মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

শেখ হাসিনার বিচক্ষণতা

বাংলাদেশমুখী দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, বুধবার ০১:৪৫ পিএম

বাংলাদেশমুখী দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি

ঢাকা : আবারো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শেখ হাসিনা। এ নিয়ে মোট চারবার রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন তিনি। তার এই অর্জন ইতোমধ্যে ঠাঁই পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল তথা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে। শেখ হাসিনা নিজে যেমন এশিয়ার পরাশক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছেন তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতি হচ্ছে বাংলাদেশমুখী।

মঙ্গলবার (৮ জানুয়ারি) জাপানভিত্তিক রাজনৈতিক অর্থনীতির সাময়িকী নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ ও ভারতভিত্তিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত দুজন বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কলামে দেওয়া হয়েছে এমন ইঙ্গিত। নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ সাময়ীকিতে জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের (জেএসআইএ) অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর গ্লোবাল গভর্নেন্স অ্যান্ড পলিসির (সিজিজিপি) নির্বাহী পরিচালক শ্রীরাম চাউলিয়ার ‘ভিক্টরি স্ট্রেন্থস হাসিনা’স ফরেইন পিলিসি হ্যান্ড’ শীর্ষক মন্তব্য প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে।

তাতে বলা হয়েছে, চীন ও ভারত একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ উভয়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ফলে বাংলাদেশ নিয়ে দিল্লি ও বেইজিংয়ের আগ্রহও বেড়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের নিরঙ্কুশ বিজয় হাসিনার বিদেশনীতির হাতকে আরো শক্তিশালী করেছে। কার্যত তিনি এখন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কূটনীতিতে চালকের আসনে রয়েছেন। মতামত প্রতিবেদনটির উপশিরোনামে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার এই জয় নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো পরিচালনায় তার অবস্থান আরো দৃঢ় করেছে।

এদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে ‘রাজা মণ্ডলা : দ্য সেন্টার মুভস ইস্ট’ শীর্ষক মতামত প্রতিবেদনে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়া স্টাডিজের পরিচালক চিলামকুরি রাজা মোহন আশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ অচিরেই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হবে। আর বাংলাদেশের এই উত্থান সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াই উপকৃত হবে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিদেশবিষয়ক এই উপদেষ্টা সম্পাদক মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রের নেতারা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় না থাকতে পারার কারণে এই অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন না। কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতির পুনর্গঠনের জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সেটিও করার সময় পান না। তবে শেখ হাসিনার সেখানে বিরাট ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তিনি টানা দশ বছর ধরে নিজের দেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিণত করতে পেরেছেন। নিজ দেশের অর্থনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পেরেছেন তিনি। তিনি প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, ক্ষমতায় ধারাবাহিকতা থাকলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব।

নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ এর প্রতিবেদনে শ্রীরাম চাউলিয়া লিখেছেন, চীন এমন একটি শক্তি যাকে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশের পক্ষেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। একে ভারত ভালোভাবে নিলো কি না, তা বড় কথা নয়। এ অবস্থায় ভারতকে সদামিত্র মেনে নেওয়া নেতৃত্ব শেখ হাসিনা যখন তার দরজা চীনের জন্য খুলে দেন, তখন বোঝা যায় শেখ হাসিনা বেইজিং এর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ভারতের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে যতটা যত্নশীলতা শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন, তাতে এটা নিশ্চিত সুসম্পর্কে বেইজিং এখনো নয়াদিল্লিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। সুতরাং ভারতের জন্য শেখ হাসিনার মতো নেতৃত্বই প্রয়োজন যিনি সীমান্তে ইসলামপন্থীদের চাপে রাখবেন, আবার চীনকেও বেঁধে রাখবেন নিয়ন্ত্রিত সম্পর্কে। এ অবস্থায় শেখ হাসিনা পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথই প্রমাণ করে যে, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কূটনীতিতে তিনিই এখন চালকের আসনে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের ক্ষেত্রে চীন ও ভারত রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে। সেখানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ এমন এক মধ্যমপন্থা নিয়ে এগুচ্ছে, যা ইন্দো-চীন ঠান্ডাযুদ্ধে স্থিরতা এনে দিতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ আরও অনিশ্চয়তার মুখ দেখলেও শেখ হাসিনার বিজয় নয়াদিল্লি ও বেইজিংকে হ্যান্ডল করার সক্ষমতা আরো বাড়িয়ে দেবে।

বাংলাদেশকে বর্তমানে ৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত। তার প্রায় চারগুণ বেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসছে চীন। আর বিআরআই বাস্তবায়নে চীনেরও এখন বাংলাদেশে প্রবেশাধিকার প্রয়োজন। ভারত সাগরে পৌঁছাতে বঙ্গোপসাগরের মধ্যাঞ্চলের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেই ব্যবহার করতে হবে তাদের।

শেখ হাসিনাও এখন জানেন, তাকে গুরুত্ব না দিয়ে কোনো উপায় নেই চীনের। ফলে অন্য যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে চীনের সঙ্গে এখন তার সম্পর্কটিই সবচেয়ে ভালো। সে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে অপেক্ষকৃত কম সুদে চীনা ঋণ যেমন পেয়েছেন, তেমনি বিআরআই প্রকল্পে চীনা নয় বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করবে সেটাও নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে ভারত যেন নাখোশ না হয়, সে বিষয়টি মাথায় রেখে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনে চীনা প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। বরং অনতিদূরে মাতারবাড়ী বন্দর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কাজ তুলে দিয়েছেন জাপানের হাতে। নির্মাণ শেষ হলে এই মাতারবাড়ী পোর্ট হয়ে উঠবে জাপান-ভারত এশিয়া আফ্রিকা গ্রোথ করিডোর (এএজিসি) এর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন এর মতে, বাংলাদেশের চীনের সাথে সম্পর্কের মূল বিষয়ট মূলত অর্থনৈতিক। এ জায়গাটাকে দিল্লি উদ্বেগের সঙ্গে দেখলেও শেষ পর্যন্ত কূটনীতিক আলাপ-আলোচনায় প্রিভেইল করাটা খুব ডিফিকাল্ট দিল্লির জন্য। উভয় দেশের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের চেয়ারম্যান মুন্সি ফয়েজ আহমদ বলেন, চীন যদিও আমাদের ব্যবসায়িক সবচেয়ে বড় অংশীদার, কিন্তু ভারতের সঙ্গেও আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কম নয়। তবে চীনের সঙ্গে ব্যবসার টোটাল সাইজটা ১৪-১৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা চীনের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ।

তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের কথা উঠলেই নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের যদি বৈরিতা থাকে তাহলে আমরা কোনোভাবেই এগুতে পারব না।

ঠিক এ কারণেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাতে এতটুকু বিলম্ব করেননি।

সোনালীনিউজ/এমটিআই