রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ২ ভাদ্র ১৪২৬

বোমা হামলার ১৮ বছরেও চার্জশিট দিতে পারেনি সিআইডি

আদালত প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ০৪ জুন ২০১৯, মঙ্গলবার ০৭:৩৯ পিএম

বোমা হামলার ১৮ বছরেও চার্জশিট দিতে পারেনি সিআইডি

ঢাকা : সুখরঞ্জন হালদারের (৭৫) স্ত্রী অসুস্থ হয়ে বিছানায়। বোমা হামলায় মারা গেছেন একমাত্র ছেলে সুমন হালদার। ছেলে হত্যার বিচার চাইতে চাইতে দীর্ঘ ১৮ বছরে শুকিয়ে গেছে তার চোখের পানি।

তিনি বলেন, ‘সেদিন ছিল রবিবার। আমার ছেলে সুমন হালদার প্রার্থণা করতে গিয়েছিল গীর্জায়। হঠাৎ করে বিকট শব্দ শুনি। দৌঁড়ে এসে দেখি সুমনসহ অনেকেই রক্তাক্ত পড়ে রয়েছে। ঘটনাস্থলেই মারা গেল আমার একমাত্র সন্তান। এরপর থেকে ছেলে হত্যার বিচারের আশায় দিন গুনছি। কিন্তু ১৮ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত বিচার পেলাম না। ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারব কিনা তাও জানিনা।’

রোববার গীর্জার বান্দায় বসে কথাগুলো বলছিলেন সুখরঞ্জন। ৩রা জুন, ২০০১ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বানিয়ারচর ক্যাথলিক গীর্জায় ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল। এতে খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের ১০ জন নিহত ও আরো অর্ধশত মানুষ আহত হয়। কিন্তু আজ অবধি এ হত্যাকান্ডের অভিযোগ গঠন করতে পারেনি সিআইডি। ফলে হতাশা আর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার মতই স্বজনহারা ঝিন্টু হালদার, সঞ্জীবন বাড়ৈ, সতিশ বিশ্বাস, বিনোদ দাসসহ আরো নয়টি পরিবার।

মামলার বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিহত পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বোমা হামলার দিন সকাল ৭টার বানিয়ারচর গির্জায় সাপ্তাহিক উপাসনা  চলছিল। উপাসনাকালীন প্রার্থনার মাঝেই হঠাৎ করে বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রার্থণারতরা দিক-বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। ঘটনাস্থলেই ১০জন নিহত হয়। আহত হয় আরো অর্ধ শতাধিক।

নিহতরা হলেন রক্সিড জেত্রা, বিনোদ দাস, মন্মথ সিকাদার, সঞ্জীবন বাড়ৈ, পিটার সাহা, অমর বিশ্বাস, সতীশ বিশ্বাস, ঝিন্টু মন্ডল, মাইকেল মল্লিক ও সুমন হালদার। তবে যে ১০জন নিহত হয়েছে এর মধ্যে ৭জনই হলো মা বাবার একমাত্র সন্তান। এ বোমা হামলার ঘটনায় মুকসুদপুর থানায় ওই গির্জার তৎকালীন ফাদার পিতাঞ্জা মিম্মো বাদী হয়ে হত্যা ও পিটার বৈরাগী বাদী হয়ে বিস্ফোরক মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরপরই হত্যাকারীদের ধরতে তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ। কিন্তু কোন কুল-কিনারা করতে পারেনি। পরে এ মামলা দুটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।

এরপর দেশের অন্যান্য স্থানের বোমা হামলার আলামতের সাথে এ বোমা হামলার আলামত মিলে গেলে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জেহাদ এ বোমা হামলা চালায় বলে এক প্রকার নিশ্চিত হয় সিআইডি। ফাদার পিতাঞ্জার দায়ের করা হত্যা ও পিটার বৈরাগী বাদী হয়ে দায়েরকৃত মামলায় ৩৭ জনকে আসামি করা হয়।
সম্প্রতি এ দুটি মামলার প্রধান আসামি হরকাতুল জেহাদ নেতা মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এছাড়া জামিনে রয়েছেন ১২ জন, জামিনে গিয়ে পলাতক রয়েছেন ৬ জন ও কারাগারে রয়েছেন ৭ আসামি।

কিন্তু হত্যাকান্ডের দীর্ঘ ১৮ বছর পার হলেও নির্দিষ্ট কোন সুরাহায় পৌঁছতে পারেনি সিআইডি। এ পর্যন্ত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হয়েছে ২২ বার। জঙ্গি সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও এখন পর্যন্ত এ বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারীকেও শনাক্ত করতে পারেনি সিআইডি।

বানিয়ারচর গির্জার ফাদার ফরেজারোম রিকো গমেজ বলেন, ‘ঘটনার দীর্ঘ ১৮ বছর পার হলেও বিচার কাজের কোন অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে।’

গোপালগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো: আব্দুল হালিম বলেন, ‘এ মামলার বারবার তদন্ত কর্মকর্তা বদলী ও তদন্ত শেষ না হওয়ার ফলে দীর্ঘ দিনেও চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে বিচার কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। সিআইডি দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট জমা দিলে বিচার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue