রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

বালি চলে পর্যটকের পয়সায়

নিউজ ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২১ জুলাই ২০১৯, রবিবার ০৬:০৭ পিএম

বালি চলে পর্যটকের পয়সায়

ঢাকা: বালির কুতা বিচে সেলফি তুলতে তুলতে এক অস্ট্রেলিয়ান তরুণীর ফোন বেজে উঠল। তরুণী ফোন রিসিভ করেই বললেন— ‘মম, আম নট কামিং টুমরো। উইল কল ইউ লেটার।’ তিনি ফের ব্যস্ত হয়ে উঠলেন সেলফি তোলায়।

বালি এমনই। সবকিছু ভুলিয়ে রাখে। নজরকাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বালির সমৃদ্ধ ইতিহাস-সংস্কৃতি এবং সস্তা জীবনযাপন পর্যটকদের দূরে রাখে অন্য পৃথিবী থেকে। এখানে সবকিছু বালিময়। ডুবে থাকে পর্যটকরা। উদযাপন করে জীবনকে।

প্রায় ১৭ হাজার দ্বীপ রয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়। তার মধ্যে বালি অন্যতম সেরা। চার হাজার বছর আগে গড়ে ওঠে বালির জনপদ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ওশানিয়া অঞ্চল থেকে অস্ট্রেনেশিয়ানরা আবাস গড়ে প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপে। পুরনো জনপদ হিসেবে বালির ইতিহাস ও সংষ্কৃতি সমৃদ্ধ। নৃত্য, সংগীত ও চিত্রকলায় সমাদৃত বালির ইতিহাস। ফলে দ্বীপটির সর্বত্র সভ্যতার নিদর্শন চিত্রিত, উপস্থাপিত।

নীল পানির উত্তাল সমুদ্র আর পাহাড়ি জনপদের ইতিহাসের সম্মিলনে সৌন্দর্যের পসরা মেলে বসেছে বালি। বছরজুড়ে তাপমাত্রাও থাকে সহনীয়। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকে মে মাসে; গড়ে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাকি সময় এর নিচে। প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত বালিতে ওপাশ থেকে অস্ট্রেলিয়ান পর্যটকরা বছরজুড়েই আসে। এ ছাড়া চীন, ইউরোপ, আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বের পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য এই বালি। গত বছরের এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রায় ৭ মিলিয়ন পর্যটক ঘুরে গেছেন বালি। প্রত্যেকে গড়ে সাতদিন অবস্থান করেছেন। প্রতিদিন খরচ করেছেন প্রায় দেড়শ ডলার করে।

ইন্দোনেশিয়ার ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে অন্যতম বালির জাতীয় আয়ের ৮০ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রদেশটির প্রতিটি কোনায়-কানায় পর্যটকের উপস্থিতি রয়েছে। ভারতীয় ও চাইনিজ সংস্কৃতির মিশ্রণে গড়ে ওঠা বালির প্রায় ৫০ লাখ অধিবাসীর ৮৩.৫ শতাংশ হিন্দু। বাকিরা মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান। বালিবাসী বেশ উদারমনা। ভিন্ন দেশ থেকে ভিন্ন সংস্কৃতির পর্যটকদের সঙ্গে অতি সহজে মিশে যাওয়ার দারুণ সহজাত বৈশিষ্ট্য রয়েছে তাদের।

শুধু পর্যটক আসার কারণে বালি আলাদা হয়ে উঠেছে দেশটির অন্য প্রদেশগুলো থেকে। ইন্দোনেশিয়ার মানুষের বার্ষিক গড় আয় যেখানে মাথাপিছু ৩ হাজার ৫৪০ ইউএস ডলার, সেখানে বালিতে সেটা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ইউএস ডলার। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ইন্দোনেশিয়ার এই দ্বীপ রাজ্যটিতে কৃষিকাজও হয়ে থাকে। বিশেষ করে জগদ্বিখ্যাত লুয়াক কফি ও কোকো চকলেটের আবাসস্থল এই বালি। তবুও জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসে বিদেশি পর্যটকদের পকেট থেকেই।

পর্যটকদের পয়সা দিয়ে বালি এগিয়ে নিচ্ছে নিজেদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন। পাশাপাশি শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে রাজ্যটি হয়ে উঠছে অন্যসব থেকে অনন্য।

শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেই কোনো অঞ্চল পর্যটকদের কাছে আকাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে না। তার জন্য প্রয়োজন অঞ্চলের শাসক ও সমাজপতিদের পর্যটকবান্ধব পদক্ষেপ। বালি সেক্ষেত্রে একশতে একশ পাবে। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ার শাসকরা বালির পর্যটকদের জন্য দেখিয়েছেন সর্বোচ্চ উদারতা। ধর্মীয় গোঁড়ামির ফাঁদে না পড়ে পুরো বালিকে করে তুলেছেন পর্যটকবান্ধব। পশ্চিমা জীবনাচারে কোনো বাধা নেই বালিতে। কারণ, এখানের বেশিরভাগ পর্যটক পশ্চিম থেকেই আসেন। উপভোগের সব উপকরণ এখানে পর্যাপ্ত। হাত বাড়ালে বিনোদনের ভরপুর ব্যবস্থা। সহনীয় তাপমাত্রায় নীল সমুদ্রে নয়নজুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো দ্বীপে এমন পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বিশ্বের অন্য কোথাও নেই। দ্বীপ থাকলে সৌন্দর্য নেই, সৌন্দর্য থাকলে সহনীয় তাপমাত্রা নেই কিংবা এ দুটো থাকলে উপযুক্ত পরিবেশ নেই। বালি এ দিক থেকে অনন্য।

দ্বীপরাজ্য যেহেতু, বালিতে জায়গা সীমিত। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে, সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ঘরবাড়ি। তবে বহুতল করা সম্ভব নয়। কারণ এখানে নিয়মিত ভূমিকম্প হয়। মাউন্ট বাতুর ও মাউন্ট আগুং নামের দুটি দৈত্য আগ্নেয়গিরি রয়েছে এই দ্বীপে। কিছুদিন পরপরই তারা ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে লাভা উদ্গিরণ করে। কেঁপে ওঠে পুরো বালি দ্বীপ। ভূমিকম্প ইন্দোনেশিয়ার নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ কারণে বহুতল ভবন নির্মাণ সম্ভব নয়। ফলে ওই সীমাবদ্ধ জায়গার মধ্যেই পর্যটকদের আবাসের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। তবুও নিখুঁত পরিকল্পনায় কাজটি করে যাচ্ছে রাজ্যটির নীতিনির্ধারকরা। রাস্তাঘাটে খুব বেশি জ্যাম নেই। সবাই নিয়মমো চলছেন, যথাযথ আইন মানছেন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে স্থানীয়রা সজাগ। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পর্যটকরা এই রাজ্যে কখনো বিপদের সম্মুখীন হননি।

বালি নিয়ে লিখতে বসলে নিজের দেশের কথাও মনে পড়ে যায়। আহা! কী অপরূপ সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে আমাদের কক্সবাজার, টেকনাফসহ পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। খুলনা, সিলেটসহ অন্যান্য অঞ্চলও কম যায় না। বলা চলে পুরো দেশটিই আমার সবুজের চাদরে ঢাকা। নদী বইছে শিরা-উপশিরার মতো। যেন অপার- অমূল্য সম্ভাবনার পসরা সাজিয়ে বসে আছে প্রকৃতি! অথচ কী নির্মম আমাদের শাসকরা, সমাজ বিনির্মাতারা। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরেও এই অমূল্য সৌন্দর্যের কথা বিশ্বকে জানাতে পারলাম না আমরা। জানাব কি, তাদের ডেকে আনার মতো মুখই তো নেই আমাদের। ধর্মীয় গোঁড়ামি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অদূরদর্শী সামাজিক-রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব— সব মিলিয়ে সোনার বাংলার অমূল্য সৌন্দর্যকে অস্পৃশ্য করে রেখেছে। বিদেশি পর্যটকের কথা বাদই দিলাম, নিজের দেশের নাগরিকরাই বঞ্চিত দেশের এমন সৌন্দর্য থেকে। কত নিরাপত্তার দোহাই, হানাহানির গল্প আর মৃত্যুর মিছিল প্রকৃতির এই মেলে ধরা সৌন্দর্যকে ভীতিময় করে রেখেছে। অথচ আমাদের ভূখণ্ড একটাই। আর ইন্দোনেশিয়ায় ৩৭ হাজার বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড এক হয়ে টিকে আছে স্রেফ এক স্লোগানে— ভিনেকা তুনগাল ইকা  (Many, Yet One)।

যোগ করি বালির কিছু চমকপ্রদ তথ্য। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর পর্তুগিজ, ব্রিটিশ ও ডাচ শাসনের পর ইন্দোনেশিয়া তথা বালি স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৯ সালে। কিন্তু পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটে ১৯৮০ সাল থেকে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই বালি পুরো পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে হয়ে ওঠে সেরা গন্তব্য। ফলে বিশ্বের নানা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের জন্য ভেন্যু হিসেবে দাম বাড়তে থাকে বালির। ২০১৩ ও ২০১৮ সালের মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় এই বালিতে। সুবাক ইরিগেশন সিস্টেমের মাতৃভূমি বালিতে। এটা ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত।

সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর জনপদ বালি নিজেদের ভাগ্য ঘুরিয়ে নিয়েছে স্রেফ নেতৃত্বের কৌশলে। বালির মানুষ এখনো কৃষিকাজ করে। তবে সেই কৃষিক্ষেতও হয়ে উঠেছে পর্যটকদের আকর্ষণস্থল। কফি কীভাবে তৈরি হয়— তা জানাতেও বালির কৃষকরা নিজেদের কৃষিক্ষেতে এক ধরনের আয়োজন নিয়ে বসেন। সেখানে পর্যটকরা যাচ্ছেন। বসে কফি কিনে খাচ্ছেন। ফিরে আসার সময় কফি কিনেও নিয়ে আসছেন। এ সবকিছুর জন্য কৃষকরা নিয়োগ করেছেন কিছু ট্যুরিস্ট গাইড যারা একইসঙ্গে প্রোমোশনাল কাজও করছেন।

বালি আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে সামনের দিনগুলোতে। পর্যটকের পয়সায় এগিয়ে চলা এই জনপদটি এখনো তুলনামূলক সস্তা। পর্যটকদের এখানে আসার পেছনে এটাও অন্যতম কারণ। সবকিছু মিলিয়ে সারা বিশ্বের পর্যটকরা বালির দিকে ঝুঁকেছেন। এই ঝোঁক যতদিন থাকবে, অন্যকথায় বালির অধিকর্তারা যতদিন এই ঝোঁকের মধ্যে পর্যটকদের রাখতে পারবেন, ততদিন পর্যটকের পয়সায় চলবে বালি।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/এসএস