মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট, ২০২০, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭

খালেদার মুক্তি

বিদেশে লবিংয়েই ভরসা বিএনপির

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার ০৪:০৪ পিএম

বিদেশে লবিংয়েই ভরসা বিএনপির

ঢাকা : দিন যত যাচ্ছে ততই হতাশ হয়ে পড়ছে বিএনপি। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নে বিএনপির বোদ্ধাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। বহুবার মুখে বললেও বাস্তবে রাজপথ কাঁপানো সম্ভব হয়নি এখনো। গত বৃহস্পতিবার জামিনে নেত্রীর মুক্তির আদেশের আশায় ছিল দলটি।

আশা-নিরাশ যা-ই হোক, তা ঝুলে গেছে চিকিৎসকদের প্রতিবেদন না আসায়। উচ্চ আদালতের আভাস-ইঙ্গিতও আশাব্যঞ্জক নয়। শেষ ভরসা হিসেবে বিদেশমুখী হচ্ছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তারা লবিং করতে যাচ্ছেন বিদেশে।

অবশ্য বিএনপির তরফ থেকে বলা হচ্ছে, এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রয়াসমাত্র। আর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বলছে, নালিশ করতে যায় বা যাচ্ছে বিএনপি। তারা নালিশ পার্টি নামেও ব্যঙ্গ করে বিএনপিকে।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, জাতিসংঘ, ওআইসি, যুক্তরাষ্ট্র, ইরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, রাশিয়া, চীন ও ভারতসহ মানবাধিকারকে গুরুত্ব দেয় এবং বিএনপির বিবেচনায়  বন্ধু-এমন দেশ ও সংগঠনগুলোর কাছে খালেদার স্বাস্থ্য ও মুক্তির বিষয় তুলে ধরতে বেশ কিছুদিন ধরেই কাজ করছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

ইতোমধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে এবং চিঠিপত্রও দিয়েছে। আদালতের দিকে চেয়ে আছেন, শেষ দেখে বিদেশের পথে পা বাড়াবেন অর্ধডজন নেতা। তারা কূটনৈতিক লবিং রক্ষা করেন।

লন্ডনে অবস্থানকারী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দেশত্যাগকারী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক, সাবেক আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসিমসহ কিছু নেতা ইতোমধ্যে বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছেন।

গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি হন বিএনপিপ্রধান।

তখন থেকেই দলের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবেন তারা। এজন্য শিগগিরই কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করার মতো প্রতিশ্রুতি এসেছিল সিনিয়র নেতাদের মুখ থেকে।

তবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন, অনশন, গণস্বাক্ষর ও প্রশাসনে চিঠি চালাচালিসহ চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল দলটির কিছু কর্মসূচি।

ওই সব কর্মসূচিতে বিএনপির নেতাদের স্লোগান ছিল-‘আমার মাকে ছেড়ে দে, লাগলে আমায় জেলে নে, জেলের তালা ভাঙব, খালেদা জিয়াকে আনব...’।

অথচ খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর ইতোমধ্যে চলে গেছে ২১ মাস। এ নিয়ে সরকারকে ধাক্কা দেওয়ার মতো কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি দলটি। ফলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে-এমন আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন বিএনপির মধ্য ও শেষ সারির নেতাকর্মীরা। আশায় আছেন শুধু নীতিনির্ধারকরা।

এদিকে প্রথম দিকে তুলনামূলক কম অসুস্থ খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন কারাবাসের কারণে বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ। তার উন্নত চিকিৎসায় বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির জন্য আবেদন করে আসছিলেন খালেদাসহ বিএনপি নেতারা। কিন্তু সে আবেদন আমলেই নেয়নি সরকার।
সরকার দলীয় নেতাদের মন্তব্য-দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে প্যারোলে মুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলেই মুক্তি পেতে পারেন খালেদা জিয়া। এছাড়া আদালতও জামিনে মুক্তি দিতে পারে।   

বিএনপি নেতাদের ধারণা ছিল, শারীরিক অসুস্থতাকে আমলে নিয়ে মানবিক কারণে হয় সরকার নয়তো আদালত তাকে মুক্তি দেবে। এ নিয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেল এবং দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠকও হয়। প্যানেলের তরফ থেকে বিএনপিকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আদালতের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে না। তারা মনে করে মামলাগুলো রাজনৈতিক। জামিনের বিষয়টি সরকারের মনোভাবের ওপর নির্ভর করছে। রুদ্ধদ্বার বৈঠক ছাড়াও খোলা মাঠেও একই কথা জানিয়ে আসছেন আইনজীবীরা। তারা আন্দোলনের পরামর্শ দিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে গত ১৭ আগস্ট দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরবে বিএনপি।

ওইদিন বিএনপির মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য ও তার মুক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যেসব গণতান্ত্রিক দেশ আছে তাদের অবহিত করব এবং যে অন্যায়ভাবে দেশনেত্রীকে আটক করে রাখা হয়েছে সে বিষয়টা আন্তর্জাতিক মহলে নিয়ে আসার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেব।

তখন থেকেই মামলার নথিপত্র, খালেদা জিয়ার চিকিৎসাপত্রসহ সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। পাঠানো হয়েছে কয়েকটি দেশসহ বেশ কিছু সংগঠনের কাছে।

ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের বাসায় কয়েক দফায় বৈঠক করেছে বিএনপি। দলীয় কার্যালয় এবং ভাড়া করা হোটেলেও সভা করেছে। তাতে খালেদা জিয়ার মামলা এবং তার শারীরিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা এ প্রতিবেদককে জানান, দেশে আন্দোলনের বদলে আমাদের কিছু নেতা বিদেশিদের কাছে অভিযোগ জানাতে পছন্দ করছেন।

তিনি বলেন, বিদেশিরা বিবৃতি দিয়ে সরকারের প্রতি একটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু তারা তো রাজপথে আন্দোলন করে দেবে না, আদালতেও হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। তাই যা করার আমাদেরই করতে হবে।

খালেদার মুক্তির প্রশ্নে বিদেশমুখী না হয়ে আন্দোলনের জন্য সংগঠনকে প্রস্তুত করার পক্ষেই শক্ত অবস্থান এই নীতিনির্ধারকের।

সোনালীনিউজ/এমটিআই