বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬

বিবেকের আয়নায় দাঁড়াও

সাহিদা সাম্য লীনা | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০১৯, সোমবার ০২:৩৭ পিএম

বিবেকের আয়নায় দাঁড়াও

ঢাকা : কামরুন নাহার মণি। নুসরাত হত্যার ১৬ আসামির একজন। তাকে নিয়ে দু-একবার লিখতে গিয়েও, তাকে দেখার পরে আমার আদৌ ইচ্ছা করেনি লিখতে। চরম ঘৃণা এই অপরাধীর প্রতি! কেননা সে প্রেগন্যান্ট অবস্থায় এমন নৃশংসতায় অংশ নিয়েছে! বয়সটাও এত বেশি না। আমি তার বিভিন্ন ছবি দেখে বুঝেছি মাদরাসায় পড়লেও সে নিয়মিত স্টার জলশা ও জিটিভি চ্যানেলগুলো দেখত।

যদিও সংবাদকর্মীদের কয়েকজনের মাঝে ছড়ানো হয়েছে এই গুঞ্জন যে, মণিকে ফাঁসানো হয়েছে। মণি নাকি দুজন! ২৯ মার্চ  সিরাজের পক্ষে যে মানববন্ধন হয় সেখানে দুজন মণি ছিল, একজন বক্তব্য দিচ্ছিল সিরাজের গুণ গেয়ে; আরেকজন ব্যানার ধরে দাঁড়িয়ে ছিল—আজকের আসামি এই মণি। কিন্তু কথা তো একই দাঁড়াল! দুজন মণিই সম্পৃক্ত তাদের নিজেদের মতো করে। তবে অভিযোগপত্র ঘোষণার পরেও এটাই জানলাম যে, মূল আসামি যে ছাদে ছিল সেই এই মণি। তাহলে কে ওই দ্বিতীয় মণি? মাদরাসার হল ডিউটিরতও সাক্ষী তার জবানিতে এ মণির কথাই জানিয়েছে। কিলিং মিশনে এই মণিই ছিল। কে মণির শত্রু তাকে ফাঁসাবে? একজন প্রেগন্যান্ট নারীর কে শত্রু হবে? তার কললিস্ট ও আরো নমুনা তদন্ত করেই তার সম্পৃক্ততা পেয়েছে পিবিআই।

কিছু বিপথগামী অনলাইন সাংবাদিক আমাকে তাদের অভিলাষ দিয়ে কিনতে চেয়েছিল। মণি নারী, আমি নারী; আমি মা হয়েছি, মণি মা হতে যাচ্ছে—এমন স্পর্শকাতর বাক্য দিয়ে চেয়েছিল পটাতে। কেননা লেখক বা সংবাদকর্মী হিসেবে নুসরাত ঘটনার ইস্যু নিয়ে আমার জোর প্রতিবাদ, লেখালেখি চলছে ধারাবাহিকভাবে। হয়তো আমার সফট কর্নারটাকে তারা কাজে লাগাতে চেয়েছিল। আমার অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের কারণে সম্ভবত আমিও খুঁজে পেলাম তাদের কথা বলার ধরনে বেশ দুর্বলতা।

মণি আদালতে বলেছে, নুসরাতের সঙ্গে তার কি শত্রুতা ছিল। বিচারকও নাকি বিব্রত তার প্রশ্নে, তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন’। মণির স্বজনরা এগুলো বাইরে প্রচার করেছে। তবে মণিদের বোঝানো হয়েছিল নুসরাতকে মারার পর তা আত্মহত্যা বলে চালানো হবে। এই বলে তাদের কিলিং মিশনে যুক্ত হতে উৎসাহিত  করেছে। তবে এদের গার্ডিয়ানরা উদাসীন সন্তানের ব্যাপারে। এই অপরাধে যুক্ত হওয়ার আগে যদি একবার এদের পরিবারের লোকজন জানত, অবশ্যই বাধা দিত। কিন্তু মণি তার অল্প বয়সের অভিলিপ্সা আর কাঁচা বুদ্ধির কারণে আজ বিপদগ্রস্ত। তার খালাস হবে না ফাঁসি, নাকি অন্য কোনো লঘু সাজা—তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আদালতে সে অসুস্থ শরীর নিয়ে হাজিরা দিচ্ছে দিনের পর দিন।

রাফির মা আমাকে জানিয়েছিল, রাফির বেশ কিছু গুণ ও তার রূপের বর্ণনা,  যা একান্ত মা জানতেন। কেননা সে বোরকা পড়ত, যার বাড়তি সৌন্দর্য বাইরের কেউ জানবে না, এটাই স্বাভাবিক। যারা তাকে দেখেছিল তারা আত্মীয়, নারী এবং প্রতিবেশীরা। তা-ও কম দেখা দিত রাফি। শামীম ও নুরউদ্দিন, রাফি দাখিল পড়ার আগে থেকেই যন্ত্রণা করত। আর এভাবেই প্রেমের উৎপত্তি ও জ্বালাতন; প্রেম  প্রত্যাখ্যান ও ব্যর্থ হয়ে নুরউদ্দিন তার সৌন্দর্য বিনাশে চেষ্টাও করেছিল চোখে বিষাক্ত কিছু মেরে। রাফির মা বলেন, সেটি চুনের পানির মিশ্রণও হতে পারে। তার মেয়েকে দেখে কতজন প্রার্থী ছেলে ও তাদের পরিবার বউ করে নিতে উদগ্রীব ছিল বলেছেন রাফির মা। যে ছবিটি রাফির মৃত্যুর পর সব পত্রিকায় প্রকাশ হয়, তা তার সঙ্গে ঘটনা বাড়াবাড়ির সময়কালীন মার্চ মাসে। তখন রাফি চিন্তায় শুকিয়ে গিয়েছিল।

আমরা আদালতে মণি ও অপরাপর কোনো আসামিকে অসুস্থ, অবসন্ন, বিধ্বস্ত দেখিনি। বরং তাদের হাঁটার গতি, কথা, আচরণ ও পোশাকে বেশ আরামে আছে বলেই মনে হয়েছে। মণি ও চম্পা দুজনেই আপাদমস্তকে ঢাকা শরীরে স্বাভাবিক ছিল। যদি মণিকে কোনোভাবে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করা হয়, তবে তা হবে নুসরাতের সঙ্গে হঠকারিতা। নুসরাতকে পরীক্ষার হল থেকে ডেকেছিল একটি মেয়ে, মণিসহ দুজন মেয়ে ছিল ছাদে—নুসরাত বলেও গেছে।

মণির পেটে নিষ্পাপ শিশুটা বড় হয়ে জানবে তার মা একজন কিলার! কিলার হিসেবে জেল খেটেছে। আমার মতে, দোষ স্বীকার করে অনাগত বাচ্চা পেটে নিয়ে তার এসব নাটক আর না করাই উচিত। প্রকৃতি তো নীরব থাকবে না অন্যায় সয়ে! বাচ্চাটা জন্মের পর কোনো নিঃসন্তান দম্পতিও নেবে না; শুধু মণির ইতিহাসের কারণে। মণি নির্দোষ এ কথা ভাবতেও নিজেকেও অপরাধী লাগে। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, শুধু মুখ দিয়ে বা কথার মারপ্যাঁচে বিচারককে দুর্বল করার চেষ্টা অবান্তর। মণি তুমি নারী বলে সাতখুন মাফ হয় না। অপরাধী সে যে-ই হোক, তাকে মানুষই বুঝি।

নুসরাত ঘটনায় কিলিং মিশনে দুই নারীর মধ্যে তুমিও একজন। পিবিআই’র সঙ্গে তোমাদের শত্রুতা নেই, যে জোর করে জবানবন্দি নেবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে তোমরা অপরাধী হিসেবে আলাদা আইডল রচনা করেছ, ৯২ জন সাক্ষীকে তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে হচ্ছে। বেলাশেষে কাউকে নির্দোষ ভাবার সময় ও অসিলা কি হয় বলো? আলামত নিয়েই তো তুমি অ্যারেস্ট হয়েছ!

মণি নিজেকে নিরপরাধের এমন কোনো শক্ত প্রমাণ দিতে কি পারবে? পারলে আমি বলব চেষ্টা করো। আবেগ ছাড়া জীবন চলে না, আবার আবেগ দিয়ে সবকিছু সিদ্ধি লাভ করা যায় না। আদালত চাইবে প্রমাণ। ১৬ জনের পক্ষে বাঘা বাঘা উকিল নিয়োজিত। মণি তোমার পাশেও আছে একজন জাঁদরেল উকিল। পিবিআই যদি তোমার বাচ্চাকে ফুটা করে ফেলবে বলে (তোমার ও তোমার স্বজনদের ভাষ্যমতে) জবানবন্দি নিয়ে থাকে, তাহলে এখনো অনাগত বাচ্চার জন্যই নিজেকে প্রশ্ন করো—তুমি নুসরাত হত্যায় ছিলে, কি ছিলে না? নিজের জন্য না, অন্তত বাচ্চার জন্য শেষবার তোমার বিবেকের আয়নায় দাঁড়াও।

লেখক : সাংবাদিক


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।