বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬

বস্তিতে আগুন, নাশকতা না দুর্ঘটনা!

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২০, শুক্রবার ০৫:৫১ পিএম

বস্তিতে আগুন, নাশকতা না দুর্ঘটনা!

ঢাকা : রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আগুনে পুড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের আশ্রয়স্থল বস্তিঘর। এসব আগুনের ঘটনাকে নাশকতা মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তারা বলছেন, আধিপত্য বিস্তার ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলদারিত্বের কারণেই একের পর এক বস্তিতে আগুন লাগানো হচ্ছে। আগুনে পুড়ে গত কয়েক বছরে পুড়েছে অনেকের ঘর, নিভেছে অনেক জীবনপ্রদীপ। মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়েছে নিমতলী থেকে চুড়িহাট্টা।

বস্তিতে নিয়মিত বিরতিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলা হয় না। হতাহত হলেই কেবল মামলা হয়, তা-ও অপমৃত্যুর। এরও আবার তদন্ত হয় না। এখন পর্যন্ত যত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তাতে হয়েছে দফায় দফায় তদন্ত কমিটি, ভারী হয়েছে সুপারিশের তালিকা। তবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগের অভাবে থেকেছে কাগজপত্রের গণ্ডিতেই। গত পাঁচ বছরে দেশের বস্তিগুলোয় ১ হাজার ২০০টির বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও একটিরও অভিযোগপত্র দাখিল করেনি পুলিশ। স্বাভাবিকভাবেই এসব অগ্নিকাণ্ডে কাউকে দায়ীও করা যায়নি।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বোচ্চ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে রাজধানী ঢাকায়। এ ছাড়া সারা দেশে ১০ বছরে ছোটবড় ১৬ হাজার অগ্নিদুর্ঘটনায় মারা যান ১ হাজার ৫৯০ জন। এতে চার হাজার কোটি টাকার ওপর ক্ষয়ক্ষতি হয়। শুধু গত বছরে রাজধানীসহ সারা দেশে অন্তত ৩২টি বস্তিতে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব আগুনে শিশু-নারীসহ মারা গেছেন অন্তত ২০ জন। চলতি বছরের গত দুই মাসে মিরপুরের রূপনগর বস্তিসহ অন্তত ৬টি বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবারই ঘরবাড়ি ও মালামাল পুড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

বারবার আগুন লাগার নেপথ্যে বস্তিবাসী নাশকতা, দখলবাজি, উচ্ছেদের কৌশলকে দায়ী করলেও সরকারি মহল কিংবা ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কখনো আলোর মুখ দেখেনি। সাময়িক খাওয়া-থাকার বন্দোবস্ত করা হলেও স্থায়ী পুনর্বাসন করা হয়নি তাদের। বস্তিতে বারবার আগুন লাগার নেপথ্যের কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করে সচেতন মহল।

এসব ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে না পারার কারণ হিসেবে নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলছে পুলিশ। তাদের মতে, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ যেসব ক্লু পায়, বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায় না। এ ছাড়া বস্তিগুলোয় সিসি ক্যামেরাও থাকে না, যা থেকে অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, আগুন লাগানোর পর অপরাধের সব আলামতই নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আগুনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো তদন্তেও কিছুটা সময় লেগে যায়। তা ছাড়া বস্তিতে কোনো সিসি ক্যামেরাও থাকে না, যাতে ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়।

বস্তিতে কেন বারবার আগুন লাগে, জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রি. জে (অব.) আবু নাঈম মো. শফিউল্লাহ বলেন, নানা কারণেই বস্তিতে আগুন লাগে। এর আগে তদন্তে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ও গ্যাসের পাইপের লিক থেকে আগুনের কারণ উঠে এসেছে। তবে দুই পক্ষের শত্রুতা ও দখল-পুনর্দখলের বিষয়টিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তদন্ত কমিটিতে ১৭ দফা সুপারিশ করা হলো। এরপর চুড়িহাট্টার ঘটনায় ৩১ দফা সুপারিশ করা হলো। এফ আর টাওয়ারের পরপরই দেখলাম সিটি করপোরেশনের অনেক মুভমেন্ট হলো। আইনের অভাব নেই, কিন্তু আইনের ব্যবহার নাই।’

অন্যদিকে এসব বস্তিতে আগুন যে লাগানো হয়, এমন ধারণাও অমূলক নয়। আগুন লাগার পেছনে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো মহলের প্রভাব থাকতে পারে। এ প্রসঙ্গে একাধিক বামপন্থী নেতা মনে করেন, দুর্ঘটনাজনিত কারণে বস্তিতে বারবার আগুন লাগে না। বরং বস্তিতে আগুন লাগানো হতে পারে। বস্তি উচ্ছেদ করে সেখানকার জমিতে অন্য কিছুর পরিকল্পনা করা হতে পারে। সব আগুনেই কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল, প্রশাসন ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল জড়িত থাকতে পারে।

এদিকে গত বুধবার রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়েছে শত শত ঘর। কিন্তু বস্তির পাশেই যখন গৃহায়ণ ও গণপূর্তের ফ্ল্যাট প্রকল্পের নির্ধারিত স্থানের সাইনবোর্ড, তখন বিষয়টি কি শুধুই দুর্ঘটনা? এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারেননি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম।

অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়েছে শত শত ঘরে বসবাস করা মানুষের স্বপ্ন। সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে স্বল্প আয়ের হাজার হাজার মানুষ রাত যাপন করছে। ভুক্তভোগীরা বলেন, ‘জীবনটা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছি। জিনিসপত্র কিছুই নিয়ে বের হতে পারি নাই।’ এমন কথা প্রায় সব পরিবারের মানুষের। তাদের এই আকুল আবেদন কার কাছে পৌঁছাবে, জানেন না তারা।

এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে বস্তিতে আগুন লাগানো হয়েছে। বস্তিতে বারবার আগুনের পেছনে প্রভাবশালীদের হাত রয়েছে বলেও জানান তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে মিরপুরে একাধিক বস্তিতে বেশ কয়েক বার অগকািণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর রূপনগরের চলন্তিকা বস্তিতে আগুন লাগার পর জানা যায়, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই দীর্ঘদিন ধরে বস্তিটি নিয়ন্ত্রণ করছিল একটি প্রভাবশালী চক্র। তাদের প্রভাবের কারণে বস্তিতে অবৈধভাবে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেওয়া হয়।

অপর একটি সূত্রের দাবি, ২০১৯ সালের ৩ মার্চ উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যেই কারওয়ান বাজার রেললাইন বস্তিতে আগুন লাগে। অন্যান্য রহস্যজনক ওই আগুনে সব হারিয়ে তিন শতাধিক ঘরের বাসিন্দাদের জায়গা হয় খোলা আকাশের নিচে।

আগুনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সখ্য যেন বনানীর কড়াইল বস্তির। গত ১০ বছরে বস্তিটি পুড়েছে ১৭ বার। গত তিন বছরে ৬ বার পুড়ে আগুনে। এর মধ্যে এক বছরেই পুড়ে তিনবার। এসব আগুন স্বাভাবিক কারণে লেগেছে, এমনটা মানতে নারাজ বস্তিবাসীরা। তাদের অভিযোগ, এসব আগুন নাশকতার অংশ। কড়াইল বস্তিতে ৩০ বছর ধরে বসবাস করছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, ‘একটা বস্তিতে এক বছরে যখন তিনবার আগুন লাগে, তখন আপনাকে বুঝতে হবে এটা স্বাভাবিক কোনো আগুন নয়।’

বুধবার সকালে মিরপুরের রূপনগরের ঝিলপাড় বস্তিতে লাগা ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় হাজারো ঘরবাড়ি। অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব হওয়া আম্বিয়া নামের এক নারী কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তিনি জানালেন, ‘চোখের সামনে আগুনে ঘর পুড়ল, কিছুই করতে পারলাম না। পুড়ে সব ছাই হয়ে গেছে।’ পুড়ে যাওয়া ঘরের টিন উল্টে-পাল্টে মালামাল খুঁজছিলেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে এই অসহায় নারী বলেন, ‘বারবার বস্তিতে আগুন লাগার পেছনে অবশ্যই কেউ জড়িত থাকতে পারে। আমাদের সরিয়ে দিতে এমন আগুন লাগানো হতে পারে।’ আম্বিয়া বেগমের মতো ক্ষতিগ্রস্ত আরো অনেক বস্তিবাসীর একই ধরনের অভিযোগ।

বিদ্যুতের লাইন নিয়ে কুর্মিটোলা ক্যাম্প (বিহারি বস্তি) ও রাজু বস্তির মধ্যে বিতণ্ডা হতো প্রায়ই। এর মধ্যেই ২০১৪ সালে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। আগুনে পুড়ে প্রাণ হারায় ক্যাম্পের ১০ জন। ওই ঘটনায় মামলা হলে গত ছয় বছরেও অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) কালশীতে কথা হয় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজনের সঙ্গে। জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মাদ আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঘটনার ছয় বছরেও বিচার পেলাম না। আগুন কারা লাগাল তা-ও জানতে পারলাম না।’

রাজধানীর গুলশান ও বনানী এলাকার সীমারেখায় অবস্থান কড়াইল বস্তির। ওই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রায় নিয়মিত। সর্বশেষ গত বছরের ১৬ মার্চ গভীর রাতে বস্তিটিতে আগুন লাগে। কেরোসিনের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হলেও এর পেছনে কারা তা জানা যায়নি। একইভাবে অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে বস্তিটিতে সংঘটিত আগের অগ্নিকাণ্ডগুলোর মূল হোতারাও।

গত বছরের ১২ মার্চ রাজধানীর মিরপুরে ইলিয়াস মোল্লাহ্ বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় চার হাজারের বেশি ঘর। বস্তির উত্তর অংশে আগুনের সূত্রপাত হলেও দ্রুত তা দক্ষিণ অংশে ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত লোকজন প্রাণ নিয়ে বেরোতে পারলেও ভস্মীভূত হয়েছে তাদের সর্বস্ব। এর পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বস্তির বিভিন্ন দুর্যোগ নিয়ে কাজ করে কোয়ালিশন ফর দি আরবান পুওর (সিইউপি) নামের একটি বেসরকারি সংস্থা। এর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রেবেকা সুন্নত বলেন, ‘আগুনের খবর পেয়ে আমরাও ঘটনাস্থলে যাই। কিন্তু আগুনের ধরন দেখে মনে হয়নি, এটি নিছক দুর্ঘটনা। এ আগুনের পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। এর একটি হলো বস্তির জমি ফাঁকা করে তা পুনর্দখল।’

ফায়ার সার্ভিসের দাবি, প্রাথমিকভাবে অবৈধ সংযোগে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, বস্তিবাসীরা যেভাবে টাকা দিচ্ছেন বিভিন্ন ঘরের জন্য, তাদের জন্য যদি বড় অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করা যায়, সেখানে তারা যদি কিস্তি করে টাকা দেন তাহলে তারা লাভবান হবেন, স্থায়ী সমাধান হবে।

আগুনের কারণ জানতে তদন্ত কমিটি : রাজধানীর রূপনগরের বারেকের বস্তিতে লাগা ভয়াবহ আগুনের কারণ অনুসন্ধানে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর। ফায়ার সার্ভিসের ডেপুটি ডিরেক্টর (অ্যাম্বুলেন্স) নূর হাসানকে প্রধান করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক নইমুল হাসান, মিরপুর অঞ্চলের উপসহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন, মিরপুর ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আনোয়ার হোসেন এবং ইন্সপেক্টর গোলাম মোস্তফা।

তদন্ত কমিটির প্রধান নূর হাসান বলেন, ‘আমরা এখনো কাজ শুরু করতে পারিনি। ইনভেনটরি চলছে। আগামী রোববারের মধ্যে তদন্তের কাজ শুরু করতে পারব।’

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই বস্তিতে আগুন লাগে। এতে বস্তির ১০ হাজার ঘরের অধিকাংশই পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট পৌনে তিন ঘণ্টার চেষ্টায় দুপুর ১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue