শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

বিস্ফোরণে ভস্ম জান্নাতের স্বপ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার ১২:১৮ পিএম

বিস্ফোরণে ভস্ম জান্নাতের স্বপ্ন

ঢাকা : স্বামী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট একটি পরিবার গৃহবধূ জান্নাতের। থাকেন রূপনগর শিয়ালবাড়ির মাদবরের বস্তিতে। মেয়ে সুমাইয়া আক্তারকে মানুষের মতো মানুষ করাই ছিল যার স্বপ্ন, সেই স্বপ্নই মুছে যাচ্ছে জান্নাতের চোখ থেকে।

বুধবার (৩০ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকায় বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ডান হাত উড়ে গেছে জান্নাতের কনুই থেকে। এখন হাসপাতালের বিছানায় অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তিনি। ৫ বছরের মেয়েও তাকে দেখে অঝোরে পানি ফেলছে চোখ থেকে।

চিকিৎসকরাও বলছেন, তার অবস্থা এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়। স্বজনরা তার বিচ্ছিন্ন হাতের অংশ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন হাসপাতালে, তাদের আশা আবার জোরা লাগানো সম্ভব হবে জান্নাতের ডান হাত।

গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০৬ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ওয়ার্ডের মেঝের মাঝ বরাবর সারিতে মাদুর পেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন জান্নাত (২৫)। পাশে বসে রয়েছে তার ছোট বোন আমেনা আক্তার। বড় বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তিনি।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জান্নাতের স্বামী মো. নজরুল ইসলাম পেশায় রিকশাচালক। একমাত্র মেয়ে সুমাইয়া আক্তার (৫) স্থানীয় একটি নার্সারি স্কুলে সবেমাত্র আসা-যাওয়া করে। আড়াই হাজার টাকা মাসিক বাসা ভাড়া দিয়ে থাকেন মাদবরের বস্তির ফজল মাদবরের টিনশেড ঘরে। জান্নাতের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার চর ইলিশা গ্রামে। ৭ বছর আগে বিয়ে হয় রিকশাচালক নজরুল ইসলামের সঙ্গে। এরপরই চলে আসেন ঢাকায়। থাকতে শুরু করেন শিয়ালবাড়ির ওই বস্তিতে।

হাসপাতালের ফ্লোরে শুয়ে থাকা জান্নাত জানান, স্বামী ও মেয়েকে নিয়ে ওই বাসায় থাকেন তিনি। পাশের আরেকটি বাসায় থাকেন শাশুড়ি গোলেনুর বেগম, দেবর মনির হোসেন ও জা মনি বেগম। বিয়ের পর বছরখানেক মিরপুরের একটি পোশাক তৈরি কারখানায় কাজ করতেন তিনি। এরপর কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর মেয়ের দেখভালের জন্য ছেড়ে দেন চাকরি। মেয়ে কিছুটা বড় হওয়ার পর সংসারে সচ্ছলতা আনতে গত বছর আবার চাকরি নেন তিনি। ৩ মাস চাকরি করার পর মেয়ের অযত্ন দেখে আবার চাকরি ছাড়েন তিনি। এরপর থেকে মেয়েকে দেখে রাখা, তার খাওয়া-দাওয়া, গোসল নিয়েই ব্যস্ততায় দিন কাটত তার। মোট কথা, মেয়েই ছিল তার সবকিছুর মূলে।

বিস্ফোরণের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে জান্নাত বলেন, বুধবার দুপুরে তার স্বামী নজরুল ইসলাম রিকশা চালাতে গিয়েছিলেন। মেয়েকে রেখে তিনি বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ১২ নম্বর রোড দিয়ে বাজার করতে যান।

এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জা মনি বেগম। বাজার শেষে ৪টার দিকে বাসায় ফেরার জন্য ১১ নম্বর রোড দিয়ে ঢোকেন। কিছুদূর আসার পর মনিপুর স্কুলের পেছনের রাস্তায় দেখেন এক লোক রাস্তার ডান পাশে ভ্যানে করে বেলুন ফুলিয়ে বিক্রি করছেন। ৫ টাকা পিস বেলুন কেনার জন্য তার চারপাশে ভিড় করেছিল অনেক ছোট বাচ্চা। ব্যস্ত রাস্তা দিয়েও অনেক লোক যাওয়া-আসা করছিলেন।

বেলুনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই তিনি সামনের দিকে চলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ এক বিকট শব্দ শুনতে পান। সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় পড়ে যান তিনি। এরপর স্তব্ধ হয়ে যায় চারদিক। তিনি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন বারবার। তবে কিছুদেই দাঁড়াতে পারছিলেন না। এরপর আর তেমন কিছুই মনে করতে পারছেন না তিনি।

কথা বলতে বলতে চোখের পানি ছেড়ে জান্নাত বলতে শুরু করেন, ২ মাস হয় বস্তির একটি সমিতি থেকে ৪০ হাজার টাকার ঋণ নিয়েছি। প্রতি সপ্তাহে ১১২০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। এখন আমার এই অবস্থা। জানি না আমার স্বামী আমাকেই চিকিৎসা করাবে নাকি ঋণ পরিশোধ করবে। আমার মেয়েরই এখন কে দেখাশোনা করবে।

হাসপাতালে জান্নাতের সঙ্গে কথা বলা শেষে দেখা যায় তার দেবর মনির হোসেন একটি সাদা রঙের বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে দৌড়ে এসেছেন ওয়ার্ডের ভেতরে। জানা যায়, ব্যাগের ভেতর বিস্ফোরণে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া জান্নাতেরই কাটা হাত।

দেবর মনির হোসেন বলেন, বিস্ফোরণের পরপরই জান্নাতকে উদ্ধার করে সরাসরি ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন ঘটনাস্থলে জান্নাতের বিচ্ছিন্ন হাত খোঁজাখুঁজি করলেও তা পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার সকালে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে গিয়ে খোঁজ পাওয়া যায় বিচ্ছিন্ন হাতের অংশ। পরে পুলিশের মাধ্যমে জানিয়ে তা এই সাদা রঙের ব্যাগে করে নিয়ে আসা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা শুনতে পেরেছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাটা হাত অপারেশন করে আবার জোড়া লাগানো যায়। এরপরই আমরা হাতটি খোঁজাখুঁজি শুরু করি। সর্বশেষ হাতটি পেয়েও যাই। এখন চিকিৎসকদের কাছে অনুরোধ, তারা যেন দ্রুত তার হাতের অপারেশন করে হাতটি জোড়া লাগিয়ে দেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জানান, জান্নাতের ডান হাতের কনুইয়ের নিচ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বুধবার বিকেলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর থেকেই জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রাতে তার হাতে ছোট একটি অস্ত্রোপচারও করা হয়েছে। তাকে অর্থপেডিকস বিভাগের আন্ডারে ২০৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে তার হাতের অস্ত্রোপচার করা হবে। তার অবস্থা এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue