শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

বিশেষ নজরদারিতে আ.লীগের তিন শতাধিক এমপি-মন্ত্রী!

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০১৯, বৃহস্পতিবার ০৪:৪০ পিএম

বিশেষ নজরদারিতে আ.লীগের তিন শতাধিক এমপি-মন্ত্রী!

ঢাকা: ক্যাসিনো ব্যবসা, নানা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অ'বৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হওয়ায় আতঙ্কে রাঘববোয়ালরা। একসময় যাদের ভয়ে পুরো রাজধানীবাসী থাকত আতঙ্কিত, আজ তারাই গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে থাকছেন।

ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারের ভয়ে দেশ ছেড়েছেন শতাধিক আওয়ামী ও যুবলীগ নেতাকর্মী। কেউ কেউ আত্মগোপনে থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করছেন।

তিন শতাধিক অসাধু মন্ত্রী-এমপি, আমলা, পুলিশ, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ রয়েছেন বিশেষ নজরদারিতে। তাদের অবৈধ সম্পদের ডেটা সংগ্রহ করছে গোয়েন্দা সংস্থা। প্রাথমিকভাবে অভিযান থেমে যাবে ভাবলেও চলমান অভিযান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আরো জোরদার হবে— এমন আশঙ্কায় দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়ালরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শমতো রূপরেখা তৈরি করে অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চালানো হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা জালে থাকা যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের গ্রেপ্তার নিয়েও দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। সম্রাট আত্মগোপনে না গোয়েন্দা হেফাজতে তা নিয়ে চলছে সাধারণ মানুষের চুলচেরা বিশ্লেষণ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মকর্তারা যৌথভাবে দুর্নীতির বিশাল একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তালিকায় শুধু সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী-এমপিই আছেন অর্ধশতাধিক। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এসব দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এরপর চলতি বছরের মাঝামাঝি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে মন্ত্রী-এমপিসহ দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ এবং কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীম এবং কৃষক লীগ নেতা ফিরোজকে র‌্যাবের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে অনেক নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের নাম বেরিয়ে আসে। টেন্ডারবাজি ও ক্যাসিনোর টাকার কমিশন খাওয়া বেশকিছু সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী-এমপির নাম রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীর তালিকা করা হচ্ছে। তালিকায় নতুন নামও যুক্ত হচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অনুসন্ধান ছাড়াও অবৈধ সম্পদ খুঁজতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কাজ করছে। গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও দুদকে একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে তালিকা সমন্বয় করে তার পরামর্শ এবং রূপরেখা অনুযায়ী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ক্যাসিনো পরিচালনার পাশাপাশি যুবলীগের যেসব নেতা রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বা টেন্ডারবাজি, দখল বাণিজ্য ও নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারাও রয়েছেন গোয়েন্দা নজরদারিতে। গত কয়েকদিনে তাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে গ্রিন সিগন্যাল মিললেই তাদের ব্যাপারে অ্যাকশানে যাওয়া হবে বলে জানা গেছে।

সূত্রমতে, ক্যাসিনো পরিচালনার সঙ্গে রাঘববোয়ালরা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর মমিনুল গ্রেপ্তার আতঙ্কে হক সাঈদ ও সভাপতি ইসলাম চৌধুরী সম্রাটের নাম আলোচনা ছাড়াও যুবলীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার নাম পেয়েছে বিভিন্ন সংস্থা। তারা সরাসরি জড়িত না থাকলেও নেপথ্যের কারিগর।

আবার ক্ষমতার প্রভাবে ব্যাংক ও বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্বে থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে গত কয়েক বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া যুবলীগের কয়েকজন নেতার ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে।

এদের মধ্যে রয়েছেন— যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক হোসেন, মাহাবুবুর রহমান হিরণ, আতাউর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহিসহ বেশ কয়েকজন।

সূত্র আরো জানায়, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে শিক্ষা ভবনের ঠিকাদারদের নিয়ন্ত্রণ, বিএনপি-জামায়াতের ঠিকাদারকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়া ছাড়াও বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীমের প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিলেন ফারুক হোসেন।

শিক্ষা প্রকৌশলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান হানজেলার সব অপকর্মের নেপথ্যের শক্তি ছিলেন এই যুবলীগ নেতা বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই অভিযোগগুলো এখন খতিয়ে দেখছে সরকারের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা। তার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তার রয়েছে শান্তিনগরের টুইন টাওয়ারে আলিশান কয়েকটি ফ্ল্যাট। টুইন টাওয়ার, জোনাকী মার্কেট ও পলওয়েল মার্কেটে রয়েছে তার একাধিক দোকান।

যুবলীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহাবুবুর রহমান হিরণ। তিনি যুবলীগ করার কারণে রূপালি ও জনতা ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, বড় বড় ঋণ পাইয়ে দেওয়া ও ঋণখেলাপিদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিতে কলকাঠি নেড়েছেন যুবলীগের এই নেতা। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দখলে নিয়েছেন সেঞ্চুরি মার্কেটের চতুর্থ তলা।

যেখানে তার বর্তমান অফিস, ওই মার্কেটে হীরুন অপটিকসসহ রয়েছে বেশ কয়েকটি দোকান। সেঞ্চুরি অর্কিড আবাসিক এলাকার এক একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৩/৪ কোটি টাকা। এছাড়াও জি কে শামীমের সঙ্গে বেশ সংখ্য ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান আতার বিরুদ্ধেও ক্যাসিনো সম্রাট খালেদ ভূঁইয়াকে শেল্টার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও তিনি দেশের নারী শিক্ষার ঐতিহ্যবাহী ভিকারুনিসা নূন স্কুলের গভর্নিং কমিটির সদস্য থাকা অবস্থায় ভর্তি বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে বিভিন্ন সংস্থা। যুবলীগে ফারুক-হীরন-আতা-মাসুদ একটি কঠিন সিন্ডিকেট। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজউক, শিক্ষাভবন, নগর ভবন, গণপূর্ত, ওয়াসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বড় বড় কাজের সমঝোতা করেন।

মহিউদ্দিন মহি কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক। টানা দশ বছর সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান। ঢাকায় রয়েছে কয়েকটি বাড়ি, বিশটির মতো আলিশান ফ্ল্যাট। তিনি ব্রাদার্স ক্লাবের সভাপতি।

অভিযোগ রয়েছে, এই ক্লাবে তার নির্দেশেই ক্যাসিনো চলত। তিনি যখন মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি তখন সকল ক্যাসিনো থেকে নিয়মিত তিনি টাকা পেতেন।

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রকে ২০ কাঠা জমি দান করেছিলেন মতিঝিল এলাকায়। মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা লাভলু, যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজাসহ কয়েকজন একটি ডেভেলপার কোম্পানির কাছে উক্ত সম্পত্তি ডেভেলপ করতে দেন। সেখান থেকে দেওয়া ৭০ কোটি টাকা তারা আত্মসাৎ করেছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পেরেছে।

সূত্রমতে, এসব নেতার ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উচ্চ পর্যায়ের গ্রিন সিগন্যাল পেলেই অভিযান চালানো হবে বলে জানা গেছে।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, আমাদের চলমান অভিযান শুধু ক্যাসিনো কিংবা জুয়ার বিরুদ্ধে নয়, আইন অমান্যকারী সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা অনৈতিক ব্যবসা করেন, তাদের বিরুদ্ধেও অভিযান চলবে। অন্যায়কারী জনপ্রতিনিধি বা কর্মচারী  যেই হোক না কেন, সবাইকে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত অভিযান চলবে।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতিবাজদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। প্রাথমিকভাবে দুর্নীতিবাজ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীদের সম্পদের হিসাব ও উৎস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব দুর্নীতিবাজের তালিকা নিয়ে কাজ করছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং দুদক। রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এই তালিকায় রয়েছে।

এছাড়া টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং ক্যাসিনোর শত শত কোটি টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারার সঙ্গে রাজনীতিবিদ ছাড়াও প্রশাসনের কোন স্তরের কারা জড়িত তার অনুসন্ধান করা হচ্ছে। দেশের বাইরে কোন চ্যানেলে কীভাবে টাকা পাচার করা হয়েছে সেটা নিয়েও কাজ করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

একাধিক রাজনীতিবিদ জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে তাদের মনে হয়েছিল ক্যাসিনো এবং জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে শেষ হয়ে যাবে। তবে পরবর্তীতে জানতে পেরেছেন, এই অভিযান দীর্ঘায়িত হবে। তালিকা ধরে প্রথমে শীর্ষ দুর্নীতিবাজ, টেন্ডারবাজ এবং অবৈধ সম্পদ উপার্জনকারীদের ধরা হবে। তারপর মধ্য সারি থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালানো হবে প্রাথমিকভাবে এমন সিদ্ধান্তই হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুবলীগ নেতা সম্রাট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে গোয়েন্দা জালে ঢাকাই রয়েছেন। কোনো গোয়েন্দা সংস্থার হেফাজতে আছেন কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলছেন না কর্মকর্তারা। তবে দ্রুতই তাকে গ্রেপ্তার ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, অভিযানের পর ক্যাসিনোর অবৈধ ব্যবসা দেখাশোনাকারী সম্রাটের বড় ভাই বাদল চৌধুরী এবং ছোট ভাই ছাত্রলীগ নেতা রাশেদ গা-ঢাকা দিয়েছেন।

ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নতুন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম দায়িত্ব নেন। পরে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেন। পুলিশের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে কঠোর নির্দেশনা জারি করেন তিনি।

নির্দেশনা পেয়ে পুলিশের অন্য কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেন। যেসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়াসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে তাদের তালিকা করা হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালানোর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। নিজেদের রক্ষা করতে কেউ কেউ তদবির শুরু করেছেন।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/এসএস