শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

বিতর্ক যার নিত্যসঙ্গী

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ জুলাই ২০১৯, সোমবার ০১:০৯ পিএম

বিতর্ক যার নিত্যসঙ্গী

ফাইল ছবি

ঢাকা : বাংলাদেশের রাজনীতিকদের মধ্যে তুমুল আলোচিত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদই প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।

সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে উৎখাত করে তিনি দেশ বাঁচানোর কথা বলে রাজনীতিতে আসেন। পরে জুড়ে বসেন ক্ষমতায়। ক্ষমতায় থেকেই গঠন করেন রাজনৈতিক দল। আর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে জিতে সেই দল জাতীয় পার্টি ক্ষমতাতেও আসে।

বিরোধী দলগুলোর একাংশের বর্জনের মুখে ১৯৮৬ সালের ওই সংসদ আবার দুই বছর পর ভেঙে দেন এরশাদ। এরপর ১৯৮৮ সালে একতরফা নির্বাচনে জিতে আবার জাতীয় পার্টি আসে ক্ষমতায়। তবে এবার আর রক্ষা হয়নি। দুই বছরের মাথায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি হওয়া জিয়াউর রহমান নিহত হন ১৯৮১ সালের ৩০ মে। এরপর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে এরশাদ রাষ্ট্রপতি হন ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ। নয় বছর থাকেন ক্ষমতায়। সে সময় ক্ষমতায় এসে নির্বাচন দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার অঙ্গীকার করেও কথা রাখেননি এরশাদ। জিয়াউর রহমানের পথ ধরেই গঠন করেন তার নিজের দল জাতীয় পার্টি। আর গণআন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ।

তবে এরশাদের দাবি, তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন বাধ্য হয়ে। গত বছর এক আলোচনায় প্রয়াত জাপা চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমার রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা ছিল না, জাস্টিস সাত্তারের (সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার) অনুরোধে দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তিনি তখন দেশ চালাতে অপারগ ছিলেন। আমি নির্বাচন দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সবাই ভোট বর্জন করল। তখন বাধ্য হয়ে দল গঠন করেছি।

রাজনীতিতে নেতিবাচক চরিত্রের মধ্যেও দেশবাসীর মধ্যে এরশাদের এক ধরনের আবেদনের প্রমাণও দেখা গেছে নানা সময়। গণআন্দোলনে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি আসন থেকে জিতে আসেন তিনি, যদিও পরে নানা ঘটনায় জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন তিনি।

সেনা শাসক হিসেবে দ্বিতীয় হলেও বাংলাদেশে ‘স্বৈরাচার’ তকমাটি কেবল এরশাদেরই আছে। তুমুল সমালোচনা ও বিতর্কের মধ্যেও তিনি শেষ পর্যন্ত একটা অবস্থান নিয়ে টিকে ছিলেন।

৯০ সালে পতনের পর এরশাদ জোট করেছেন প্রথমে বিএনপি ও পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। দুইবার জোট ছেড়ে বের হয়ে গেছেন। আবার জোট ছাড়লেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছেন। এক ধরনের ‘সমঝোতার বিরোধী দল’ হয়েছেন দশম সংসদ নির্বাচনে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আবার জোট করেছেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে।

সব মিলিয়ে এরশাদ ‘অস্থির’ ও ‘অনিশ্চিত ব্যক্তিত্ব’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছেন বারবার; যিনি কোনো বক্তব্যেই অটল থাকতে পারেন না।

এরশাদের নয় বছরের শাসনামল নিয়ে অবশ্য নানা ধরনের মূল্যায়ন আছে। বেশকিছু মহাসড়ক নির্মাণ হয়েছে এই সময়ে যে কারণে তিনি দাবি করেন, তার আমলে উন্নয়নের শুরু। কিন্তু আরো একটি দিক আছে। এরশাদের শাসমানলে দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে চার শতাংশ। দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বের উদাহরণ হিসেবে উঠে আসা এই দেশে আর কোনো সরকারের সময়ই এই ঘটনা ঘটেনি। প্রতি বছর বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার কমেছে।

চমক ও মানুষের বন্ধু পরিচিতির জন্য হাস্যকর নানা কাজও করেছেন এরশাদ। রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় সাইকেল চালিয়ে অফিসে যাওয়া, হুট করে কোনো মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া, খরার সময় বৃষ্টির পূর্বাভাস পেয়ে দেশব্যাপী মোনাজাতের আয়োজন করার ঘটনাও ঘটিয়েছেন। গলফ খেলা নিয়েও তার মাতামাতি ছিল। নিয়মিত গলফ টুর্নামেন্ট হতো। আর রসিকতা করে বলা হয়, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীরা দ্বিতীয় হওয়ার চেষ্টা করতেন সব সময়।

কবিতা নিয়েও মাতামাতি করেছেন এরশাদ। নিজেকে কবি দাবি করলেও তার নামে প্রচার হওয়া কবিতা আদৌ তার কি না এ নিয়ে প্রশ্নও আছে।

অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল ও নানা কারণে পটুয়া কামরুল হাসানের আঁকায় ‘বিশ্ব বেহায়া’ খেতাবও জুটেছে এরশাদের। আর্থিকের পাশাপাশি একের পর এক নারী কেলেঙ্কারিতেও নাম এসেছে তার। যদিও নিজের দলের কাছে তিনি ছিলেন ‘পল্লীবন্ধু’।

এরশাদের মুখরোচক একটি বক্তব্য ছিল, ‘৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ।’ কিন্তু এই ৬৮ হাজার গ্রামের উন্নয়নে উদাহরণ হিসেবে কিছুই করতে পারেননি তিনি। যদিও তার শাসনামলে উপজেলা পরিষদ তৈরি, বৃহত্তর জেলা ভেঙে ৬৪টি জেলা তৈরি, বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট স্থাপন হয়েছিল।

এরশাদের জন্ম ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে। অবিভক্ত ভারতে শিশুকাল কোচবিহারে কাটে তার। ভারত ভাগের পর তার পরিবার চলে আসে রংপুরে; স্কুলের পড়াশোনা চলে সেখানেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাসের পর ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এরশাদ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। তার দাবি, বন্দি হিসেবে সেখানে ছিলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়ার তথ্যও আছে।

পাকিস্তান থেকে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে ফেরার পর মামা রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়ার (বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতিমন্ত্রী) সুপারিশে এরশাদকে সেনাবাহিনীর চাকরিতে ফেরত নেওয়া হয়। পদমর্যাদা ছিল কর্নেল।

১৯৭৫ সালে এরশাদ ভারতের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রতিরক্ষা কোর্সে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। ওই বছরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি সেখানেই ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতায় আসা জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হওয়ার পর ভারত থেকে এনে এরশাদকে করা হয় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান, পদ মর্যাদা হয় মেজর জেনারেল। পরে রাষ্ট্রপতি হয়ে জিয়া ১৯৭৮ সালে এরশাদকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহতের পেছনে এরশাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জিয়ার স্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ওই ঘটনার নেতা মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে হত্যার পেছনেও তারই ভূমিকা আছে বলে অভিযোগ আছে। এই ঘটনায় মামলা হলেও তার রায় হয়নি।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এরশাদ সুযোগ বুঝে কোপ মারেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। নিজেকে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করে জারি করেন সামরিক শাসন, স্থগিত করেন সংবিধান।

প্রথমে বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদে বসিয়েছিলেন। কিন্তু সব ক্ষমতা ছিল এরশাদেরই হাতে। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে এরশাদের ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না আহসানউদ্দিনের। পরে রাখঢাক না রেখে পূর্বসূরি জিয়াউর রহমানের মতোই ক্ষমতার চেয়ারে বসেন এরশাদ। জিয়ার পাশাপাশি তারও এই ক্ষমতারোহণ অবৈধ বলে রায় এসেছে উচ্চ আদালত থেকে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই