মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

বিদ্যুতায়নে বড় বাধা সিস্টেম লস

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার ০১:০০ পিএম

বিদ্যুতায়নে বড় বাধা সিস্টেম লস

ঢাকা : দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিদ্যমান সিস্টেম লসের কারণে দেশকে ২০২১ সালের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনার সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে হুমকির মুখে রয়েছে। সমগ্র দেশকে বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রেসহ দেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নেও বড় বাধা হয়ে রয়েছে এই ‘সিস্টেম লস’।

 সিস্টেম লস দূর করা সম্ভব হলে একদিকে সরবরাহ যেমন বাড়বে অন্যদিকে বিভিন্ন খাতের উৎপাদনের পরিমাণও অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে, যা দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভুমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিস্টেম লসের একটি বড় কারণ হচ্ছে চুরি। বিদ্যুতের সিস্টেম লসে দেশের বিতরণ কোম্পানিগুলোও ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লসের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত বিদ্যুৎ যখন বিতরণের জন্য পরিবহন করা হয়, তখন পরিমানের কিছুটা তারতম্য হয় এবং পরিমাণ কমে যায়, ফলে ক্ষতি হয়। যাকে সিস্টেম লস হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু এ সিস্টেম লসেরও একটি অনুমোদিত মাত্রা রয়েছে। তবে সবখানেই সেটি যে একই মাত্রায় ঠিক থাকবে, তা নয়।

আর বিদ্যুৎ বিভাগের বিতরণ সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রিড সাবস্টেশন থেকে বিতরণ কোম্পানির সাবস্টেশনে বিদ্যুৎ আনা হয়। সেখান থেকে আবার ট্রান্সফরমারে নেওয়া হয়। ট্রান্সফরমার থেকে যায় বিদ্যুৎ গ্রাহকের বাসা-অফিস বা প্রতিষ্ঠানে যায়।

সব মিলিয়ে প্রত্যেকটি পর্যায়ে কিছু লস হয়ে থাকে, যাকে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায়ও থাকে না। যখন এটি অনেক বেশি পরিমাণে হয়ে যায়, তখনই বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে।

জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে পর্যন্তও কোনো কোনো বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ১০ ভাগের ওপরে সিস্টেম লস দেখিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে ক্রমাগতভাবে চাপ দেওয়ার পর তারা সিস্টেম লস কমিয়ে এনেছে। ঢাকার দুই বিতরণ কোম্পানির সিস্টেম লসের পরিমাণ কমে এখন ৬ থেকে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে সিস্টেম লস অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এজন্য দরকার সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো পদক্ষেপ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বিতরণ কোম্পানি যদি দৈনিক পাঁচ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছ থেকে কেনে এবং বিক্রির ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা সাড়ে চার হাজার ইউনিটের বিল করছে।

এর অর্থ হচ্ছে বিতরণ কোম্পানি যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পিডিবির কাছ থেকে কিনছে, আর যে পরিমাণ বিদ্যুতের বিল করছে, এই প্রক্রিয়ার ভেতরে যে পার্থক্য রয়েছে, সেটিই হচ্ছে সিস্টেম লস। তবে কারিগরি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা সম্ভব হলে সিস্টেম লস বহুলাংশে দূর করা সম্ভব হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, দেশে আবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। জানা গেছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরের পর ২০১০-১১ অর্থবছরে বিদ্যুতের মোট সিস্টেম লসের পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, ২০১১-১২ অর্থবছরে তা সামান্য কমে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৬১ শতাংশ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে আর একটু কমে তা ১৩ দশমিক ৭৯ শতাংশে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আবার এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। এরপর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা আবার কমে ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আরো একটু কমে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আরো কমে ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

এদিকে, দেশকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গত বুধবার নতুন সাতটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ উপলক্ষে গণভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০২০-২১ সাল মুজিব বর্ষে দেশবাসীকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনা হবে।

তিনি বলেন, দেশকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আনতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

জানা গেছে, উদ্বোধন করা নতুন সাতটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলো চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রংপুরে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলীতে ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিকলবাহা ১০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পটিয়ায় ৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেঁতুলিয়ায় ৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গাজীপুরে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র। নতুন এ সাতটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৭৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হওয়ায় বুধবার থেকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২২ হাজার ২৬২ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে বিদ্যমান সিস্টেম লসের ব্যাপারে বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, আমরা দেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তাবায়নের কাজ করে যাচ্ছি। পাশাপাশি এ খাতে বিদ্যমান সিস্টেম লস কমিয়ে আনার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিষয়টিকে প্রশাসনিকভাবেও নিয়ন্ত্রণে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া সারা দেশে গ্রাহক পর্যায়ে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে সিস্টেম লস পরিপূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হবে। এজন্য গ্রাহক পর্যায়ে প্রিপেইড মিটার স্থাপন কার্যকরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, ২০২০-২১ সাল সরকার ঘোষিত মুজিব বর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে বিদ্যমান সিস্টেম লস ও অনিয়ম বজায় থাকলে দেশকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আনার বিষয়টি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। যা বর্তমান সরকার ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরিত করার বিষয়টিকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই