শনিবার, ২০ জুলাই, ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

ছাত্রদলের কাউন্সিল

ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় নেতাকর্মীরা

বিশেষ প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১০ জুলাই ২০১৯, বুধবার ০২:১৩ পিএম

ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় নেতাকর্মীরা

ঢাকা : ২৭ বছর পর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিল হতে যাচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় কাউন্সিলের কাজ অনেকটা এগিয়েছে। কাউন্সিল ঘিরে ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশী এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বসিত। নয়াপল্টনে দলীয়ে কার্যালয়েও উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।

প্রথম দফায় ঘোষিত তফসিল মোতাবেক ১৫ জুলাই কাউন্সিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ একটি অংশের আন্দোলনের কারণে ওই তারিখে কাউন্সিল হচ্ছে না। তফসিল পিছিয়ে আগামী ২৭ বা ২৮ জুলাই ছাত্রদলের কাউন্সিলের ভোটগ্রহণ করা হতে পারে। পাশাপাশি বিএনপির হাইকমান্ড ছাত্রদলের নতুন নেতা হওয়ার যেসব শর্ত দিয়েছেন তা বহাল থাকবে। তবে বিবাহিতরা কোনোভাবেই প্রার্থী হতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন সার্চ কমিটির সিনিয়র সদস্য শামসুজ্জামান দুদু।

ছাত্রদলের কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ডজন খানেকের বেশি নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। ইতোমধ্যে নিজেদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রচারণা চালাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে দলের পক্ষে কার কী ভূমিকা ছিল এবং বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণসহ নানা বিষয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে প্রচারণায়।

অবশ্য এবারের কাউন্সিলে তৃণমূল ও সাধারণ কর্মীদের দাবি, শুধু প্রতিষ্ঠান দেখে আর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যেন ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচিত না হয়। জাতীয়তাবাদী পরিবারের ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখা যোগ্য প্রার্থীরাই যেন ছাত্রদলের কাণ্ডারি নির্বাচিত হন।

পেছানো হবে তফসিল : ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সঙ্কটের ইতিবাচক সমাধান হতে যাচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই নেতার সাথে ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধদের আলোচনা সমন্বয় করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।

বিষয়টি নিয়ে গত রোববার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে আলোচনা করেছেন সার্চ কমিটির সদস্যরা। লন্ডন থেকে স্কাইপিতে সংযুক্ত ছিলেন তারেক রহমান।

তিনি সার্চ কমিটির নেতাদের বলেছেন, যা হওয়ার হয়েছে। এখন ছাত্রদলের কাউন্সিল আগের শর্ত ঠিক রেখে এ মাসের মধ্যেই করতে হবে।

এরপর গত সোমবার মির্জা আব্বাসের বাসায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সাথে সার্চ কমিটির বৈঠক হয়। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। ওই বৈঠকে ছাত্রদলের ১২ নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে ইতিবাচক নির্দেশনা দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

মঙ্গলবার (৯ জুলাই) আবার তারেক রহমানের সাথে সংশ্লিষ্ট নেতাদের আলোচনায় কাউন্সিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে ২০০০ সালের পরে এসএসসি ধরে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনে দলের আগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। আর বিক্ষুব্ধদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদলের কাউন্সিলের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় পুনঃতফসিল ঘোষণা করা হবে। সে ক্ষেত্রে ১৫ জুলাইয়ের কাউন্সিলের তারিখও পিছিয়ে ২৭ বা ২৮ জুলাই হতে পারে। সংশ্লিট সূত্রে এসব জানা গেছে।

এর আগে ছাত্রদলের সঙ্কট নিরসনে গত ২৯ জুন বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দুই সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর রায়কে দায়িত্ব দেন তারেক রহমান। পরে তাদের সাথে দলের যুগ্ম-মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকেও যুক্ত করা হয়। তারা বিক্ষুব্ধদের সাথেও একাধিক বৈঠক করেন। তবে সঙ্কট নিরসনে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন বিক্ষুব্ধরা।

যারা ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনে নির্বাচনের তফসিল ঠিক রেখে কাউন্সিলের কার্যক্রম শেষ করবেন। এ ক্ষেত্রে বিলুপ্ত কমিটির শীর্ষ তিন নেতা রাজীব আহসান, মামুনুর রশিদ মামুন ও আকরামুল হাসানকে কমিটিতে রাখা হবে না।

শীর্ষ পদে লড়তে চান ডজন খানেক নেতা : ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন অন্তত ডজন খানেক নেতা। বিএনপির দেয়ার শর্ত মোতাবেক ২০০০ সালে এসএসসি পাস ও তৎপরবর্তী ব্যাচ থেকে ছাত্রদলের শীর্ষপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী এসব নেতা। তারা বিএনপির নীতিনির্ধারকসহ ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের সাথে জড়িত সাবেক ছাত্রনেতাদের কাছে গিয়ে বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের অংশগ্রহণ ও ভূমিকার প্রমাণ তুলে ধরছেন।

তবে পদপ্রত্যাশীদের মাঝে ‘সিন্ডিকেট’ভীতি রয়েছে। বিগত দিনে ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত নেতাদের নিয়ে শঙ্কিত অনেক ত্যাগী ও যোগ্যরা। পদপ্রত্যাশীদের মাঝে নানা শঙ্কা ও হতাশাও দেখা দিয়েছে। তবে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করেছেন, খোঁজখবর রাখছেন। তাই কাউন্সিল ঘিরে সিন্ডিকেটের সুযোগ নেই।

সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান, বিলুপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-তথ্যবিষয়ক সম্পাদক মামুন খান, ঢাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি আমিনুর রহমান আমিন, যুগ্ম সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, ইকবাল হোসেন শ্যামল, রিজভী আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবু তাহের, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সর্দার আমিরুল ইসলাম সাগর, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল আলম, বৃত্তি ও ছাত্র কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, সহ-অর্থবিষয়ক সম্পাদক আশরাফুল আলম ফকির লিঙ্কন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মো: জাকির হোসেন, সদস্য মোহাম্মদ এরশাদ খান, সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক নাদিয়া পাঠান পাপন, ঢাবির সিনিয়র সহসভাপতি তানভীর রেজা রুবেল।

ছাত্রদলের শীর্ষ পদপ্রত্যাশী হাফিজুর রহমান ও সাইফ মাহমুদ জুয়েল জানান, এ মুহূর্তে সংগঠনকে আন্দোলন-সংগ্রামের উপযোগী করে গড়ে তোলার বিষয়টিকে তারা প্রাধান্য দিচ্ছেন। নেতৃত্বে আসতে পারলে প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলকে সক্রিয় ও আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করবেন।

সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী সংগঠনের সাবেক নেতা মামুন খান বলেন, তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। একাধিকবার কারাভোগ করেছেন। সরব ভূমিকায় থাকা আমিনুর রহমান আমিন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। তিনি বলেন, আমি বিগত আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি। আশা করি কাউন্সিলর ও দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।

ছাত্রদলের কাউন্সিলের ইতিহাস : ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দফতর সূত্র মতে, ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি সংগঠনের প্রতিষ্ঠার পর গত ৪০ বছরে ১৮টি কমিটি হয়েছে। ১৯৭৯ সালে প্রথমে মরহুম কাজী আসাদুজ্জামানকে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি হয়। ওই বছরেই কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রথম কমিটি নির্বাচিত হয়। এতে এনামুল করিম সভাপতি ও আ ক ম গোলাম হোসেন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি হয় ১৯৯২ সালে। কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে রুহুল কবির রিজভী ও ইলিয়াস আলী। এ কমিটি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র খুনের ঘটনা ঘটে। এরপরই কমিটি ভেঙে দেয়া হয়। তখন বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়।
পরের বছর, ১৯৯৩ সালে ফজলুল হক মিলনকে সভাপতি ও নাজিম উদ্দিন আলমকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। সেই থেকে ছাত্রদলের অনির্বাচিত কমিটির যাত্রা শুরু। সর্বশেষ রাজীব আহসান-আকরামুল হাসান কমিটি পর্যন্ত ১০টি কমিটিই ছিল অনির্বাচিত। এবার ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে নেতা নির্বাচন হতে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ৩ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আসন্ন কাউন্সিলে প্রার্থী হওয়ার জন্য তিনটি যোগ্যতা নির্ধারণী শর্ত দেয়া হয়।

সেখানে বলা হয়, প্রার্থীকে ছাত্রদলের প্রাথমিক সদস্য হতে হবে, তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হতে হবে এবং ২০০০ সালের পরে এসএসসি/সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। কাউন্সিলের তফসিলও ঘোষণা হয়।

কিন্তু এ নিয়ে বিলুপ্ত কমিটির একটি অংশ আন্দোলন করতে থাকে। একপর্যায়ে ১২ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। এখন তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই