রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

বাংলাদেশে ব্লু-ইকোনমি ও সমুদ্রসীমায় চীন-ভারতের প্রভাব

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ জুন ২০১৯, বুধবার ০২:১৬ পিএম

বাংলাদেশে ব্লু-ইকোনমি ও সমুদ্রসীমায় চীন-ভারতের প্রভাব

ঢাকা : নীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমিতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন সম্ভাবনা দেখছে। ব্লু-ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্র সম্পদ নির্ভর অর্থনীতি। সাগরের জলরাশি ও এর তলদেশের বিশাল সম্পদকে কাজে লাগানোর অর্থনীতি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে তাকিয়ে আছে সমুদ্রবক্ষে সঞ্চিত সম্পদের দিকে।  

তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই সম্ভাবনার দুয়ারে নজর আছে বিশ্বের প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশগুলোরও। এর মধ্যে আঞ্চলিক চীন-ভারতের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। আঞ্চলিক এই দুই রাষ্ট্রের পাশাপাশি নজর আছে যুক্তরাষ্ট্রেরও। তবে ভারত ও চীনের কাছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমা এবং এর রাজনৈতিক ও অর্থনীতিতে ভারত-চীনের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবটাই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া চীন-ভারত দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বাঁধলে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা হতে পারে তাদের অন্যতম যুদ্ধপথ। ফলে বাংলাদেশ দুই রাষ্ট্রের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।              

২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে প্রায় ৯০০ কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দিতে বাধ্য হয়েই তখন সমুদ্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে সবাইকে। বিশ্ব অর্থনীতিতে সমুদ্র নানাভাবেই অবদান রেখে চলেছে।

বিভিন্ন তথ্যমতে, বিশ্বের ৪৩০ কোটিরও বেশি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তু। পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে।

সমগ্র বিশ্বে ক্রমেই ব্লু-ইকোনমি জনপ্রিয় হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ সমুদনির্ভর। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যে, তা পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করা গেলে সমুদ্র থেকে আহরিত সম্পদের মূল্যমান জাতীয় বাজেটের দশগুণ হবে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া সমুদ্রসম্পদ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে থাকে। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যাবে ব্লু-ইকোনমির বদৌলতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে শুধু মাছই রয়েছে প্রায় ৫০০ প্রজাতির। এছাড়াও শামুক, ঝিনুক, শ্যালফিস, কাঁকড়া, অক্টোপাস, হাঙ্গরসহ রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী, যেগুলো বিভিন্ন দেশে অর্থকরী প্রাণী হিসেবে বিবেচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাণিসম্পদ ছাড়াও ১৩টি জায়গায় আছে মূল্যবান বালু, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম। এগুলোতে মিশে আছে ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমেনাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইট। এসব সম্পদ অতি মূল্যবান। তা ছাড়া সিমেন্ট বানানোর উপযোগী প্রচুর ক্লে রয়েছে সমুদ্র তলদেশে।

ক্রমাগত সম্পদ আহরণের ফলে বিশ্বে স্থলভাগের সম্পদের পরিমাণ কমে গেছে। তাই নতুন সম্পদের খোঁজে রয়েছে সারা বিশ্ব। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেভ আওয়ার সি’ এর তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্র থেকে মাছ ধরে শুধু রফতানি করেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব।

গভীর সমুদ্র থেকে আহরিত টুনা মাছ সারা বিশ্বে খুবই জনপ্রিয়। সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এই মাছটি দেশের আন্তর্জাতিক মানের হোটেলগুলোতে আমদানি করা হয়ে থাকে। এই মাছ সঠিকভাবে আহরণ করতে পারলে নিজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন দেশে রফতানি করাও সম্ভব।

এ ছাড়া সামুদ্রিক মাছ থেকে খাবার, মাছের তেল দিয়ে বিভিন্ন প্রকার ওষুধ, সস, চিটোসান ইত্যাদি তৈরি করা সম্ভব, যার ফলে নতুন ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি তা বিদেশে রফতানি করেও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেতে পারে।

এসডিজি এর ১৪ নম্বর ধারায় টেকসই উন্নয়নের জন্য সামুদ্রিক সম্পদের অনুসন্ধান ও সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। আর তাই ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি পূরণের জন্য সামুদ্রিক সম্পদ আহরণে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। সমুদ্র অর্থনীতি বিষয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও হয়েছে। সমঝোতা চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। আগ্রহ রয়েছে জাপানেরও।

এছাড়া হাতে নেয়া হয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ। এর বাইরে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে আশা করা যাচ্ছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে ব্লু ওশান ইকোনমি বা নীল সমুদ্র অর্থনীতি।

মাছ রপ্তানিতে তৃতীয় বাংলাদেশ : আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাছ রপ্তানিতে চীন ও ভারতের পরেই এখন বাংলাদেশের অবস্থান। ২০১৮ সালে অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই অবস্থান ছিল পঞ্চম। জাতিসংঘের সংস্থা এফএও-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন এ তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউয়ের তথ্য মতে, বাংলাদেশের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান এখন ৩.৫৭ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান ২৫.৩০ শতাংশ। আর দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশের অধিক লোক মৎস্য আহরণে জড়িত। ২০১৭-১৮ সালে দেশ প্রায় ৬৯ হাজার মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি করে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করেছে।

২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম হচ্ছে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। নতুন জলসীমার অধিকার পাওয়ায় ব্লু ইকোনমি প্রসারে বাংলাদেশের জন্য এই বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সমুদ্রে মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ২৫তম। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের সম্ভাবনাকে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। ফলে গভীর সমুদ্র এলাকায় বিশাল অংশ বাংলাদেশের জলসীমায় অন্তর্ভুক্ত হয় এবং নতুন এ জলসীমার পরিমাণ বাংলাদেশের মোট স্থল অঞ্চলের প্রায় ৮১ শতাংশ। সমুদ্রসীমা জয়ের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু বিশাল এ এলাকার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।

সমুদ্র থেকে মৎস্যসম্পদ আহরণের লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছে অনেক দিন ধরে অর্থসহায়তা চেয়ে আসছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে এ বিষয়ে প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পে ২০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে বিশ্বব্যাংক। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষের দিকে এ প্রকল্পের সহায়তা প্রস্তাব সংস্থার বোর্ডসভায় উঠবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সমুদ্রে মাছ আহরণ বাড়বে। ফলে শক্তিশালী হবে ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন একটি-দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে সামুদ্রিক সম্পদের বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না। এজন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ ও বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদনের ২০ শতাংশ জোগান আসে সমুদ্র থেকে। বিশ্বের মোট মৎস্য উৎপাদনের ১৬ শতাংশ অবদান খোদ বঙ্গোপসাগরের। সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এ উৎপাদন আরো বহুগুণে বৃদ্ধি করা সম্ভব। কেবল সমুদ্র অর্থনীতির সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেই যথেষ্ট আর্থসামাজিক উন্নয়ন সাধন করা যেতে পারে। পরিবেশদূষণ রোধের বিষয়কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে ব্লু ইকোনমি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অনবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার হ্রাস ও জাতীয় আয় বৃদ্ধিকে গুরুত্বারোপ করে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৫৪ লাখ লোক সরাসরি এ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, যাদের বার্ষিক আয় প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ইউরো। সামুদ্রিক সম্পদ কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের বিনিয়োগ ব্যুরো ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করে। সেখানে এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশের অনুসৃত কৌশল ও বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এখন বাংলাদেশ সরকারকেই তার ভূকৌশলগত সুবিধার ভিত্তিতে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

বঙ্গোপসাগরে রয়েছে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ। প্রতি বছর সেখান থেকে ৬৬ লাখ টন মৎস্য আহরণ করা যেতে পারে; কিন্তু বাস্তবে আমরা সেখান থেকে খুব কমই আহরণ করছি। আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনে মৎস্য খাতের অবদান সাড়ে চার ভাগেরও কম। অথচ সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা তা অনেকাংশে বাড়িয়ে ফেলতে পারি। এজন্য আমাদের আধুনিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মাছ ধরার কৌশলেও পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে।

মৎস্যসম্পদ ছাড়াও সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে বহু খনিজ সম্পদ। খনিজ সম্পদগুলোর মধ্যে লবণের কথা বললে আমাদের উপকূলে রয়েছে ৩০০ লবণ শোধনাগার, যেগুলো সাত বছর ধরে বছরে ৩ দশমিক ৫ লাখ টন করে লবণ উৎপাদন করছে, যা বাজারের চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। লবণ শিল্পের দিকে একটু মনোযোগ দিলেই একে একটি রফতানিমুখী লাভজনক শিল্পে পরিণত করা সম্ভব।

এছাড়া বাংলাদেশ সমুদ্র থেকে যেসব সম্পদ পেতে পারে তা হলো— বিভিন্ন খনিজ পদার্থ যেমন— গ্যাস, তেল, কপার, ম্যাগনেশিয়াম, নিকেলসহ আরো অনেক মূল্যবান ধাতু যেমন— কোবাল্ট ইত্যাদি। তাছাড়া আমরা সামুদ্রিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা এবং ওষুধ শিল্পেও আরো উপকৃত হতে পারি। ব্লু ইকোনমির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয় চালু এবং সেখানে পর্যাপ্ত আসন সংখ্যার ব্যবস্থা করতে হবে। সামুদ্রিক সম্পদ সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক বিকাশ সাধনের জন্য আমাদের আগে সুনির্দিষ্ট খাতগুলো যেমন— অ্যাকুয়াকালচার, পর্যটন, মেরিন বায়োটেকনোলজি, শক্তি (তেল-গ্যাস), সমুদ্রতলে খনি খনন ইত্যাদি চিহ্নিত করতে হবে।

সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধের অবসানের পর আমরা বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ৮০ শতাংশের মতো বিশাল সমুদ্র এলাকা লাভ করি, যা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য খুবই গৌরবের ও আনন্দের; কিন্তু এ সুবিশাল সম্পদ যদি আমরা সঠিকভাবে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে না পারি তাহলে আমাদের এ অর্জনের কোনো মূল্য থাকবে না।

প্লাস্টিক বর্জ্য

সমুদ্র দূষণ করছে ‘প্লাস্টিক বর্জ্য’ : দেশে বিপুল পরিমাণে প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেন ও নদনদীতে জমে সমুদ্র দূষণ করছে। সমুদ্রের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যে প্রভাব ফেলছে। এটিকে প্লাস্টিক সন্ত্রাস আখ্যায়িত করে বক্তারা তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, আমাদের সমুদ্র সীমানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বঙ্গোপসাগরে নতুন একটি সম্পদ-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ সৃষ্টির সম্ভাবনা জেগে উঠেছে। সেটির সুফল পেতে হলে প্লাস্টিক সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে। এ খাতে বাড়াতে হবে গবেষণা। গড়ে তুলতে হবে দক্ষ জনবল।

বাংলাদেশে ব্লু-ইকোনমি ও সমুদ্রসীমায় চীন-ভারতের প্রভাব : জাতীয় প্রেস ক্লাবে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিমরাড) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। এতে জানানো হয়, ভারতের ন্যাশনাল মেরিটাইম ফাউন্ডেশনের (এনএমএফ) আমন্ত্রণে সমুদ্র অর্থনীতি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দিচ্ছে বিমরাডের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল। আগামী ২০ ও ২১ জুন দিল্লিতে বিমরাড ও এনএমএফ-এর মধ্যে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিতব্য এ সেমিনারের বিষয় ‘বঙ্গোপসাগরে আঞ্চলিক সুনীল অর্থনীতির রূপান্তর’।

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রতিনিয়ত রাস্তাঘাটে ও যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এসব প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেন, নদনদী হয়ে সমুদ্রে পড়ছে। প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ এতই বেড়েছে যে তা প্লাস্টিক সন্ত্রাসে রূপ নিয়েছে। ব্লু ইকোনমির সুফল পেতে হলে এসব বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের সমুদ্র সীমানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বঙ্গোপসাগরে নতুন একটি সম্পদ-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ সৃষ্টির সম্ভাবনা জেগে উঠেছে। সমুদ্র-সম্পদ আহরণ এবং সেটিকে কাজে লাগানোর জন্য যে মেধা ও গবেষণা প্রয়োজন, সেখানে আমাদের দুর্বলতা রয়েছে। বিমরাড এই দিকটিতে অবদান রাখার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশে চীন-ভারতের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব : বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিশ্বের দরবারে যেমন নতুন স্থান দিয়েছে তেমনই রাজনৈতিক প্রভাব ও বেড়েছে। এশিয়ার সবচেয়ে বড় দুই শক্তি চীন এবং ভারত সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে, বাংলাদেশের গত ৪৭ বছরের ইতিহাসে তার নজির সম্ভবত নেই।

শুধুমাত্র বঙ্গপোসাগরকে ঘিরেই ভারত-চীন উভয় দেশেরই রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। কেননা ভবিষ্যতে যদি কোনো কারণে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হয় তবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা হবে তাদের যুদ্ধাঞ্চলের অন্যতম পথ।

এছাড়া বঙ্গপোসগারে ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকায় বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ আগ্রহ রয়েছে চীন ও ভারত দুই দেশেরই। ফলে ব্লু ইকোনমিতে বাংলাদেশের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে ভারত-চীনের রাজনৈতিক প্রভাব।

ভূ-রাজনৈতিক এই দ্বন্দ্ব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত তীব্র রূপ নিয়েছে যে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, এ বিষয়ে তাদের মধ্যেও ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক দুটি প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে দুটি লেখা প্রকাশ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইস্ট এশিয়া ফোরামে'র প্রকাশিত নিবন্ধটির শিরোনাম, "চায়না এন্ড ইন্ডিয়া'স জিওপলিটিক্যাল টাগ অব ওয়ার ফর বাংলাদেশ"। অর্থাৎ বাংলাদেশ নিয়ে চীন এবং ভারতের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যুদ্ধ।"

আর নিউইয়র্ক ভিত্তিক 'ওয়ার্ল্ড পলিসি রিভিউ' ঠিক এ বিষয়েই 'উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারসের' একজন গবেষকের অভিমত ছেপেছে। তাদের লেখাটির শিরোনাম, হোয়াই ইন্ডিয়া এন্ড চায়না আর কম্পিটিং ফর বেটার টাইস উইথ বাংলাদেশ।" অর্থাৎ বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়তে কেন ভারত আর চীনের মধ্যে এত প্রতিদ্বন্দ্বিতা?

দুটি লেখাতেই বাংলাদেশের সঙ্গে চীন এবং ভারতের সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাংলাদেশর রাজনীতি ও নির্বাচন এবং দেশটির ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য এই দুই বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বের বিষয়ে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ রয়েছে।

ভারত এবং চীন, দুটি দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের রয়েছে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক এবং সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক। তবে এর মধ্যে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণে ভারতের সঙ্গেই বাংলাদেশের সম্পর্কটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

ইস্ট এশিয়া ফোরামে প্রকাশিত লেখায় ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় দুটি দেশই মূলত বাণিজ্যকেই ব্যবহার করতে চাইছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুটি দেশই সুবিধেজনক অবস্থানে আছে। দুটি দেশেরই বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে বাংলাদেশের সঙ্গে। দুই দেশের বাণিজ্যের একটি তুলনামূলক চিত্র তারা তুলে ধরেছেন তাদের লেখায়।

চীন বাংলাদেশে রফতানি করে প্রায় ১৬ হতে ১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, অথচ বাংলাদেশে থেকে আমদানি করে মাত্র ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। বাংলাদেশকে তারা বছরে একশো কোটি ডলারের সাহায্য দেয়। তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২৪ বিলিয়ন বা দুই হাজার চারশো কোটি ডলারের সাহায্য দেয়ার কথা ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশে রফতানি করে বছরে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু আমদানি করে মাত্র ২৬ কোটি ডলারের। কিন্তু দু’দেশের মধ্যে অনেক 'ইনফরমাল ট্রেড' বা অবৈধ বাণিজ্য হয়, যা মূলত ভারতের অনুকুলে। এর পরিমাণ কমপক্ষে দুই হতে তিন বিলিয়ন ডলারের সমান হবে বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশে যে ভারতীয়রা কাজ করেন তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণও হবে দুই হতে চার বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশকে ভারত যে বৈদেশিক সহায়তা দেয় বছরে তার পরিমাণ পনের কোটি ডলারের মতো।   

গভীর সমূদ্র বন্দর স্থাপনে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে উভয় দেশের। কিন্তু এসব প্রকল্প খুব বেশি আগাচ্ছে না। ভারত বাংলাদেশের সুন্দরবনের কাছে যে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ পেয়েছে সেটি বেশ কিছু বাস্তব এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, অবকাঠামো খাতে চীন-ভারতের এই প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ খুব একটা লাভবান হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশের ম্যানুফাকচারিং এবং জ্বালানি খাতে চীন বা ভারত, কেউই বড় কোন বিনিয়োগে যায়নি। যদিও তারা এধরণের বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।

চীন বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের সামরিক খাতে বড় সরবরাহকারী। ভারত এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল, এখন তারা দ্রুত চীনকে ধরতে চাইছে। কিন্তু ভারতের সামরিক সরঞ্জামের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে বাংলাদেশের। চীনের তুলনায় ভারত যেদিকে এগিয়ে আছে, তা হলো বাংলাদেশের ওপর তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাব। ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, এই প্রভাব খুবই ব্যাপক। দু্ই দেশের রয়েছে অভিন্ন ভাষা (বাংলা) এবং সংস্কৃতি, এবং এর একটি বড় কেন্দ্র এখনো কলকাতা। বাংলাদেশের অন্তত এক লাখ ছাত্র-ছাত্রী ভারতের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। এর বিপরীতে চীনের সাংস্কৃতিক প্রভাব নগণ্য। ঢাকায় চীন একটি কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। সেখানে চীনা ভাষা শেখানো হয়।

ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপিকে বর্ণনা করছেন একটি 'ইসলামপন্থী এবং পাকিস্তানপন্থী' দল হিসেবে। তাদের মতে, ২০০১ সাল হতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দলটি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন যা ঘটেছিল, সেটা ভারতের মনে আছে এবং তাদের বাংলাদেশ বিষয়ক নীতি এবং ভাবনার গঠন সেটার ভিত্তিতেই। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউ বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসলে সেটা ভারতকে বিচলিত করবে।

তারা আরও বলছেন, এ বিষয়ে দিল্লির কৌশল একেবারেই স্বলমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা তাড়িত। তাদের কৌশলটা হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখা, সেই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব ঠেকিয়ে দেয়া। অন্যদিকে বাংলাদেশে চীন খেলছে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য সামনে রেখে। তারা এক দিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে। অন্যদিকে এই দুজনের ভাষায়, 'ভারত বিরোধী এবং সেনাপন্থী' বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে তারা একটা ভারসাম্য রাখছে।

দুই বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বের মাঝখানে পড়ে বাংলাদেশ কিভাবে তার সুবিধা নিচ্ছে?

ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এই ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ কোন নিস্ক্রিয় 'ভিক্টিম' নয়, বরং নিজের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এটি আরও উস্কে দিচ্ছে। তারা বলছেন, বাংলাদেশে এ নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে যে দুটি দেশই আসলে বাংলাদেশকে যা দেয়, তার উল্টো অনেক বেশি নিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের অবকাঠামো এবং ম্যানুফ্যাকচারিং প্রকল্পগুলি খুব নিম্নমানের (জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায়)।

রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দিয়েছে চীন এবং ভারত আসলে কেবল 'সুদিনের বন্ধু। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে যে কোন পদক্ষেপ চীন আটকে দিচ্ছে। এটাকে বাংলাদেশ বন্ধুত্বসুলভ কোন কাজ বলে মনে করে না। অন্যদিকে ভারতের অবস্থাও ভালো নয়। তারাও এই ইস্যুতে মিয়ানমারকে মদত দিয়ে যাচ্ছে।

ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক তাদের উপসংহারে বলছেন, চীন আর ভারত সর্বোতভাবে চেষ্টা করবে বাংলাদেশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় কে কার আগে থাকতে পারে। কিন্তু তাদের উভয়েই ব্যর্থ হবে, কারণ বাংলাদেশও এখন এ নিয়ে এক দেশকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে খেলানোর মাধ্যমে এখান থেকে তাদের প্রাপ্য আদায়ের চেষ্টা করবে।

তবে তারা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে দুই দেশের বাণিজ্য নীতি। দুটি দেশের কোনটিই বাংলাদেশকে রফতানির ক্ষেত্রে কোন ছাড় এখনো পর্যন্ত দিচ্ছে না। দুটি দেশই বাংলাদেশে রফতানির ক্ষেত্রে ব্যাপক 'আন্ডার ইনভয়েসিং' এর সুযোগ দিচ্ছে, যেটি কীনা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম-নীতির লঙ্ঘন। যত অর্থ তারা বাংলাদেশকে ঋণ দেয়, তার চেয়ে আরও অনেক বেশি অর্থ তারা নিয়ে নেয় এভাবে।

কিন্তু এক্ষেত্রে চীন আছে সুবিধেজনক অবস্থানে। তাদের অর্থনীতি ভারতের তুলনায় অনেক বড়। বাণিজ্যেও তারা এগিয়ে। কাজেই বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের জন্য চীন যদি কোনদিন তাদের বাজার খুলে দেয়, এই চীন-ভারত দ্বন্দ্বে সুস্পষ্টভাবেই চীন জয়ী হবে, বাংলাদেশ ঝুঁকে পড়বে তাদের দিকেই।

সোনালীনিউজ/এমটিআই