বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬

বাংলাদেশ মোদীর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

সোনালীনিউজ ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৯, সোমবার ১২:০১ পিএম

বাংলাদেশ মোদীর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

ঢাকা : ২০২১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রগঠনের ৫০ বছর পূর্তি হবে। স্বাধীনতার অর্ধ-শতবর্ষ উদযাপনের উৎসবে যোগ দিতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই উৎসব উপলক্ষে হাজির হবে পৃথিবীর নানা দেশ। আর এই উৎসব হবে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রস্তুতি হলো এক মস্ত বড় প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা। অনেকেই জানেন না, ঢাকা সরকার এখন থেকেই এই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। আবার তার আগে আগামী বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ পালনের উৎসবেও মোদী হাজির হতে ইচ্ছুক। সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দিল্লি এসে মোদীর সঙ্গে দেখা করে এ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানালে মোদী সঙ্গে সঙ্গে এই ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।

বিগত ৩৫ বছরের সাংবাদিক জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সফল কূটনীতিক হতে গেলে সবসময় খুব বেশি হইচই করে সফল হওয়া যায় না। দিল্লিতে বর্তমান ঢাকার হাই কমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি সাংঘাতিক সক্রিয়, কিন্তু তাঁকে দেখলে সেটা টের পাবেন না। সৈয়দ মুজতবা আলীর এই ভাইপোকে বাঙালিরা, তা কলকাতারই হোক বা রাজধানীর, আপনজন বলেই মনে করেন। আবার দিল্লিতে খোদ বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক। জয়শঙ্কর যখন বিদেশ সচিব ছিলেন তখন থেকেই এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

এবার আসাদুজ্জামান খানের দিল্লি আসার কয়েকদিন আগে গেছিলাম হাইকমিশনে। বাংলাদেশের মিনিস্টার প্রেস ফরিদ হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে টের পেলাম, এই সফরকে কেন্দ্র করে বেশ তৎপরতা চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকার রেলমন্ত্রীও এসেছিলেন। সামগ্রিকভাবে এই সফর ইতিবাচক। এবার এ মাসেই বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর যাচ্ছেন ঢাকা। তারপর অক্টোবর মাসের ৩/৪ তারিখ নাগাদ ভারতের দুর্গাপূজা এবং দীপাবলি উৎসবের আগেই শেখ হাসিনার দিল্লি আসার কথা। জয়শঙ্কর এবার ঢাকা গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করে এই দিনক্ষণ চূড়ান্ত করবেন। আবার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এখানে সম্প্রতি জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করে শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে আলাপ আলোচনা করেছেন।

এক কথায়, শেখ হাসিনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত রসায়ন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ নেই। অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর ঢাকার মনে যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল। প্রথমত অমিত শাহ নিজে একজন কট্টরবাদী নেতা বলে পরিচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশের বিষয়টি তিনি উত্থাপন করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন। অমিত শাহ বিজেপি সভাপতি ছিলেন এতদিন। এখন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি এই বিজেপির পছন্দের অনুপ্রবেশের বিষয়টি উত্থাপন করবেন এ তো স্বাভাবিক।

মনে করুন, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদীও কলকাতায় বলেছিলেন, ক্ষমতায় এসে অনুপ্রবেশ বন্ধ করা হবে। সত্যি কথা বলতে, এটা হলো বিজেপির মতাদর্শগত অবস্থান। দেবগৌড়া যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত। সেদিন রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়েছিলাম শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে। শপথ গ্রহণের পর তিনি বলেছিলেন, অনুপ্রবেশ নামক বিষয়টি যেভাবে দেখা হয় তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। এটা মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নতি হলেই এই সমস্যার সমাধান হবে। গলাধাক্কা দিয়ে বিদায় করলেও এ সমস্যার সমাধান হবে না।

বস্তুত, বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এই কমিউনিস্ট নেতার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। লালকৃষ্ণ আডবানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পরও কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। রাজনাথ সিংহর সময়েও হয়েছে। তাই এটা বিজেপির মতাদর্শগত বিষয়। যেমন ট্রাম্প বেআইনি নাগরিকদের আমেরিকা ছাড়ার হুংকার দিচ্ছেন। অভিবাসন গোটা পৃথিবীতেই রক্ষণশীল রাজনীতিবিদদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। খোদ বাংলাদেশও তো মায়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিব্রত।

এর ওপর আছে নাগরিকত্ব বিল। শুধু আসামে এটি বাস্তবায়িত করতে গিয়ে এবং বেআইনি নাগরিকদের নামের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেও প্রবল বিতর্কের মুখে পড়েছে মোদী সরকার। সরকার প্রথমে বলেছিল শুধু আসামে, এখন বলা হয়েছে এটি গোটা দেশেই বাস্তবায়িত হবে। সরকারের যুক্তি হলো, কোনও দেশে কি অন্য কোনও দেশের মানুষ ভিসা ছাড়া আসতে পারেন? থাকতে পারেন অনির্দিষ্টকালের জন্য? এহেন পরিস্থিতিতে বিজেপির এই বক্তব্য ভোট প্রচারেও তাদের বড় একটা ইস্যু। কিন্তু রাজনীতিতে অ্যাপিয়ারেন্স এবং রিয়েলিটির মধ্যে সব সময় থাকে অনেকটা ফারাক। বিদেশনীতিতে দুটি শব্দ খুব ব্যবহার হয়, একটি হলো desire, অন্যটি হলো effective desire; একটা হয় আদর্শ ইচ্ছা, সেটা নিঃশর্ত প্রত্যাশা। কিন্তু বিদেশনীতি শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নিরিখে নির্ধারিত হয় না। দেখতে হয় দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করা কতখানি প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, পৃথিবীতে আজ কোন দেশই বিচ্ছিন্ন নয়। প্রতিটি দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের উপর নিরন্তর প্রভাব বিস্তার করে। উদাহরণ দিয়ে বলি, ইসরাইল ঘোরতর ইরান বিরোধী। দিল্লিতে  ইসরাইল দূতাবাসের কূটনীতিকদের উপর ইরানি জঙ্গিরা আক্রমণ হেনেছিল। আজও এই ব্যাপারে ভারত কোনও কড়া ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ  ইসরাইল সরকারের অন্দরমহলে। ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন মনমোহন সিং ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এ ঘটনার তদন্ত হওয়ার আগেই ন্যামের বৈঠকে যোগ দিতে মনমোহন ইরান চলে যান।

আমি নিজে মনমোহনের সঙ্গে সেবার ইরান গেছিলাম। মনমোহনকে ইরান প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, পাকিস্তানের এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে ভারতের পাশে রাখা প্রয়োজন। কারণ ইরান হলো প্রতিবেশীর প্রতিবেশী। তাছাড়া আছে তেলের ইস্যু। ইসরাইলের ভালো না লাগলেও ইরানের ব্যাপারে ভারতের দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে তারা নাক গলায়নি। তার বদলে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহ অন্য সব বিষয়ে তাদের সম্পর্ক বিস্তারে সক্রিয় হয়।  ইসরাইলের উপর ভারতের কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বদলে আজ সুষ্ঠু সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে অনুপ্রবেশের বিষয়ে সংঘাতে যাওয়া আজ ভারতের অগ্রাধিকার হতে পারে না। আজ ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুযুধান সম্পর্ক। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের perspective-টাই বদলে দিতে চাইছে। এই যে বারবার বন্ধুত্ব গড়ার চেষ্টা, আবার তারপর যুদ্ধ। এই দোদুল্যমানতা থেকে ভারত বেরিয়ে আসতে চায়। বিশেষত ৩৭০ ধারার ভিত্তিতে কাশ্মীরকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের বিষয়গুলি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় এবার পাকিস্তান আরও মরিয়া।

বেশ ফ্যাসাদে পড়েছেন ইমরান খান। ‘ডন’ পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে তাঁর। বলা হয়েছে, আমেরিকায় গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করে কী হাসিল করলেন ইমরান? এদিকে পাকিস্তানের আর্থিক অবস্থা এখন এক গভীর সঙ্কটে। বরং বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের তুলনায় অর্থনৈতিক প্রশ্নে অনেক মজবুত। এ অবস্থায় পাকিস্তান চেষ্টা করবে ভারতে একটা কোনও সন্ত্রাস ঘটাতে। কাশ্মীর উপত্যকায় যদি সফল হয় পাকিস্তান কোনও নতুন সন্ত্রাসে, তাহলে ইমরানের সম্মান বাঁচে। কিন্তু তার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তবে সতর্ক ভারত। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল কাশ্মীর উপত্যকায় বসে আছেন। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জিওস্ট্রাটেজিক গুরুত্ব অপরিসীম।

আবার চীন-পাকিস্তান সাবেকি অক্ষ সুবিদিত। ভারত চীনের সঙ্গেও বিবাদে না গিয়ে বাণিজ্য নিয়ে আবার আলাপ আলোচনা শুরু করে দিয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে ডোকলাম কান্ড আপাতত ভুলে গেছে ভারত। দিল্লিতে কর্মরত পাকিস্তানের এক কূটনীতিক বলছিলেন, “আপনারা চীনের ভূমিকা আলোচনায় বসতে রাজি হয়ে গেলেন আর পাক প্রধানমন্ত্রী বারবার বলা সত্ত্বেও বলছেন সন্ত্রাস বন্ধ না হলে আলোচনা হবে না। চীন কি ভারত সম্পর্কে মনোভাব বদলেছে না ডোকলাম নিয়ে অবস্থানে কোনও বদল এনেছে? তাহলে চীন শক্তিশালী বলে এই আপোষ আর আমরা দুর্বল বলে হম্বিতম্বি!” এই বক্তব্যটা শুনে বুঝলাম, পাকিস্তান কতটা চাপের মধ্যে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমর্থন খুব জরুরি। বাংলাদেশের জন্য তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে মোদী মায়ানমার সরকারের সঙ্গে শুধু কথা বলেছেন তাই নয়, সে কথা ঢাকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েও দিয়েছেন। প্রথমে মোদী যখন মায়ানমার যান তখন অং সান সু-চি আর শেখ হাসিনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেন। যুক্তি ছিল, চীন মায়ানমারে অর্থ ও প্রভাব বাড়চ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে। হাসিনার দিল্লির দূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী ভারত সরকারকে এই অসন্তোষ জানান। ভারত জানে, চীন বাংলাদেশেও প্রভাব বাড়াতে চাইছে। শুধু পামাসেতুর প্রকল্পের জন্য অর্থ যোগান নয়, এবার চীন সফরে হাসিনাকে যতখানি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাও তাৎপর্যপূর্ণ। এ অবস্থায় বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ককে মজবুত রাখা ভারতের প্রধান অগ্রাধিকার। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। লেখা: জগন্নাথ ঘোষালের।

সোনালীনিউজ/এএস


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।