বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

বলয় ভাঙছে যুবলীগ

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০১৯, বৃহস্পতিবার ০৪:১৫ পিএম

বলয় ভাঙছে যুবলীগ

ঢাকা : আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এখন আলোচনার অন্যতম বিষয় হচ্ছে মূল দলের পাশাপাশি সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর আসন্ন সম্মেলনকে ঘিরে।

একদিকে চলমান শুদ্ধি অভিযানের মধ্য দিয়ে বিতর্কিত ও অভিযুক্ত নেতাকর্মীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সংগঠন থেকেও বহিষ্কার হচ্ছেন, অন্যদিকে আগামী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মূল দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে নতুন মুখও আসছে।

অনিয়ম ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সবচেয়ে বেশি ঝড়-ঝাপ্টা যাচ্ছে দলের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের ওপর দিয়ে। সংগঠনটির বিদ্যমান বলয় ভাঙছে।

ক্যাসিনো বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগই অন্য সংগঠনের তুলনায় এখনো পর্যন্ত বেশি আলোচিত ও সমালোচিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই যুবলীগের আগামী সম্মেলন ও নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সরকারি দলের অন্য সহযোগী সংগঠনগুলোর তুলনায় বেশি আলোচনা হচ্ছে।

যুবলীগের সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন দলের যে কোনো সহযোগী সংগঠনের চেয়ে যুবলীগের নেতাকর্মীই এখনো পর্যন্ত অভিযানে বেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন বেশি। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বেশ কয়েক নেতা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনেও আছেন।

নানা অপকর্মে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ যেভাবে আলোচনায় আসে, তাতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী বিস্মিত হন। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নামে এত এত অভিযোগ উঠেছে যে, পুরো সংগঠনই দূষিত হয়ে গেছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। এ কারণে গোটা যুবলীগকেই ঢেলে সাজাতে চান আওয়ামী লীগ সভাপতি  ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারা আসছেন যুবলীগের নেতৃত্বে, আলোচনা এখন সেদিকেই।

শুদ্ধি অভিযানের মতো বড় ধাক্কার পর কেমন হবে যুবলীগের কমিটি, এমন প্রশ্ন নেতাকর্মীদের। এরই মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সংগঠনের শীর্ষ পদের প্রত্যাশীরা। যদিও তাদের অনেকেই প্রকাশ্যে নিজ নিজ প্রার্থিতার বিষয়ে এখনই  ঘোষণা দিচ্ছেন না।

ক্যাসিনো, মাদক ও টেন্ডারের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় কারো কারো নাম আসায় অনেকটা চুপচাপই রয়েছেন তারা। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকেই রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ও ধানমন্ডির কার্যালয়ে নিয়মিত যাওয়া-আসা করছেন। যোগাযোগ বাড়িয়েছেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এবারের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যুবলীগের দীর্ঘদিনের বলয় ভাঙতে চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সরাসরি যুবলীগের অভিভাবক হিসেবে সংগঠনটির দেখভাল করতেন। কিন্তু তার হাতে যুবলীগের এমন পরিণতির পর এবার প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন নিজেই যুবলীগের কমিটির বিষয়টি দেখবেন।

ইতোমধ্যে যুবলীগের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের শীর্ষ নেতা নির্বাচনের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন তিনি। সংগঠনটিকে অনুপ্রবেশমুক্ত নেতৃত্ব তৈরিতে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব।

সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ও সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি করছেন যারা, তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গ্রেপ্তারের পাশাপাশি দল এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থেকে বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে দুভাবে অভিযান চলতে থাকবে।
এর মধ্য দিয়ে বিতর্কিত, চাঁদাবাজ, অভিযুক্ত ও নানাভাবে অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীদের সরিয়ে দিয়ে সংগঠনকে ‘বিতর্কমুক্ত’ করা যাবে বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন দল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গড়া ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া এ দলের নেতৃত্বের সরকার আগামী ২০২০ সালে তার জন্মশতবর্ষ ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবে।

এর আগেই দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যেই আওয়ামী লীগ সভাপতির কঠোর নির্দেশে দলের ভ্রাতৃপ্রতিম, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে ‘শুদ্ধ অভিযান’ চলছে।

সূত্রমতে, এবারের সম্মেলনে চেয়ারম্যান পদে আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য শেখ মারুফ, যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণির ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজম ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শহীদ সেরনিয়াবাত।

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যুবলীগের বর্তমান কমিটির দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুব্রত পাল ও মহিউদ্দীন আহমেদ মহির নামও আলোচনায় রয়েছে। সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্যে বাহাদুর বেপারী ও ইসহাক আলী খান পান্নার নামও আলোচনায় শোনা যাচ্ছে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা।

সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে ছাড়াই কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুবলীগ। এমনকি নতুন কমিটিতেও আর ঠাঁই পাচ্ছেন না বর্তমান চেয়ারম্যান ওমর ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ। অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িতদের দলের কোনো পর্যায়েই রাখা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন সংগঠনটির সাবেক  চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির নানক।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত যাদের কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত ও বদনামের মুখোমুখি হয়েছে, তাদের বিবেচনায় রাখার সুযোগ নেই। যুবলীগকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এবারের কমিটি করা হবে। নতুন যারা আসবেন, তাদের অনেক দায়িত্ব থাকবে। ইতোমধ্যে যারা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন, তাদেরকে বিদায় করা হবে।

চলমান শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেই ঘোষণা করা হয় আওয়ামী লীগের চারটি সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের তারিখ। এ অনুযায়ী আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৩ নভেম্বর। সংগঠনের সার্বিক পরিস্থিতি ও সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস সামনে রেখে চেয়ারম্যান ওমর ফারুককে ছাড়াই গত ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়েছে যুবলীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের বৈঠক।

২৩ নভেম্বর বেলা ১১টায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

অন্যান্য সময় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার সম্মেলন শেষে কেন্দ্রের সম্মেলন হতো; কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমান পরিস্থিতিতে মহানগর শাখার সম্মেলন অনুষ্ঠানের পক্ষে নয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। ২০১২ সালের ১৪ জুলাই সবশেষ সম্মেলন হয় যুবলীগের।

তথ্যমতে, আওয়ামী লীগের সভাপতি দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেন গত ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত দলের যৌথ সভায়। এর এক সপ্তাহ পর দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভায় তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন।

সমালোচনা করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের দুই নেতার। এরপর গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আওয়ামী লীগের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়।

সোনালীনিউজ/এমটিআই