শুক্রবার, ০২ অক্টোবর, ২০২০, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭

বার বার রোগবদল, নানা কৌশলে হাসপাতালে শামীম-সম্রাট

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২২ জুলাই ২০২০, বুধবার ০৬:৪৭ পিএম

বার বার রোগবদল, নানা কৌশলে হাসপাতালে শামীম-সম্রাট

ফাইল ছবি

ঢাকা : ক্যাসিনো-কাণ্ডে গ্রেপ্তার বিতর্কিত ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীম প্রায় চার মাস ধরে হাসপাতালে। অস্ত্র ও মাদক মামলার এই আসামিকে ‘ডান হাতের ক্ষতস্থান থেকে প্লেট সরানো’র জন্য কারাগার থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে দুই দিনের মধ্যে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর কথা। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ছয় দফা চিঠি দিলেও তাঁকে কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়নি।

হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন ‌‘বুকে ব্যথা’র ছুতোয় হাসপাতালের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে দিন যাপন করছেন শামীম। পরিচিতজনদের সঙ্গে তাঁর দেখাসাক্ষাৎ চলছে নিয়মিত। তাঁকে ফেরত চেয়ে সর্বশেষ ৯ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বিএসএমএমইউ) চিঠি পাঠায় কারা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কিছু বলেনি।

জি কে শামীম একা নন, কারা অধিদপ্তর বলছে, সারা বছরই শতাধিক আসামি বা সাজাপ্রাপ্ত বন্দী চিকিৎসার জন্য কারাগারের বাইরে হাসপাতালে থাকেন। এর মধ্যে কেউ কেউ মাসের পর মাস, বছরের পর বছর টানা হাসপাতালে থাকছেন। ক্যাসিনো-কাণ্ড আর শুদ্ধি অভিযানে আটক যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট তাঁদের অন্যতম। তিনি আট মাস ধরে হাসপাতালে।

নানা বাহানায় মাসের পর মাস আরও যাঁরা হাসপাতালে আয়েশি সময় কাটাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের মামলার আসামি ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন; মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক মহাপরিচালক ওহিদুল হক; স্কুলশিক্ষিকা ও স্থপতি জয়ন্তী রেজা হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আজম রেজা; স্ত্রী ছবি কুড়ি হত্যা মামলার আসামি গোপাল চন্দ্র কুড়ি; লিবিয়ায় নিহত ২৬ বাংলাদেশিকে সেখানে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত সোহাপ হোসেন ও এস এম উদ্দীন।

কারা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কাউকে কাউকে ফেরত চেয়ে ৩০ বারও চিঠি দেওয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের পরামর্শে বা প্রভাবশালীদের তদবিরে।

জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, ‘অসুস্থ হলে আমরা বন্দীদের হাসপাতালে পাঠাই। কিন্তু ছাড়পত্র দিয়ে ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। আমরা প্রতি ১৫ দিন পর আসামিদের ফেরত পাঠানোর তাগাদা দিয়ে চিঠি পাঠাই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেন ফেরত পাঠাচ্ছে না, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে।’

কারা কর্তৃপক্ষের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসএমএমইউর উপাচার্য কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘চিকিৎসা হয়ে গেলে কারাগারে ফেরত না পাঠানো অপরাধ। কিন্তু এঁরা কে কখন আসছে, কখন যাচ্ছে, তা আমার নলেজে নেই বা আমাকে জানানো হয়নি। আমি পরিচালককে বলব, চিকিৎসা ছাড়া বা অসুস্থ ছাড়া যদি কেউ থাকে, তাহলে তাঁদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে। তা ছাড়া একজন রোগী চিকিৎসার জন্য মাসের পর মাস হাসপাতালে থাকতে পারেন না, তাঁর যে ধরনের রোগই হোক।’

আট মাস হাসপাতালে সম্রাট: ‘বুকে ব্যথা’ নিয়ে ভর্তি হয়ে টানা প্রায় আট মাস বিএসএমএমইউতে আছেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট। এখানে ভর্তির পর ৯ জুলাই পর্যন্ত তাঁকে ফেরত পাঠাতে কারা কর্তৃপক্ষ ১১ দফা চিঠি দিয়েছে। সম্রাট গ্রেপ্তার হয়েছিলেন গত বছরের ৬ অক্টোবর খেলার ক্লাবে ক্যাসিনো পরিচালনার বিরুদ্ধে অভিযানের সময়। মাদক ও অস্ত্র আইনে এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গত ২৪ নভেম্বর তাঁকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ও সাধারণ সেবার মধ্যবর্তী ইউনিট এসডিইউতে আছেন তিনি।

সম্রাটের চিকিৎসক চৌধুরী মেসকাত আহম্মেদ বলেন, রোগীর যে সমস্যা, তাতে যেকোনো সময় সংকট হতে পারে। বিশেষ করে তাঁর হৃৎস্পন্দনের অনিয়মের কারণে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না।

জি কে শামীমের রোগবদল: গত ৪ এপ্রিল ঠিকাদার জি কে শামীমকে কারাগার থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল হাতের ক্ষতস্থানের প্লেট বদলাতে। তাঁকে হাসপাতালে পাঠাতে উচ্চপর্যায়ের তদবিরও ছিল। এখন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, শামীমের অস্ত্রোপচারের সব ব্যবস্থা করা হলেও তিনি প্লেট অপসারণ করতে রাজি হচ্ছেন না। কারা চিকিৎসক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমরা তাঁকে হাতের চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলাম। এখন শুনি বুকে ব্যথার চিকিৎসা হচ্ছে।’ গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় বহু টাকা, মাদক, অস্ত্র ও দেহরক্ষী নিয়ে শামীমকে গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশে আলোচনার জন্ম দেয়।

ফেরত চেয়ে ২৭ দফা চিঠি: কারা নথি অনুযায়ী ২০১২ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর রোগী হিসেবে বেশির ভাগ সময় রফিকুল আমীন বারডেম ও বিএসএমএমইউ হাসপাতালে থেকেছেন। প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে তিনিসহ ডেসটিনি গ্রুপের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলা বিচারাধীন। সর্বশেষ তিনি বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি হন গত বছরের ১১ মার্চ। প্রায় এক বছর চার মাস ধরে তিনি হাসপাতালের একটি কক্ষে আছেন। তাঁকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফেরত পাঠাতে এ পর্যন্ত ২৭ বার চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে তাঁর স্বজন ও কারাগারের চিকিৎসকদের দাবি, তিনি অসুস্থ।

আরও যাঁরা হাসপাতালে: স্কুলশিক্ষিকা ও স্থপতি জয়ন্তী রেজা হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আজম রেজা প্রায় পাঁচ মাস ধরে হাসপাতালে। তাঁকে ফেরত চেয়ে ছয় দফা চিঠি পাঠানো হয়েছে। জয়ন্তী রেজাকে হত্যার দায়ে নিম্ন আদালত স্বামী আজম রেজার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পরে উচ্চ আদালত তা কমিয়ে যাবজ্জীবন সাজার আদেশ দেন। ২০০৪ সালের ৯ জানুয়ারি আজম রেজার বনানীর বাড়িতে অস্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষিকা জয়ন্তী নিহত হন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি এনএসআইয়ের সাবেক ডিজি ওহিদুল হক ২০১৮ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তার হন। কারাগারে তিনি শ্রেণিপ্রাপ্ত হাজতি। গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে তিনি বিএসএমএমইউয়ে আছেন। কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফেরত চেয়ে ১০ বার চিঠি দিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক এ বিষয়ে বলেন, এটা স্পষ্ট যে প্রচুর অর্থবিত্ত থাকলে আইনের প্রয়োগ মোলায়েমভাবে হয়। আর এ দেশে টাকা দিলে সব হয়। এখানে প্রভাবের চেয়ে টাকার জোর বেশি কাজ করেছে। টাকার জোরেই তাঁরা এভাবে দিনের পর দিন হাসপাতালে থাকছেন।

সোনালীনিউজ/এমএএইচ