সোমবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬

বাংলা নববর্ষ

বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রতিষ্ঠার স্মারক

অনু ইসলাম | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০১৯, সোমবার ০৩:২৭ পিএম

বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রতিষ্ঠার স্মারক

ঢাকা : বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা অতি প্রাচীন ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। আমাদের কাছে আমাদের ঐতিহ্য অত্যন্ত গর্বের বস্তু। গর্ব এই জন্যে যে, আমাদের জাতিসত্তার শেকড় আমাদের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যে প্রোথিত। নিজেদের চেনা বা নিজেদের জানার জন্যে আমরা আমাদের শেকড়ের দিকেই তাকাই এবং অনুসন্ধানের আশ্রয় গ্রহণ করি, যা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের অংশ। উৎসব, মূলত উৎসব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ব্যাপার, তবে এর সঙ্গে ইতিহাস, উদ্ভব, রূপান্তর-প্রক্রিয়া ও বিকশিত রূপ খুঁজে বের করা খুবই কঠিন। তবু মানুষের আচার-আচরণ, ক্রিয়া, অর্থনৈতিক বিষয়, বিশ্বাস-সংস্কারসহ বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। সেই সঙ্গে আনন্দময়তা, ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সামাজিক সংযোগ ও সংহতির মহামিলন উৎসবের মৌল উপাদানের অন্তর্গত বা অংশ হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের উৎসব সম্পর্কে নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তেমন কোনো গভীর ও বিস্তৃত কাজ এখনো হয়ে ওঠেনি। তবে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গবেষণামূলক কাজ হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো কাজ হবে এমনটা আশা করা যায়। এখন আসা যেতে পারে ঐতিহ্যের পথ হেঁটে কীভাবে বাংলা নববর্ষ বা ১ বৈশাখ আমাদের বাঙালি ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলা নববর্ষ বা ১ বৈশাখ এখন বাঙালি প্রতিটি নাগরিকের কাছে একটি অসাম্প্রদায়িক উৎসবে পরিণত হয়েছে এ কথাটি বলার আর অপেক্ষা রাখে না।

বাংলা নববর্ষ এখন বাঙালির প্রাণের একটি অন্যতম উৎসব হিসেবে সারা বিশ্বেই আলোচিত। কথা হচ্ছে, এই বাংলা নববর্ষ বা ১ বৈশাখ কখন, কীভাবে বাঙালি জাতির জাতিসত্তার সঙ্গে একাগ্রতা প্রকাশ করল সেই দিকটি। বস্তুত প্রাচীনকালে ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে নববর্ষের উৎসব হতো। লৌকিক সমাজ আচারে শত্রু নিধনের অভিপ্রায়ে উৎসবের আয়োজন যেমন ছিল, তেমনি পর্যায়ক্রমিক সমাজ বিকাশের ধারায় যুগপৎ রিচ্যুয়াল মঙ্গলানুষ্ঠানের আয়োজনও ছিল বঙ্গদেশের অন্তর্গত বিভিন্ন জাতি ও উপজাতির নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের লোক সমাজের অনন্য দৃষ্টান্ত। একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, প্রচলিত চন্দ্র বছর ও সৌর বৎসরের সমন্বয়ে বাংলা সন চালুর প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। কথিত আছে, বাংলার স্বাধীন নৃপতি সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহের ৯০৩ হিজরি বা ১৪৫৮ খিস্টাব্দে বাংলা সনের প্রচলন শুরু হয়। অন্যদিকে সর্বভারতীয় সনসমূহের মধ্যে বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে মোগল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবরের নাম উচ্চারিত হয়। সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ বাংলা সন প্রচলন করলেও মোগল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর তা প্রতিষ্ঠা করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

মোগল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর ১৫৪২ থেকে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতবর্ষ রাজত্ব করেন। তখন তাঁর নির্দেশে ১৫৪৯ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ ৯৬৯ হিজরি সনে বাংলা নববর্ষ সন প্রবর্তিত হয়। মূলত কৃষক-প্রজাদের কাছ থেকে কর বা খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে নবরত্ন দরবারের পণ্ডিত ফতেহ উল্লাহ সিরাজি এবং অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী বৈরাম খানের সুপরামর্শে এই নতুন সনের উপস্থাপন করেন। ব্রিটিশপূর্ব মুসলিম আমলে এবং ব্রিটিশ শাসনকালেও দেশজ ঐতিহ্যধারায় বাংলা নববর্ষ বা ১ বৈশাখ পালন করা হতো। সময়ের দীর্ঘসূত্রতা শেষে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ আলাদা হয়। বাঙালিরা তখন পূর্ব বাংলা হিসেবে তাদের বাংলা ভাষা বা ঐতিহ্যকে রক্ষা করার প্রত্যয় নেয়। তখন থেকে পূর্ব বাংলায় ১৯৫০-এর দশকে জাতীয় আন্দোলনের সূচনায় পয়লা বৈশাখ উৎসব ভিন্ন তাৎপর্য ও নতুন একটা মাত্রায় অভিষিক্ত হয়ে ওঠে যা একটি রাজনৈতিক মাত্রিকতা অর্জন করে।

১৯৫২ সালের পালা বদলকারী ঘটনার পর থেকেই সংষ্কৃতি সম্পর্কে এই অঞ্চলের মানুষের চেতনা ও উপলব্ধি তীক্ষ্নতর, উজ্জ্বলতর ও গভীরতর হতে থাকে। ১৯৬৬ সালে রমনার বটমূলে প্রথম নববর্ষ বরণ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক সংগ্রামের যাত্রা শুরু হয়। এরপর নানান চড়াই-উতরাই শেষে ১৯৭২ সালের দিকে বাংলা নববর্ষ বা ১ বৈশাখ উদযাপন নতুন প্রাণাবেগ লাভ করে। ১৯৮৯ সালে প্রবর্তিত হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা যা দেশবাসীর কল্যাণ কামনায় এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এখনো চলছে আমাদের বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপন।

এ ছাড়া গ্রামীণ আবহে বা গ্রামীণ পরিবেশে বাঙালির যে বাংলা নববর্ষ তথা পয়লা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতা, সে দিকটি একটু আলোকপাত করা যেতে পারে। এ সময় গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়, বৈশাখে বৃষ্টির জন্যে খোলা মাঠে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। বদনা, পুতুল, ব্যাঙ, বিয়ের প্রচলন রয়েছে দেশজুড়ে। এ ছাড়া ভাঙাকুলা, কুনেব্যাঙ, ধান-দূর্বা ও শুকনো বরই গাছের ডাল নিয়ে বাড়ি বাড়ি খয়রাত তোলা হয়। নানান ধরনের খেলাধুলা, যাত্রাপালা, বৈশাখী মেলা এবং ব্যবসায়ীদের হালখাতার আনুষ্ঠানিকতা যা একটা সংস্কৃতির ঐতিহ্য। এসব কিছু আমাদের বাঙালি জাতির ধারাবাহিক ইতিহাস ধারণ করে আছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্যে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বৈশাখ বা নববর্ষ এসেছে বার বার। এখনো লেখা হচ্ছে বৈশাখ বা নববর্ষ নিয়ে প্রচুর

কিন্তু যে হিসেবে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ এসেছিল, তা আজকের বাংলাদেশের নববর্ষ পালনের ক্ষেত্রে কৃষকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা হারিয়ে ফেলেছে। নববর্ষের আয়োজনের বিন্দুবিসর্গ কৃষকদের জীবনাচরণে অনুপস্থিত। নগরকেন্দ্রিক নাগরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নববর্ষের আড়ম্বর আনুষ্ঠানিকতা। যা দুঃখজনক হলেও কিছুটা সত্য, এ সত্যের প্রভাবও লক্ষণীয় বাস্তবতার নিরিখে। তবু আশার প্রজ্বলন জ্বলে রয়েছে এখনো।

গত ১৪২১ বাংলা সনের একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আমাদের দেশে সর্বমোট ১০০৫টি মেলা হয় নববর্ষ উপলক্ষে যা অভাবনীয়। ১৪২৬ বাংলা এই সময়ে এসে মেলার এই সংখ্যা আরো ছাড়িয়ে গেছে বা যাচ্ছে, এ রূপটা প্রত্যাশা করা যায়। বিশ্বের অনেক দেশ আছে যাদের নিজস্ব কোনো ভাষা নেই, নিজস্ব কোনো নববর্ষ নেই। বিশ্বের হাতেগোনা যে কয়েকটি জাতির নিজস্ব ভাষা এবং নিজস্ব কোনো নববর্ষ এবং নিজস্ব পঞ্জিকা রয়েছে, তাদের মধ্যে বাঙালি জাতি অন্যতম। কাজেই বাংলা নববর্ষ বা ১ বৈশাখ আমাদের বাঙালি জাতির গর্ব, বাঙালি জাতির অহংকার, যা আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রতিষ্ঠার এক স্মারক।

সোনালীনিউজ/এমটিআই