শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

বিরোধী রাজনীতি এখন পথহারা

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০১৯, বুধবার ০২:৪৯ পিএম

বিরোধী রাজনীতি এখন পথহারা

ঢাকা : অনৈক্যের কানাগলিতে আটকে গেছে বিরোধী রাজনীতি। ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে অতীতের সাফল্যের রেখা। উল্টো অভিযোগ উঠেছে আপসকামিতার। দেশে এখন বিরোধী রাজনীতি বা কর্মকাণ্ড আছে-সাধারণ মানুষ এমনটা প্রায় ভুলতেই বসেছে। বিষয়টি স্বীকার করছেন খোদ রাজনীতিবিদরাও।

বিরোধী রাজনীতির দৈন্য দশায় হতাশাগ্রস্ত কর্মী-সমর্থকদের ক্ষোভের তীর দলীয় রাজনীতিবিদদের প্রতি। আর বিরোধী রাজনীতিবিদরা দোষারোপ করছেন সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে। ক্ষমতাসীন দল বলছে নিজেদের মধ্যে অনৈক্য আর জনবিচ্ছিন্নতায় রাজনীতিতে সফল হতে পারছে না বিরোধীরা।

মানুষের অধিকার, অভাব-অভিযোগ ও প্রত্যাশা পূরণের কাছাকাছি পৌঁছাতে চান রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্তরা। সাধারণ মানুষ আর ক্ষমতাসীনদের মধ্যে অপ্রাপ্তির কথা বলতে কাজ করে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

কিন্তু কালের আবর্তে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো স্বকীয়তা হারাচ্ছে। মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। আগে সরকারের কোনো কর্মকাণ্ড গণবিরোধী মনে হলে বিরোধীরা রাজপথ গরম করত। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে কর্মসূচি দিত।

গণতান্ত্রিক কর্মসূচি কখনো কখনো গণ্ডি পেরিয়ে রূপ নিত সংঘাতে। ছিল শাসক দলের নিপীড়নও। তারপরও অধিকার আদায় হতো। এমনকি সফল রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের নজিরও আছে।

কিন্তু গত এক যুগ চিত্র পাল্টেছে। মৌলিক অধিকার—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ আছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে দফায় দফায়। পানির ন্যায্য হিস্যাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আছে দেনা-পাওনার হিসাবও। কিন্তু গত এক যুগে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়গুলো নিয়ে রাজপথে বা সংসদে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, রাজপথে বিরোধী শক্তি বিএনপি, নাগরিক ঐক্য ও বাম দলের একাধিক নেতা ক্ষমতাসীনদের দোষারোপ করেছেন। সমালোচনা করতে ছাড়েননি পরস্পরের বিরুদ্ধেও। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক জোট ২০ দল। বনিবনা না হওয়ায় জোটের ভেতর আরেকটি জোট করেছেন ২০ দলের শরিক লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)।

এই পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ নতুন এই জোটের নাম দিয়েছেন মুক্তি মঞ্চ। জোটের শরিক অন্য দলগুলোসহ বিএনপি বিষয়টিকে ভালোভাবে নিচ্ছে না। তবে এই শরিকরাই আবার বিএনপির বিরুদ্ধে সরকারের সঙ্গে আপসকামিতার অভিযোগ তুলছে। দলটির নীতিনির্ধারকদের ব্যবসা-বাণিজ্য আছে সরকারের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে।

এদিকে ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে জয় কুড়াতে ২০ দলীয় জোটের বাইরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামের আরেকটি মঞ্চ হয়েছিল। তাতেও ঐক্য ছিল না। বাদ সাধে জামায়াতকে নিয়ে। ইসলামী দলগুলোও একই ধরনের দাবি-দাওয়া নিয়ে পৃথক মঞ্চে কথা বললেও একমঞ্চে আসতে পারছে না। বাম রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের তীব্র বিরোধিতা করে গণমুখী কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামে; কিন্তু জনবল কম থাকায় কর্মসূচি সফল হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের (ডাকসু) সাবেক  ভিপি ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, এ কথা সত্য, বিরোধীদলীয় রাজনীতি আজ অনৈক্যের কানাগলিতে আর আপসকামিতার চোরাবালিতে আটকে দিশাহারা, পথহারা।

রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে এবং নিয়মিত গণতন্ত্রের চর্চা থাকলে সরকার আজ এতখানি স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ করতে পারত না। সেজন্যই দল, গোষ্ঠী, পরিবার, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা-স্বার্থ বাদ দিয়ে সবাইকে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা ভাবতে হবে। আজকের রাজনীতি হতে হবে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি। আর এর একমাত্র পথ গণতন্ত্র।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরীর বিশ্লেষণ-দেশে এখন বিরোধী রাজনীতি বা কর্মকাণ্ড আছে সাধারণ মানুষ এমনটা প্রায় ভুলতে বসেছে।
সংসদের বিরোধী দল নামের সংগঠনটি চলছে সরকার নিয়ন্ত্রিত হয়ে। আর সংসদের বাইরে যারা আছে তারাও মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ, তারাও আপসকামিতার পথ বেছে নিয়েছে বলে বাহ্যিক চিত্রে মনে হয়। দেশে কার্যকর বিরোধী রাজনীতির অনুপস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষ তাদের নানাবিধ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার অনির্বাচিত ও ফ্যাসিবাদী হলে গণতান্ত্রিক স্পেস থাকে না। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত করতে পারে না। আমাদের দেশে বর্তমান সরকার অত্যন্ত ফ্যাসিবাদী আচরণ করছে। শুধু বিএনপিই নয়, কোনো রাজনৈতিক দলই রাজপথে নামতে পারছে না। নিষ্ঠুরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

বিএনপির ২৬ লাখ নেতাকর্মী, সমর্থকের বিরুদ্ধে মামলার খড়্গ। আমাদের দলের চেয়ারপারসন বন্দি, সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করছে—এমন পরিস্থিতিতে মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথে নামাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, আমরা সংসদের বিরোধী দল। চেষ্টা করছি মানুষের কথাগুলো সংসদেই বলতে। রাজপথে অন্য যে বিরোধী দল বা শক্তিগুলো আছে, তারা তাদের মতো করে কর্মসূচি পালন করছে। রাজপথ কখনোই মসৃণ হয় না। বাধা বা প্রতিবন্ধকতা তো সব সময়ই ছিল। আমাদের সাবেক চেয়ারম্যানসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে কারাবাস করতে হয়েছে। তারপরও তো রাজনীতি করেছি, মানুষের কাছে গিয়েছি, তাদের কথা শুনেছি বলেছি, এখনো বলছি।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) বলেন, ঐক্যের ভিত্তি লাগে। রাজনৈতিক দলগুলো মধ্যে ঐক্য আনতে একটা লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। সরকার পরিচালনায় শুধু হাতবদল হলেই তো হবে না। আমরা বিএনপিকেও দেখেছি, আওয়ামী লীগকেও দেখছি। দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরির জন্য বিএনপি অনেকটাই দায়ী। বর্তমান সরকার গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছে। প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বসম্মতভাবে ঐকমত্য দরকার।

তিনি বলেন, গণমানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলার মতো স্পেস নেই। সরকার নিষ্ঠুরতানির্ভর। বৃহৎ দল বিএনপির লাখো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের সাংগঠনিকভাবে পঙ্গু করা হয়েছে।

তবে যে দল প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকতে পারবে, তারাই সাফল্য অর্জন করবে। দৃশ্যত দেশে সুবিধাভোগী দলের সংখ্যা বাড়ছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই