বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প

বালিশ নিয়ে তোলপাড়, না বুঝে সমালোচনা কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৮ মে ২০১৯, শনিবার ০৪:০২ পিএম

বালিশ নিয়ে তোলপাড়, না বুঝে সমালোচনা কেন?

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প (ছবি : প্রতীকী)

ঢাকা : রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য নির্মিত ভবনে আসবাবপত্র কেনা ও তা ফ্ল্যাটে ওঠানোর খরচ নিয়ে তোলপাড় চলছে দেশ জুড়ে। প্রথমে ভেবেছিলাম তারা নিজেরা হয়তো e-GP এর বাইরে ক্রয় করেছে, কিন্তু যখন দেখলাম ক্রয় PWD করেছে তখন একটু মাথা ঘামাতেই হলো। যেহেতু সাধারণ মানুষ (আমাদের শিক্ষিতরাও ভাবেন যে তারা সব বিষয় জানেন) এখন বুঝে না বুঝে সবকিছুতে সমালোচনা করে তাই সাধারণের বুঝার মতো করেই বিষয়টা ব্যাখ্যা করি-

সরকারি ক্রয় করা হয় PPR এর নিয়ম মেনে। CPTU তার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সারাদেশের সকল ডিপার্টমেন্টের (যারা e-GP এর মাধ্যমে ক্রয় করেন, ছোট কয়েকটা সংস্থা ছাড়া সবাই এখন এটার সঙ্গে যুক্ত) ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। কোনো পণ্য বা সেবার মূল্য নির্ধারণ হয় নির্দিষ্ট শিডিউল বুক অনুসারে। পূর্ত কাজের জন্য PWD এর শিডিউল বুক আছে। শিডিউল বহির্ভূত আইটেম ক্রয়ের জন্য আছে রেট অ্যানালাইসিস শিডিউল। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

পুরো ক্রয় প্রক্রিয়া যেভাবে সম্পন্ন হয় তা হলো- ধরুন আমি একটি বাগান বাড়ি করবো। এর জন্য সম্ভাব্য সবগুলো আইটেম এবং এর পরিমাণ নির্ণয় করবো ড্রয়িং, ডিজাইন এবং অভিজ্ঞতার আলোকে। এই আইটেমগুলোর যেগুলো শিডিউলে আছে সেখান থেকে রেট দিব। সেগুলো শিডিউলে নেই সেগুলোর রেট অ্যানালাইসিস করে দিব। ধরুন মোট আইটেম হলো ১২০টি এবং সব মিলিয়ে আমার প্রাক্কলিত (সরকারি কেনাকাটায়) মূল্য আসলো এক কোটি টাকা।

আমি কাজের প্রতিটি আইটেমের স্পেসিফিকেশন এবং ওই আইটেমের কোয়ান্টিটি (পরিমাণ) লিখে OTM পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করলাম। এখন CPTU এর ওয়েবসাইটে এবং জাতীয় পত্রিকায় এই দরপত্র প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো কোয়ালিটিফুল (যোগ্যতা সম্পন্ন) ঠিকাদার অনলাইনে এই টেন্ডার সাবমিট করতে পারবে। এখানে যোগসাজশে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে টেন্ডার নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেননা কাজ পাবেন সর্বনিম্ন দরদাতা।

PPR এর রুলস অনুযায়ী দশ শতাংশ (১০%) এর বেশি বা কম দর যদি কেউ দেয় তাহলে সে বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি ১০ লাখের ভেতরে যারা কোট করবে তারাই শুধু মাত্র দরপত্র মূল্যায়নের জন্য বিবেচিত হবে। এর বাইরে অন্যরা বিবেচনায়ই আসবেন না। পুরোটাই সফটওয়্যার বেইজ সিস্টেম, এখনে এক পয়সা এদিক-সেদিক করার কোনো সুযোগ নেই। এখানে এমন প্রতিযোগিতা যে দশ শতাংশ লেস (কম) দেওয়া ছাড়া কাজ পাওয়ার সুযোগই নেই। কেননা আপনি যত শক্তিশালী হোন না কেনো অনলাইনে টেন্ডার ড্রপ করা থেকে কাউকে বিরত রাখার শক্তি আপনার নেই। আপনাকে কাজ নিতে হলে দশ শতাংশ (১০%) লেস দিয়েই কাজ নিতে হবে।

এখন প্রশ্ন হলো তাহলে কিভাবে একটা বালিশের দাম এত হলো? উঠানোর খরচ এত হলো? আমরা যখন দরপত্র মূল্যায়ন করি তখন প্রতিটা আইটেমের আলাদা আলাদা দর বিবেচনা করার সুযোগ কম। সফটওয়্যার বিবেচনা করে মোট দরের উপর। মোট ওই ১২০টি আইটেমকে সর্বনিম্ন মূল্যে সরবরাহ করবে? তাকে সর্বনিম্ন দরদাতা বিবেচনা করে আর সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে তাকে উইনার নাম ঘোষণা করে NOA দেওয়া হয়।

এখন ঠিকাদার যখন রেট কোট করে তখন তার কয়েকটি উদ্দেশ্য থাকে। প্রথম উদ্দেশ্য হবে তার রেট ৯০ লাখ টাকা মেলানো। এটা সে যেকোনোভাবেই করতে পারে। তার ইচ্ছেমতো যেকোনো আইটেমে যেকোনো রেট বসাতে পারে। মোট কোটেড রেট যদি ৯০ লাখ হয় তাহলেই সে কাজ পাবে। ধরুন আমি ঝামেলায় না গিয়ে ৯০ লাখকে ১২০ দিয়ে ভাগ করে প্রতিটি আইটেমের মোট রেট বানালাম ৭৫ হাজার টাকা। ৭৫ হাজারকে ওই আইটেমের কোয়ান্টিটি দিয়ে ভাগ করে পার ইউনিট রেট বের করে কোট করলাম। তাহলেও রুলস (নিয়ম) অনুযায়ী কোনো সমস্যা নেই। ধরুন একটি আইটেম RCC এর কাজ আছে ৭৫০ ঘন মিটার, এখন আমার প্রতি ঘন মিটারের RCC কাজের রেট পড়লো এই হিসাবে ১০০ টাকা।

আবার ধরুন আরেকটি আইটেম এ আছে বাগানে পানি দেওয়ার ঝাঝারি ৩টি, তখন একটি ঝাঝারির দাম পড়বে ২৫ হাজার টাকা। এভাবেই যেকোনো রেট বসানোর কারণেই একটা বালিশের দাম ৫ হাজার না হয়ে পাঁচ লাখও হতে পারে। আবার একটা দুই টন এসির দাম ১ টাকা কোট করতে পারে। এখন আপনি একটা বালিশের দাম পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে কথা বলবেন কিন্তু একটা দুই টনের এসির দাম ১ টাকা নিয়ে কথা বলবেন না কেনো?

ঠিকাদার যখন কোট করে তখন তারা এই সুযোগটা নিয়ে কিছু কৌশল অবলম্বন করেই কোট করে। ফ্রন্ট লোডিং বলে একটা শব্দ আছে, তাছাড়া কিছু আইটেমে ভেরিয়েশন হওয়ার সম্ভবনা থাকলেও সেখানে সিস্টেমে রেট কোট করে কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। এটা টেন্ডার মূল্যায়নের সময় চোখে পড়লে ওই দরদাতা কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে। এমন রেট কোটের এবং ব্যাখ্যা মনমতো না হলে সিকিউরিটি মানির হার বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই সর্বনিম্ন দরদাতাকে এই কারণে বাদ দিয়ে এর চেয়ে বেশি দর দেওয়া ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া যৌক্তিক না। সেটা আরও বড় অন্যায়। সরকারি টাকার অপচয়।

অন্যায়ের সমালোচনা করুন কিন্তু সেটা জেনে বুঝে। যে সেক্টর সম্পর্কে ধারণা নেই সেই সেক্টর সম্পর্কে সমালোচনা করতে গিয়ে অন্যদের হয়তো বাহবা পেতে পারেন কিন্তু সেই সেক্টরের মানুষগুলো ঠিকই আপনার দৌড় বুঝে ফেলে এবং বিরক্ত হয়। হয়তো ব্যাখ্যা দেওয়ার সময় সবার থাকে না। অথবা সবাই ব্যাখ্যা দিতে পছন্দও করে না।

লেখক : প্রকল্প বিশ্লেষক


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।