ স্কিমের আওতায় ন্যূনতম হারে ঋণ চালু করা হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কর্মকাণ্ড কৃষি খাতের মোট ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে নির্ধারণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

নীতিমালা অনুমোদন শেষে তা বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সমন্বয় ও মনিটরিং কাঠামো তৈরি এবং তা সুষ্ঠু বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালায় বলা হয়েছে।

সামগ্রিক বিষয়ে কৃষিবিদ এমদাদুল হক বলেন, ‘কৃষি যন্ত্রসামগ্রী নির্মাণ দেশের অর্থনীতি এবং কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই খাতটি এখনো ভারি শিল্প হিসেবে চিহ্নিত। কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক বা প্রস্তুত শিল্পকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

বিএইউ’র কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক মঞ্জুরুল আলম বলেন, গ্রামীণ শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এখন কৃষিকাজ করে। এ হার ২০৩০ সালে ২০ শতাংশে নামবে। ফলে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতেই হবে। তিনি বলেন, কৃষকের বয়স হয়েছে। তরুণরা কৃষিতে আগ্রহী নয়। ৫০০ টাকা মজুরি দিয়ে ৬০০ টাকা মণ দামের ধান চাষ সম্ভব নয়। ফলে যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া কৃষকের বিকল্প নেই। মঞ্জুরুল আলম বলেন, স্বাধীনতার পরে যন্ত্রের মাধ্যমে সেচের কারণে আবাদ বেড়েছে। বোরো মৌসুমে ধান চাষ করে দেশের মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশি চাল উৎপাদনও সম্ভব হয়েছে যান্ত্রিকীকরণের কারণে। আগামী দিনে দেশে হারভেস্টর, ট্রান্সপ্ল্যান্টারের মতো কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইংয়ের যুগ্মপ্রধান রেজাউল করিম বলেন, জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০১৯-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে নীতিমালাটি পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশোধিত খসড়া নীতিমালাটি প্রণীত হয়েছে। খসড়া নীতিমালাটির ওপর সবার মতামত আহ্বান করা হচ্ছে। এরপর সকল পক্ষের মতামত ও পরামর্শ অনুসারে এটি চূড়ান্ত করা হবে।

কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছি। কৃষিকে কীভাবে যান্ত্রিকীকরণ করা হবে, কোন ধরনের মেশিনারি অ্যাডাপ্ট করা হবে, মেশিনারির মূল্য কী হওয়া উচিত- এসব বিষয়ই নীতিমালায় থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘ভিন্ন ভিন্নভাবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ হচ্ছে। আমরা মনে করছি, এটি একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনা দরকার। এজন্য নীতিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ কৃষি সচিব আরও বলেন, ‘কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা প্রণয়নে আমরা শেষ পর্যায়ে আছি। শিগগির অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা বৈঠকে পাঠানো হবে।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই