বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

বন্যার পানি এখনো বিপদসীমার ওপরে

বন্যায় এখন পর্যন্ত ২৫ জনের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৮ জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার ০৩:৫০ পিএম

বন্যায় এখন পর্যন্ত ২৫ জনের মৃত্যু

ঢাকা : বন্যায় যমুনা-ব্রহ্মপুত্রসহ বেশ কিছু নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে বন্যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে এ পর্যন্ত ২৫ জন মারা গেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

বুধবার (১৭ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আখতার এসব তথ্য জানান।

কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, গত ১০-১৬ জুলাই পর্যন্ত সাত দিনে ২৫ জন মারা গিয়েছে। এর মধ্যে পানিতে ডুবে ১৮ জন, সাপের কামড়ে দুজন এবং বজ্রাঘাতে ৫ জন মারা গেছেন।

এর মধ্যে রয়েছে নেত্রকোনায় সাত জন, জামালপুরে চারজন, লালমনিরহাটে তিনজন, কুড়িগ্রামে তিনজন, নীলফামারীতে দুইজন, গাইবান্ধায় দুজন সুনামগঞ্জে দুজন, চট্টগ্রামে একজন এবং কক্সবাজারে একজন।

সূত্রটি আরো জানায়, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৮০ জন, সাপের কামড় খেয়ে ১১ জন, বজ্রপাতে পাঁচজন, পানিতে ডুবে আহত ১৮ জন, চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে ২৮৫ জন, চোখের প্রদাহে ৯৫ জন এবং অন্যান্য কারণে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৭৭ জন।

ডা. আয়েশা আখতার জানান, বন্যাকবলিত ২০টি জেলার মোট ১৭৪টি উপজেলায় এক হাজার ৩১৬টি আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য মেডিকেল টিমের এক হাজার ৯৫৮ জন সদস্য কাজ করছেন।

জামালপুর ও ইসলামপুর প্রতিনিধি জানান, গত ১০০ বছরের রেকর্ড ভেঙে এবারের জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যমুনার পানি ১৯৮৮ সালে ১২২ সেমি. ও ২০১৭ সালে ১৩৪ সেমি. বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। গতকাল বুধবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগের সব রেকর্ডের চেয়ে এ বছর বন্যার পানি ৩১ সেমি. বেশি বলে জানিয়েছেন জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নব কুমার চৌধুরী এবং পানিমাপক গেজ পাঠক আব্দুল মান্নান।

প্রতিদিনই হু-হু করে বাড়ছে পানি। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে বানভাসির সংখ্যা। বন্যার প্রবল পানির তোড়ে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, গৃহপালিত পশুপাখিসহ সহায় সম্পদ। সেই সঙ্গে ভেসে গেছে ধান চালসহ খাদ্যসামগ্রী। অনেকেই বসতভিটার মায়া ছাড়তে না পেরে ঘরের ভেতর মাঁচা করে এবং টিনের চালে আশ্রয় নিয়েছে।

খাদ্য, চিকিৎসা ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে পানিবন্দি মানুষেরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। ত্রাণ পেতে এবং পানিবন্দিত্ব থেকে উদ্ধারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে দুর্গত এলাকায় আটকে পড়া মানুষরা। অনেকেই নৌকা ও ভেলায় পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটছে একটুখানি আশ্রয়ের খোঁজে। অপেক্ষাকৃত উঁচুস্থান ও সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনায় আশ্রয় নিলেও সেখানেও পানি ঢুকে পড়ায় নতুন করে আশ্রয়ের সন্ধানে দিগ্বিদিক হন্যে হয়ে ছুটছে বানভাসি মানুষরা।

জেলার ৭ উপজেলার ৬৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫২টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার ৬ উপজেলায় ৩ লাখ মানুষ। ত্রাণসংকট পুরো বন্যাকবলিত এলাকাজুড়ে। ত্রাণের জন্য হাহাকার চলছে বানভাসিদের মধ্যে।

দুর্গত এলাকায় বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য বলেই অভিযোগ করেছেন ইসলামপুরের চিনাডুলি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম। আটকেপড়া বানভাসিদের দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার আশ্বাস দেন জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবির। তিনি বলেন, প্রতিদিনই ত্রাণের বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে এবং অব্যাহত থাকবে।

ইসলামপুর স্টেশন মাস্টার মো. মিজানুর রহমান জানান, দেওয়ানগঞ্জ-মেলান্দহ দুরমুঠ রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত রেললাইনে বিভিন্ন স্থানে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কারণে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ সব ট্রেন যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। তবে বর্তমানে ঢাকা-জামালপুর পর্যন্ত ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বগুড়ার সারিয়াকান্দির কাছে যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ২৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির প্রবল চাপে বাঁধের ৮-৯টি স্থানে পানি চুয়াচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলছেন, এখন পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাঁধের পানি চুয়ানো বন্ধ করা হয়েছে।

যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ১০২টি গ্রামের ৮২ হাজার ৩৮০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন উঁচুস্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যায় তিনটি উপজেলায় ৭৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পানি উঠেছে। তিনটি উপজেলায় পাট, আউশ ধান, সবজি, মরিচ, বীজতলা, আখসহ ৮ হাজার ৯৭৮ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদের পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় গাইবান্ধায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। শহরসংলগ্ন খোলাহাটী ইউনিয়নের গোদারহাট এলাকায় সোনাইল বাঁধের প্রায় ৩০০ ফুট এলাকা ধসে যাওয়ায় শহরে পানি ঢুকেছে।

জেলা প্রশাসক ও জজের বাসভবন, পিকে বিশ্বাস রোড, স্বাধীনতা প্রাঙ্গণ, সান্তার পট্টি রোড, টেনিস কমপ্লেক্স, ডেভিড কোম্পানিপাড়া, ভিএইড রোড, মুন্সিপাড়া, ব্রিজ রোড কালীবাড়িপাড়া, কুটিপাড়া, পূর্বপাড়া, সবুজপাড়া, পুরাতন বাজার, বানিয়ারজান, পুলিশ লাইনস, নশরৎপুর, বোয়ালীসহ আশপাশের এলাকায় প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ত্রিমোহিনী স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় রেললাইনের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রংপুরের সঙ্গে ঢাকাগামী রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে সাঘাটা উপজেলায় যমুনা নদীর পানির তোড়ে ভরতখালীর ২নং ক্রস বাঁধটি ধসে গিয়ে অনেক এলাকায় পানি উঠেছে।

এদিকে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবারের বন্যায় সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়নের ২৩০টি গ্রামের ৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৯ হাজার ২৩০টি। বন্যাকবলিত মানুষের আশ্রয়ের জন্য ১১৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এতে আশ্রয় নিয়েছে ৪২ হাজার ১০২ জন।

লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের আওতাধীন গাইবান্ধার বাদিয়াখালী থেকে ত্রিমোহনী পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার রেললাইনে বন্যার পানি ওঠায় এ বিভাগের লালমনিরহাট-বগুড়া-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়েছে ৫টি ট্রেন। চরম ভোগান্তিতে পড়েছে ওই রুটের কয়েক হাজার যাত্রী। রেলওয়ে লালমনিরহাট বিভাগীয় ম্যানেজার মুহাম্মদ শফিকুর রহমান জানান, পার্বতীপুর হয়ে ঢাকা যাচ্ছে লালমনিরহাট-ঢাকা রুটের আন্তঃনগর ট্রেন।

স্টেশনে আটকে থাকা যাত্রীরা আরো চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। তারা ট্রেনেই বসে প্রহর গুনছে; কখন রেললাইন থেকে বন্যার পানি নেমে যাবে! কখন ট্রেন চলবে!

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে গোয়ালন্দ উপজেলার নদী-তীরবর্তী বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। গতকাল বুধবার বন্যা মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জরুরি সভায় এ তথ্য জানানো হয়।

সভায় বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সচিবরা জানান, উজানচর, দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম ও ছোটভাকলা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue