বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা

বেপরোয়া দালাল-সিন্ডিকেট

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৯, বৃহস্পতিবার ০১:০৮ পিএম

বেপরোয়া দালাল-সিন্ডিকেট

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় বেপরোয়া দালালচক্র

ঢাকা : দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় বেপরোয়া দালালচক্র। দালালদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে হয়রানি হচ্ছেন। প্রতারিত হচ্ছেন অনেক মানুষ। দালালচক্রের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন হাসপাতালগুলোর এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী ও চিকিৎসক। বিশেষ করে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় দালালদের উৎপাত আরো বেশি। এরই মধ্যে সারা দেশে পালিত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা সপ্তাহ। দেশে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে এবার।

সরেজমিন কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসাসেবায় এমন বিড়ম্বনার চিত্র পাওয়া গেছে। এসব দালালের সঙ্গে আবার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিড়ম্বনার কথা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

তিনি বলেছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র আগের মতো নেই। এখন অনেক অগ্রগতি হয়েছে। হয়তো পুরোপুরি অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। কিন্তু সরকার কঠোর অবস্থানে।

সূত্রগুলো বলছে, স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন শুরু হয়েছিল। স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে সংযোজন এবং প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের সব মানুষ তথা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে ‘জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৭৫ সালের ২৩ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ’ গঠনের আদেশ সই করেন।

বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নানমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। তবে এই খাতের উন্নয়নে সরকারের এত কিছুর পরও দালালচক্রের অপকর্ম কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সরেজমিনে মহাখালী জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, দালালদের সরব উপস্থিতি। সেখানে আগত রোগী কিংবা স্বজনদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন দালালরা। টাকার বিনিময়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিচ্ছেন এসব দালাল। দালাল হিসেবে আশপাশের এলাকার মানুষ যেমন আছেন। আবার হাসপাতালের কর্মচারীরাও অতিরিক্ত আয়ের জন্য দালাল হিসেবে কাজ করছেন। এমনকি আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরাও সিন্ডিকেটচক্রের সঙ্গে কাজ করছেন।

হাসপাতালটিতে পর্যবেক্ষণে গিয়ে কথা হয় এক দালালের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার বাড়ি পাশের একটি বস্তিতে। কোনো কাজ করেন না। তাই তিনি হাসপাতালে এসে রোগীদের সেবা পাইয়ে দিতে আয় করার পথ বেছে নিয়েছেন। তার বিবরণ থেকে জানা যায়, অনেক রোগী ঢাকার বাইরে থেকে আসেন, তারা হাসপাতালের কোন ভবনে কী, কোথায় কী করতে হবে। ভর্তির প্রক্রিয়া, ল্যাবে পরীক্ষার কাজ করতে পারেন না। অথবা চিকিৎসকের রুমেও বিড়ম্বনায় পড়েন। কিন্তু তিনি কাজটি স্বাভাবিকভাবে করে দিয়ে কিছু টাকা নেন। এর মাধ্যমে তার সংসার চলে। আর হাসপাতালের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন তিনি। ফলে রোগীর চিকিৎসাসেবায় হয়রানি কম হয় বলে এই দালালের দাবি।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানেও (পঙ্গু হাসপাতাল) একই চিত্র দেখা যায়। একজন রোগীর চিকিৎসাসেবার প্রক্রিয়া অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, তার ভর্তি ও পরীক্ষার দায়িত্ব নেন হাসপাতালের একজন কর্মচারী। বিনিময়ে তাকে দিতে হয় ৪০০ টাকা। সড়ক দুর্ঘটনায় বাঁ হাত ভেঙে হাসপাতালে আসা এই রোগীর হাতের এক্স-রে করতে কোনো সিরিয়াল দিতে হয়নি।

সিরিয়ালে ন্যূনতম ২০ জন রোগী থাকলেও এই রোগীকে নিয়ে দালাল সরাসরি এক্স-রে রুমে চলে যান। সেখানে সব প্রক্রিয়া শেষ করে দেন। অবশ্য এজন্য এক্স-রে রুমের সংশ্লিষ্টদের আরো ১০০ টাকা দিতে হয়। এভাবে দালালদের মাধ্যমে যেসব রোগী ভেতরে আসে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন তারা।

হাসপাতালে কথা হয় এই রোগীর স্বজন মো. মানিক মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে থেকে তিনি শুনেছেন সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে গেলে পদে পদে হয়রানি। এখানে  দালালদের দৌরাত্ম্য। তাই তিনি একজন কর্মচারীকে দিয়ে চিকিৎসা প্রক্রিয়া ত্বরান্তিত করেছেন।

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি, একটি জাতির সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতির সার্বিক উন্নতি ও অগ্রগতি নির্ভর করে জনস্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নয়নের ওপর। সরকার স্বাস্থ্যমান উন্নয়ন, সংরক্ষণ, সেবার মান বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আরো জোরদার করতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার সুফল জনগণ ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে। যেসব জায়গায় ঘাটতি রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত এক দশকে রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় নতুন নতুন বিশেষায়িত ও জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। ‘শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট’, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইএনটি, ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মুগদা জেনারেল হাসপাতালসহ অনেক হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। আরো অনেক হাসপাতাল সম্প্র্রসারণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।

এ ছাড়া উপজেলা হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ পদ সৃষ্টি, নতুন নতুন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ, টিকাদান কর্মসূচিতে নতুন নতুন টিকা সংযোজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নির্মিত কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে গ্রামীণ হতদরিদ্র মা ও শিশুসহ সব স্তরের জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। সরকারের গৃহীত এসব কর্মকাণ্ড জনগণের স্বাস্থ্যমান উন্নয়নের পথকে সুগম করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে দালালের দৌরাত্ম্য বেশি। কারণ এখানে বিশেষ ধরনের রোগে আক্রান্ত রোগীরা আসেন। আর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীদের অনেক সময় সেবা পেতে বাধার মধ্যে পড়তে হয়। জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেও একই চিত্র। এখান থেকে রোগীকে বের করে নিতেও স্বজনদের সমস্যায় পড়তে হয়।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, দালালদের কারো কারো সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। দালালরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষকে প্রতারণার মাধমে এসব হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এর মাধ্যমেও তাদের বড় আয় হচ্ছে। আর প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

বর্তমান সরকারের গত মেয়াদে ১৩ হাজার চিকিৎসক, ১৫ হাজার নার্স এবং ১৬ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরো নতুন ১০ হাজার চিকিৎসকসহ পর্যাপ্ত সংখ্যক নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান। গত সপ্তাহে বিসিএসের মাধ্যমে ৩০৬ জন চিকিৎসক যোগদান করেছেন। স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে চিকিৎসকদের গ্রামে থেকে মানুষকে চিকিৎসা প্রদানে উৎসাহিত করতে সরকার নিরলস প্রয়াস চালাচ্ছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue